শীর্ষ সন্ত্রাসী টেম্পুর জামিনে মুক্তি ঠেকাতে পুলিশের নির্ঘুম রাত

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৪:১১ পিএম

চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইসমাইল হোসেন টেম্পুর জামিনে মুক্তি ঠেকাতে নির্ঘুম রাত কেটেছে নগর পুলিশের। নতুন মামলায় তাকে 'শোন অ্যারেস্ট' না দেখাতে হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়ন এবং চট্টগ্রামের একটি আদালত বুধবার টেম্পুকে কারামুক্তির নির্দেশ দেওয়ায় তা ঠেকাতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে সিএমপির প্রসিকিউশন শাখা।

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল হোসেনের ভাষ্য, দুর্ধর্ষ এই সন্ত্রাসীকে গতকাল মঙ্গলবার রাতেই কারাগার থেকে মুক্তি দিতে সব প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু তার বিরুদ্ধে থাকা পিডব্লিউডি (প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন ওয়ারেন্ট) প্রত্যাহার না হওয়ায় কারাগার থেকে মুক্তি পায়নি। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রাম মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট-৪ আদালত টেম্পুর কারামুক্তির নির্দেশ দেন।

এদিকে আজ বুধবার (২৯ জুলাই) নির্দিষ্ট অভিযোগ বা মামলা ছাড়া গ্রেপ্তারকৃত কোনো আসামিকে অন্য মামলায় ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ দেখানো যাবে না—হাইকোর্টের দেওয়া এমন আদেশ স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে এ বিষয়ে জারি করা হাইকোর্টের রুল চার সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এ আদেশ দেন। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশিষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ নির্দিষ্ট মামলা ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে না এবং গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে অন্য মামলায় ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ দেখানো যাবে না মর্মে অন্তর্বর্তী আদেশ দেন। একইসঙ্গে এ বিষয়ে রুল জারি করেন আদালত।

জানা গেছে, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়নের আবেদন জানিয়ে গতকাল আদালতে আবেদন করেন।

আবেদনে বলা হয়, রিট পিটিশন নং-৭৯৪৮/২০২৬-এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ জুলাই বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ইসমাইল হোসেনকে ওই বিষয়ে ‘শোন অ্যারেস্ট’ না দেখাতে এবং হয়রানি না করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।

আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, হাইকোর্টের আদেশ কার্যকর থাকা অবস্থায় পরবর্তীতে তাকে একটি মামলায় ‘শোন অ্যারেস্ট’ দেখানো হয়েছে, যা আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থি। তাই ওই ‘শোন অ্যারেস্ট’ প্রত্যাহার করে আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন এবং পুলিশ কমিশনারের প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়। অন্যথায় আদালত অবমাননার কার্যক্রম শুরু হতে পারে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়। পরে আদালত আবেদনটি মঞ্জুর করে তার কারামুক্তির নির্দেশ দেন। 

সবশেষ আজ বুধবার (২৯ জুলাই) দুপুরে সিএমপি সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাইকোর্টের দেওয়া আদেশ আপিল বিভাগ স্থগিত করায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইসমাইল হোসেন টেম্পুর জামিনে মুক্তি ঠেকাতে নতুন অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর চেষ্টা করছে নগর পুলিশের প্রসিকিউশন শাখা। 

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সন্ত্রাসী টেম্পুর বিরুদ্ধে নগরের চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ ও বায়েজিদ বোস্তামি থানায় খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ, অস্ত্র ও মাদক আইনে অন্তত ৩০টি মামলা বিচারাধীন। এর আগে টেম্পু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে অন্তত ১৩ বার গ্রেপ্তার হয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও মাদকসহ নানান অপরাধে জড়িত। চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ, বায়েজিদ বোস্তামী, মুরাদপুরসহ আশপাশের এলাকায় ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা আদায়, সশস্ত্র মহড়া এবং আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। 

২০১৪ সালে চান্দগাঁও থানা পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় টেম্পু পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। এরপর বিভিন্ন সময়ে তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন তিনি। সিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (প্রসিকিউশন) হাসান ইকবাল বলেন, ইসমাইল হোসেন টেম্পু দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। সে এরআগে পুলিশের হাতে ১৩ বার গ্রেপ্তার হয়েছে। প্রতিবারই তিনি আইনের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। সে জামিনে মুক্তি পেলে আইনশৃঙ্খলার অবনতির আশংকা আছে৷ যেকোনো মূল্যে আইনী প্রক্রিয়ায় তার মুক্তি ঠেকাতে হবে।

পুলিশের ভাষ্য, বর্তমানে চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তার মুক্তি নিয়ে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। টেম্পুর জামিনে মুক্তির প্রক্রিয়া শুরুর পর গতকাল মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাত ১০টায় চট্টগ্রাম কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন দেশ রুপান্তরের এই প্রতিবেদক। এ সময় তিনি বলেন, 'ইসমাইল হোসেন টেম্পুর বিরুদ্ধে ২৫টির অধিক  ফৌজদারি মামলা রয়েছে৷ সব মামলায় তিনি জামিন পেয়েছেন। আদালতে নথিপত্র আমাদের হাতে এসেছে। তার বিরুদ্ধে নতুন কোন মামলায় না থাকায় যাচাই-বাছাই শেষে তাকে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে।' 

ইসমাইল হোসেন ওরফে ‘টেম্পু’ নগরীর চান্দগাঁও থানার পশ্চিম ফরিদারপাড়া এলাকায় বেড়ে ওঠেন। বাবার সঙ্গে টেম্পু (থ্রি-হুইলার) চালানোর কাজ করতেন বলেই তিনি ‘টেম্পু’ নামে পরিচিত হন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অল্প বয়সেই পরিবহন পেশা ছেড়ে চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়েন। পরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, মাদক ও অস্ত্র-সংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধে সম্পৃক্ত হন।

পুলিশ সূত্র জানায়, ৩৫ বছর বয়সী টেম্পুর বিরুদ্ধে ডাকাতি, ছিনতাই, খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, মাদক ও অস্ত্র আইনে একাধিক মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে একাধিকবার কাটা রাইফেল, পিস্তল, বন্দুকসহ বিভিন্ন অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০০৭ সালের দিকে বহদ্দারহাট, খতিবের হাট, মোহাম্মদপুর ও মুরাদপুর এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম শুরু করেন টেম্পু। পরে তিনি ‘টেম্পু বাহিনী’ নামে একটি সন্ত্রাসী দল গড়ে তোলেন, যার সদস্যসংখ্যা অর্ধশতাধিক। বাহিনীর সদস্যরা চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ ও বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বাড়ি নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করতেন টেম্পু; চাঁদা না পেলে গুলি ছোড়ার ঘটনাও ঘটিয়েছেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত