নিষিদ্ধ শব্দবাণ

লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার

নিষিদ্ধ শব্দবাণ বিশ্বসাহিত্যের সেইসব বইয়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, যেগুলো কোনো না কোনো সময়ে রাষ্ট্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, মতাদর্শিক গোষ্ঠী কিংবা সামাজিক রক্ষণশীলতার কারণে নিষিদ্ধ, বিতর্কিত বা দমনের শিকার হয়েছিল। প্রতিটি পর্বে তুলে ধরা হবে একটি বইয়ের প্রকাশ-ইতিহাস, নিষিদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপট এবং সময়ের সঙ্গে তার সাহিত্যিক ও বৌদ্ধিক গুরুত্বের পুনর্মূল্যায়নের গল্প


নিষিদ্ধ শব্দবাণ-১
জিভাগোর ইতিকথা

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম

লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক ডি. এইচ. লরেন্সের শেষ এবং সবচেয়ে বিতর্কিত উপন্যাস। আঠারো শতকের মধ্যভাগ থেকে উনিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের সূচনা ঘটে। এ সময় দেশটি কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে যন্ত্রচালিত উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রবেশ করে। এর প্রভাবে ইংল্যান্ডের সমাজব্যবস্থাতেও মৌলিক রূপান্তর ঘটে যায়। লরেন্স দেখিয়েছেন, সাধারণভাবে ক্রমবর্ধমান কৃত্রিমতার কারণে কীভাবে আবেগিক ও শারীরিক সম্পর্কে উচ্চবিত্তরা জীবনীশক্তিহীন আর নিম্নবিত্তরা অবমাননাকর জীবনযাপন করছে। অভিজাত এক নারী এবং এক শ্রমজীবী শিকারকর্মীর মধ্যকার খোলামেলা যৌনতার কারণে লেডি চ্যাটার্লিজ আমেরিকা ও ব্রিটেনে তুমুল বিতর্কের জন্ম দেয়। ব্রিটেনের প্রকাশকরা বইটি ছুঁয়ে দেখেননি আর লরেন্স ব্যক্তিগতভাবে উপন্যাসটি ইতালি থেকে প্রকাশ করেন।

লেডি চ্যাটার্লিজ লাভারের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে লেডি কনি চ্যাটার্লি এবং তাদের জমিদারির শিকাররক্ষী অলিভার মেলোর্সের মধ্যকার পরকীয়া প্রেমকে কেন্দ্র করে। তরুণী কনির স্বামী স্যার ক্লিফোর্ড একজন সামন্ত ভূস্বামী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে গুরুতর আহত হয়ে তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে ফিরে এসেছেন; শারীরিকভাবে নপুংসক। কনি যৌন দিক থেকে হতাশ এবং সে যে সমাজে বাস করে তার কৃত্রিম ও বন্ধ্যা দিকগুলোর প্রতি ক্রমে অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠে। স্বামী ক্লিফোর্ড তার সামাজিক বৃত্তের অন্য কোনো পুরুষের মাধ্যমে কনিকে গর্ভবতী হয়ে উত্তরাধিকার উপহার দেওয়ার কথা বলে। স্বামীর এই প্রস্তাবে কনি ভীষণ বিরক্ত হয়। তার কাছ থেকে সে আরও দূরে সরে যায়। কনি আকৃষ্ট হয় তাদের জমিদারির শিকারভূমির রক্ষক মেলোর্সের প্রতি। লরেন্স মেলোর্সকে ‘প্রকৃতি-পুরুষ’ বা ন্যাচারাল ম্যান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সমাজ তাকে জীবনীশক্তিহীন বা অবমাননাকর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারেনি। লরেন্স দেখিয়েছেন, মেলোর্সের রুক্ষ বাহ্যিক রূপ এবং মৌখিক অভিব্যক্তির আড়ালে তার মধ্যে উচ্চ বিকশিত আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার বোধ লুকিয়ে আছে। কনি ও মোলোর্স প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। তাদের এই সম্পর্কটি ছিল গভীর আবেগপূর্ণ। দুজনের শারীরিক মিলনও ঘটে অত্যন্ত কোমল মধুর পরিবেশে। উপন্যাসের বেশ কিছু অংশে দেখা যায় তাদের যৌনমিলন এবং কথাবার্তায় যৌনাঙ্গ ও শারীরিক ক্রিয়াকলাপের বিস্তারিত অকপট বর্ণনা রয়েছে। এতে লরেন্সের দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রকাশ ঘটেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে যৌনমিলন হচ্ছে এক ধরনের প্রাকৃতিক পবিত্র সম্মিলন। এরপর মেলোর্স নারী-শরীরের স্পর্শকাতর যে বর্ণনা দিয়েছে, তাকে আদি মানব-প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়। কনিও গভীর আগ্রহ নিয়ে সেটা বোঝার চেষ্টা করেছে। এই ধরনের দৃশ্য ও সংলাপের কাহিনি এবং চরিত্রের বিকাশের জন্য প্রাসঙ্গিক হওয়া সত্ত্বেও উপন্যাসটি নিষিদ্ধের দাবি ওঠে। উপন্যাসের শেষ দিকে কনি মেলোর্সের মাধ্যমে গর্ভবতী হয় এবং ক্লিফোর্ডের কাছ থেকে বিবাহবিচ্ছেদ পাওয়ার পর তাকে বিয়ে করার পরিকল্পনা করে।

লেডি চ্যাটার্লিজ লাভারকে আন্তঃশ্রেণি সম্পর্কের দিক থেকেও ব্যাখ্যা করা যায়। লরেন্স বিয়ে করেছিলেন এক জার্মান ব্যারনের কন্যা ফ্রিদা উইকলিককে। তার মৃত্যু পর্যন্ত এই বিয়ে টিকে ছিল এবং সেটা ছিল ‘মুক্ত বিয়ে’। পরস্পরের সম্মতিতে তারা দুজনেই তাদের প্রেমিক-প্রেমিকাদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন।

নিষিদ্ধের ইতিহাস
লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৮ সালে ইতালির ফ্লোরেন্স থেকে। প্রকাশক ছিলেন লরেন্স নিজেই। ১৯২৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে উপন্যাসটির আমদানি নিষিদ্ধ করা হলেও পরের বছর বেরোয় ফ্রান্স থেকে। ১৯৫৯ সালে একজন মার্কিন বিচারক বইটির সাহিত্যিক গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে এটি প্রকাশের অনুমতি দেন। ইংল্যান্ডে এটি প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে, প্রকাশক পেঙ্গুইন বুকস। প্রকাশের ঠিক পরেই ইংল্যান্ডের পাবলিক প্রসিকিউশনের পরিচালক উপন্যাসটিকে অশ্লীল আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধের দাবিতে আদালতের দ্বারস্থ হন।

মার্কিন সরকার ১৯২৯ সালে উপন্যাসটিকে অশ্লীল ঘোষণা করে ডাক বিভাগ বা চিঠিপত্রের মাধ্যমে সে দেশে এর প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। ফলে, ইউরোপ থেকে এই উপন্যাসের কপি নিয়ে ফেরা মার্কিন পর্যটকরা কাস্টমস বা শুল্ক বিভাগে বইটি বাজেয়াপ্ত হওয়ার মুখোমুখি হতেন। স্পষ্ট যৌন বর্ণনা এবং চরিত্রগুলোর ব্যবহৃত ভাষা—উভয় কারণেই উপন্যাসটি নিয়ে আপত্তি উঠেছিল। তবে অধিকাংশ পাঠক ও সমালোচকরা এর শিল্পমূল্যের পক্ষেই মতপ্রকাশ করেছিলেন।

আমেরিকাতে অশ্লীল বা আপত্তিকর বই প্রকাশের বিরুদ্ধে তখন কাজ করত নিউইয়র্ক সোসাইটি ফর দ্য সাপ্রেশন অব ভাইস নামের একটি সংগঠন। এই সংগঠনের সম্পাদক লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার বইটি বিক্রির অভিযোগে ১৯২৯ সালে ডানস্টার হাউস বুকশপের মালিক জেমস এ. ডিল্যাসি এবং তার কর্মাধ্যক্ষ জোসেফ সুলিভানের বিরুদ্ধে আদালতে নালিশ ঠুকে দেন। ডিল্যাসি ও সুলিভান কেমব্রিজ জেলা আদালতে বিচারক আর্থার পি. স্টোনের দ্বারা দোষী সাব্যস্ত হন। ডিল্যাসিকে ৮শ ডলার জরিমানা এবং চার মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সুলিভানকে ২শ ডলার জরিমানা ও দুই সপ্তাহের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর মামলাটি রাজ্য সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়।

এক বছর পর মার্কিন সিনেটে উপন্যাসটিকে ঘিরে ঘটে আরেকটি চমকপ্রদ ঘটনা। ফিলাডেলফিয়ার একজন প্রসিকিউটর একটি বুকশপে অভিযান চালিয়ে তিনশ বই জব্দের নির্দেশ দেন। জব্দ করা এই বইগুলোর মধ্যে ছিল লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার। ১৯৩০ সালে ম্যাসাচুসেটস সুপ্রিম কোর্ট ডিল্যাসির সাজা বহাল রাখে এবং তাকে চার মাস জেল খাটতে হয়।

গ্রোভ প্রেস লরেন্সের ‘ফোর-লেটার ওয়ার্ডস’ বা চার অক্ষরের গালি বা অশ্লীল শব্দ এবং যৌন দৃশ্যসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ প্রকাশ করে। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন পোস্টমাস্টার জেনারেল ক্রিস্টেনবেরি এই বই ডাকযোগে পাঠানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। প্রকাশক আদালতের দ্বারস্থ হন। বিচারক প্রকাশকের আবেদন গ্রহণ করে বইটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। তিনি তার রায়ে বলেন, ‘আমি মনে করি, আমাদের সমাজবিকাশের এই পর্যায়ে উপন্যাসটি যৌনতা এবং যৌন সম্পর্ক নিয়ে লেখালেখির ক্ষেত্রে সমাজ যে সহনশীলতার সীমা নির্ধারণ করে দিচ্ছে, তা অতিক্রম করেনি।’

১৯৬০ সালে পেঙ্গুইন বুকস লিমিটেড ঘোষণা করে তারা লেডি চ্যাটার্লিজ লাভারের প্রথম অবিকৃত ব্রিটিশ সংস্করণ প্রকাশ করতে যাচ্ছে। এই ঘোষণার পর বইটি নিষিদ্ধ করার দাবিতে ইংল্যান্ডের ডিরেক্টর অব পাবলিক প্রসিকিউশনস পেঙ্গুইনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন। ব্রিটেনের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা মূলত এই ভাবনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন যে, উপন্যাসটির প্রভাবে অভিজাত শ্রেণির কোনো নারী হয়তো শ্রমজীবী শ্রেণির প্রেমিকের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে পারে।

আইনজীবী অর্থসহ উপন্যাসে ব্যবহৃত প্রতিটি যৌন-শব্দের একটি প্রতিবেদন জুরিদের দিয়েছিলেন। বিবাদী পক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি দেন, এর ভাষা এবং তাতে যৌন বিষয়বস্তু থাকা সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে উপন্যাসটি অশ্লীল নয়। এর সাহিত্যমূল্য এবং অশ্লীলতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আদালত ৩৫ জন বিশেষজ্ঞকে আমন্ত্রণ করে তাদের মতামত দিতে বলেছিলেন। লেডি চ্যাটার্লির পক্ষে ছিলেন অক্সফোর্ডের সেন্ট হিল্ডাস কলেজের ফেলো ডেম হেলেন গার্ডনার, ঔপন্যাসিক ডেম রেবেকা ওয়েস্ট, ব্লুমসবারি গোষ্ঠীর ঔপন্যাসিক ই. এম. ফরস্টার এবং উলউইচের বিশপ। তারা ঘোষণা করেন—যৌনতা সম্পর্কে লরেন্সের দৃষ্টিভঙ্গি মূলত আত্মিক সম্পর্কের পবিত্রতাকেই উদযাপন করে। তাদের এই মতামত এবং জুরিদের তিন দিন ধরে আলোচনার পর পেঙ্গুইন বুকসকে সমস্ত অভিযোগ থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।

হাউস অব লর্ডসেও উপন্যাসটির মূল কাহিনি, অর্থাৎ একজন অভিজাত নারী এবং নিম্নশ্রেণির শিকারকর্মীর যৌন সম্পর্কের ঘটনা নিয়ে বিতর্ক ওঠে। একজন লর্ডকে জিজ্ঞাসা করা হয়—‘আপনি কি উপন্যাসের এই কাহিনিকে অনুমোদন করেন এবং আপনি কি চান আপনার স্ত্রী বইটি পড়ুক?’ প্রত্যুত্তরে ওই লর্ড বলেছিলেন, ‘আমার স্ত্রী বইটি পড়লে আপত্তি করব না। কিন্তু আমার কোনো কাজের লোককে পড়তে দেব কি না, নিশ্চিত নই।’

উপন্যাসটি এরপর নিষিদ্ধের বাধা অতিক্রম করে বাজারে এলে কয়েক দিনের মধ্যে ২ লাখের বেশি কপি বিক্রি হয়ে যায়। কয়েক মাসের মধ্যে তা পৌঁছায় ৩০ লাখে। এককভাবে শুধু ব্রিটেনেই লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার ছিল লরেন্সের সবচেয়ে বাণিজ্যসফল উপন্যাস।

১৯৬৫ সালে নিউজিল্যান্ডের ইনডিসেন্ট পাবলিকেশনস ট্রাইব্যুনাল লেডি চ্যাটার্লিজ লাভারের কম মূল্যের পেপারব্যাক সংস্করণটির বিক্রি ১৭ বছর বয়সের নিচের পাঠকদের জন্য নিষিদ্ধ করে রায় দেয়। বইটি তখন সেখানে মাত্র ৫ শিলিং দামে বিক্রি হচ্ছিল, যে অর্থ দিয়ে সস্তা এক প্যাকেট সিগারেট কেনা যেত। ট্রাইব্যুনাল স্বীকার করে, উপন্যাসটি ‘এমন একজন লেখকের গুরুত্বপূর্ণ রচনা, যিনি ইংরেজি সাহিত্যের একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক। বইটি তাই অশ্লীল প্রকাশনা আইনের আওতাভুক্ত করার উপযুক্ত নয়।’ এভাবেই গত শতকের ষাটের দশকে লরেন্সের লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার উপন্যাসটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত