৭ দিনে ১ হাজার অভিযোগ ২৬৭টির সমাধান

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৪ এএম

নাগরিক সেবা হাতের মুঠোয় পৌঁছে দিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) চালু করা ওয়ান-স্টপ অ্যাপ ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ শুরুতেই নগরবাসীর কাছে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। তবে অ্যাপের মাধ্যমে অভিযোগ জানানো সহজ হলেও, বাস্তবে সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের কাজের গতি চসিকের সক্ষমতার সামনে এক বড় পরীক্ষা তৈরি করেছে।

উদ্বোধনের পর প্রথম সাত দিনে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত অ্যাপের ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডে জমা পড়েছে ১ হাজার ৩১টি অভিযোগ। একই সময়ে অ্যাপটিতে নিবন্ধন করেছেন ৯ হাজার ২৭৭ জন নাগরিক। চসিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্ত অভিযোগগুলোর মধ্যে ইতিমধ্যে ২৬৭টির সমাধান করা হয়েছে। বাকি ঘটনাগুলো সমাধানের বিভিন্ন ধাপে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

নগরবাসীর পাঠানো আবেদনের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে শহরজুড়ে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা নিয়ে। এ খাতে প্রাপ্ত ৩৮৮টি অভিযোগের মধ্যে ৫১টির সমাধান নিশ্চিত করেছে সংস্থাটির পরিচ্ছন্নতা বিভাগ। খারাপ রাস্তাঘাট নিয়ে জমা পড়া ২৭৩টি অভিযোগের মধ্যে সমাধান হয়েছে ৭০টির।

যেসব খাতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব, সেখানে অগ্রগতি কিছুটা বেশি। সড়কবাতি-সংক্রান্ত ২২৩টি অভিযোগের মধ্যে সর্বোচ্চ ১০১টি সমাধান করে লাইট সচল করা হয়েছে। মশক নিধনের ক্ষেত্রে ২৮টি আবেদনের মধ্যে ২৩টিরই সমাধান করা হয়েছে ফগার মেশিন ও লার্ভিসাইড প্রয়োগ করে।

এ ছাড়া ৪৯টি অবৈধ স্থাপনার অভিযোগের বিপরীতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ১৬টি স্থান দখলমুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে, জলাবদ্ধতার ৪৪টি অভিযোগের মধ্যে তিনটি এবং নালা-নর্দমার চারটি সমাধান হয়েছে। তবে শুধু সমস্যার কথাই নয়, নতুন নালা তৈরির প্রয়োজনীয়তা জানিয়ে ১৬টি আবেদন জমা দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

অ্যাপ উদ্বোধনের দিন বেলা সাড়ে ৩টার দিকে গলির

মুখে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ময়লার স্তূপ নিয়ে অ্যাপে অভিযোগ জানান পাথরঘাটা নজু মিয়া লেইনের বাসিন্দা শহীদুল আলম লিটন। অভিযোগ জানানোর চার ঘণ্টার মধ্যেই তিনি সমাধান পেয়েছেন। তিনি বলেন, আমাদের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ময়লা জমতে জমতে স্তূপ হয়ে যায়। বিষয়টি সিটি করপোরেশনের স্থানীয় দায়িত্বশীলদের জানালে তারা গায়ে মাখে না। পরে আমি ছবি তুলে অ্যাপে জমা দিই। আধা ঘণ্টার মধ্যে আমার কাছে দুটি কল আসে। ছুটে আসেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সাড়ে ৭টার মধ্যে সমস্যার সমাধান। তিনি আরও বলেন, এরকম আরও অনেক সমস্যার কথা বললেও তারা শুনত না। এখন এই অ্যাপ হওয়াতে আমাদের সুবিধা হয়েছে।

