চট্টগ্রামের শিল্প ও কৃষিসমৃদ্ধ দুই উপজেলা আনোয়ারা ও কর্ণফুলীর ভূগর্ভস্থ পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কর্ণফুলী টানেল খুলে দিয়েছে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত, গতি বেড়েছে শিল্পায়নের। কিন্তু এই ঝকঝকে অগ্রগতির আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ সংকট। এর সঙ্গে প্রতি বছরই আশঙ্কাজনক হারে নেমে যাচ্ছে মাটির নিচের পানির স্তর। সংকট এখন এতটাই তীব্র যে, ভরা বর্ষাতেও শত শত নলকূপে মিলছে না এক ফোঁটা পানি! সুপেয় পানির জন্য ঘরের দোরগোড়ায় চলছে হাহাকার। পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলছেন, এটি কেবল পানির অভাব নয়; বরং এই অঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের এক চরম ‘অশনি সংকেত’।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে যেখানে ১০০ থেকে ১৫০ ফুট গভীরতায় নলকূপ বসালে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যেত, এখন সেখানে ৭০০ থেকে ৮০০ ফুট গভীরে গিয়েও পানির দেখা মিলছে না। আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন, বৈরাগ, চাতরী ইউনিয়ন এবং কর্ণফুলী উপজেলার চরপাথরঘাটা ও শিকলবাহা ইউনিয়নসহ ডায়মন্ড পার্ক এলাকার সংকট সবচেয়ে তীব্র।
সাধারণত চৈত্র-বৈশাখ মাসে পানির সংকট দেখা দিলেও এখন পুরো বর্ষা মৌসুমেও চিত্র বদলাচ্ছে না। চাতরী গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইব্রাহিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আগে শুষ্ক মৌসুমে পানি কম উঠলেও আষাঢ়-শ্রাবণের বর্ষায় নলকূপগুলো সচল হয়ে যেত। কিন্তু এখন ভরা বর্ষাতেও দিনভর পাম্প চালিয়ে বা চাপ দিয়ে নলকূপ থেকে এক ফোঁটা পানিও তোলা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে দূরদূরান্ত থেকে খাবার পানি কিনে বা সংগ্রহ করে আনতে হচ্ছে।’
মাটির নিচের পানি উধাও হয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বড় বিপদে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। সেচের পানি না পেয়ে অনেক ক্ষেত এখন অনাবাদী হয়ে পড়ে থাকে। বৈরাগ এলাকার কৃষক আবদুস সবুর (৫২) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেকে এই মাটিতে চাষবাস করছি, কিন্তু এমন আকাল কখনো দেখিনি। ক্ষেত-খামারে পানি দেওয়ার জন্য শ্যালো মেশিন বসিয়েও মাটির নিচে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। কলকারখানার বড় বড় মোটর দিয়ে দিন-রাত পানি টেনে নেওয়া হচ্ছে, আর আমাদের মতো
কৃষকরা পানির অভাবে চাষাবাদ করতে পারছে না।
কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা এলাকার কৃষক মো. ইউনুস (৪৫) বলেন, ‘আগে পুকুর বা খালের পানি দিয়ে কিছু চাষ করা যেত, কিন্তু এখন চারপাশের ছোট ডোবা-নালা সব ভরাট করে কারখানা করা হয়েছে। মাটির নিচ থেকে যে পানি তুলব, ৭০০ ফুট বোরিং করেও নলকূপে সুতা ছিটানো পানিও উঠছে না। বর্ষাকালে চারদিকে পানি থই থই করলেও আমাদের নলকূপগুলো শুকনো খটখটে। চাষাবাদ ছেড়ে এখন অন্য কাজ খোঁজা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।’
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই দুই উপজেলায় গড়ে ওঠা বিশাল শিল্পগোষ্ঠী এবং সারকারখানাগুলো প্রতিদিন মাটির নিচ থেকে কোটি কোটি গ্যালন পানি তুলে নিচ্ছে।
আনোয়ারা-কর্ণফুলীর দেয়াঙ পাহাড়জুড়ে অবস্থিত কোরিয়ান ইপিজেডের টেক্সটাইল, জুতা ও পোশাক তৈরির বহু কারখানা রয়েছে। ৩৫ হাজারের বেশি শ্রমিক এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার জন্য এখানে দৈনিক বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা আশপাশের গ্রামগুলোর পানির স্তরে বড় প্রভাব ফেলছে। এছাড়া কর্ণফুলী ও আনোয়ারায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন ডাইং ও গার্মেন্টস ওয়াশিং প্ল্যান্টগুলো কাপড়ের প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য সবচেয়ে বেশি পানি অপচয় করছে।
জানা গেছে, অপরিকল্পিত আবাসন ও নতুন নতুন কারখানার অবকাঠামো নির্মাণের কারণে গত এক দশকে শত শত পুকুর, ডোবা, বিল এবং ফসলি জমি ভরাট করা হয়েছে। ফলে বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি মাটির নিচে রিচার্জ (প্রবেশ) হতে পারছে না। একদিকে মাটির নিচ থেকে পানি তোলার পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়েছে, অন্যদিকে নিচে পানি প্রবেশের প্রাকৃতিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলেই মূলত বর্ষার অতি বৃষ্টিতেও মাটির নিচের পানির স্তর আর ওপরে উঠতে পারছে না।
পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে স্থানীয় কৃষি খাতে। বোরো চাষসহ রবিশস্যের মৌসুমে সেচের পানির তীব্র অভাব দেখা দিচ্ছে। অনেক এলাকায় মাটির নিচের স্তরে পানি না পাওয়ায় চাষাবাদ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। অন্যদিকে, ভূগর্ভস্থ মিঠাপানির শূন্যতা তৈরি হওয়ায় সমুদ্রের লোনাপানি মাটির নিচে প্রবেশ করছে। এর ফলে মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে ওই অঞ্চলের গাছপালা ও পরিবেশের স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মাটির নিচে পানির স্তর দ্রুত নেমে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে উপজেলার সহকারী প্রকৌশলী (জনস্বাস্থ্য) প্রিয়াংকা চাকমা বলেন, ‘শিল্পায়নের প্রসারের কারণে এই এলাকায় পানির চাহিদাও বহু গুণ বেড়ে গেছে। ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত উত্তোলনের ফলেই মূলত পানির স্তর দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের সুপেয় পানির সংকট দূর করতে আমরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে গভীর নলকূপ স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছি। তবে এই সংকট থেকে দীর্ঘস্থায়ী মুক্তি পেতে হলে মাটির নিচের পানির ওপর চাপ কমাতে হবে। শিল্পকারখানাগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার না করে বৃষ্টির পানি কিংবা নদীর পানি শোধন করে ব্যবহারের বিকল্প নেই।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভিন বলেন, ‘মাটির নিচের পানির এই শূন্যতা দীর্ঘস্থায়ী হলে ওই অঞ্চলের মাটি দেবে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এছাড়া নদী ও সাগরের কাছাকাছি হওয়ায় উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃহৎ কারখানাগুলোকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে কর্ণফুলী নদীর পানি শোধন করে ব্যবহার করা এবং কারখানার ভেতরে বিশাল জলাধার তৈরি করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সঙ্গে ইটিপি ও পানি পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়া জোরদার করা জরুরি।
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিন বলেন, ‘অপরিকল্পিত শিল্পায়নের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় মিঠাপানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অবৈধভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’