চাঁদগাঁও এলাকার একতার মোড় থেকে আজিম গ্রুপ পর্যন্ত ড্রেনটি দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ হয়ে আছে। এই সমস্যার বিষয়ে গত বছর দেশ গার্মেন্টস নামক প্রতিষ্ঠান থেকে লিখিতভাবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে জানানো হয়। তবে কোনো স্থায়ী সমাধান না মেলায় এবার অ্যাপে আবেদন করেছে দেশ গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা জানান, সামান্য বৃষ্টি বা স্বাভাবিক পানি প্রবাহেই ড্রেন উপচে নোংরা পানি রাস্তায় চলে আসছে, যা এলাকার পরিবহন যোগাযোগে বিঘœ ঘটানোর পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। আমরা সিটি করপোরেশনকে আগেও জানিয়েছি। এবার আমাদের চট্টগ্রাম অ্যাপে অভিযোগ করেছি। দেখা যাক, কী হয়।

কাজের গতির বিষয়ে চসিকের কর্মকর্তারা জানান, বাতি লাগানো বা উচ্ছেদ চালানোর মতো কাজগুলো চটজলদি করা গেলেও রাস্তা মেরামত বা ড্রেনেজ ব্যবস্থার মতো অভিযোগগুলো কিছুটা জটিলতা হওয়ায় সময় বেশি লাগছে। একটি সড়ক সংস্কার বা নালার কাজের ক্ষেত্রে বাজেট, টেন্ডার এবং মাঠপর্যায়ের নানা কারিগরি প্রক্রিয়া যুক্ত থাকে। ফলে এগুলো অ্যাপে ‘সমাধান’ হিসেবে দেখাতে কিছুটা সময় নিচ্ছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, নগরবাসী বেশ উৎসাহের সঙ্গে অ্যাপটিতে নিবন্ধন করছেন। শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত ৯ হাজার ২৭৭ জন নাগরিক নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। ইতিমধ্যে ২৬৭টা অভিযোগের সমাধান করা হয়েছে। অ্যাপটির কারণে নাগরিকরা যেমন তাদের অভিযোগ তাৎক্ষণিক জানাতে পারছেন, তেমনি আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজেও গতি এসেছে। সমস্যা সমাধান করার পর অ্যাপে আবার ছবি পাঠাতে হয়। এরপর অভিযোগকারী কাজ দেখে রেটিং দিতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, অ্যাপটির কারিগরি সক্ষমতা উন্নয়নের কাজ চলছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন ফিচার যোগ হচ্ছে। অভিযোগ যেগুলো তাৎক্ষণিক সমাধান যোগ্য, সেগুলো তাৎক্ষণিক সমাধান করা হচ্ছে। আর যেগুলো সময়সাপেক্ষ সেগুলো উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে যুক্ত করার জন্য নোট করে রাখা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, নাগরিক সেবা সহজ ও দ্রুত করতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) গত ১৮ জুলাই চালু করেছে ওয়ান-স্টপ ডিজিটাল অ্যাপ ‘আমাদের চট্টগ্রাম’। ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এবং ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের (ইবিএল) সিএসআর অর্থায়নে গঠিত এই অ্যাপটি পরিচালনা করছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ভেনটো টেক। জিপিএসভিত্তিক অটো-লোকেশন প্রযুক্তির এই অ্যাপের মাধ্যমে নগরবাসী যেকোনো স্থানে দাঁড়িয়ে রাস্তাঘাট, ময়লা-আবর্জনা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা বা স্ট্রিট লাইটের সমস্যার ছবি তুলে সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারছেন। অ্যাপটিতে রয়েছে ‘মেয়রের সঙ্গে চ্যাট’, অনলাইনে ডিজিটাল টিকিট ট্র্যাকিং এবং প্রশাসনিক তদারকির জন্য ‘ওয়ার্ডভিত্তিক হিট ম্যাপ’ ও স্বয়ংক্রিয় এসকেলেশন সুবিধা। শুধু অভিযোগই নয়, হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স ও জরুরি লাইভ লোকেশন শেয়ারের মতো সুবিধা যুক্ত থাকায় নাগরিকরা এখন ঘরে বসেই সরাসরি নগর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত