বিল্ডিং উপকরণ, নকশা প্রণয়ন, ভবন নির্মাণ, ইন্টেরিয়র থেকে সব ধরনের সেবায় ‘পিটুপি’ সাধারণ গ্রাহকের আস্থা অর্জন করেছে। ‘উইকন প্রপার্টিজ’ নামে প্রতিষ্ঠানটি ২০১৮ সালে রিয়েল এস্টেট খাতে যাত্রা শুরু করে। ইতিমধ্যে রুচিশীল নাগরিকের আস্থা-বিশ্বাসের ঠিকানা হয়েছে এটি। চট্টগ্রামে আধুনিক ও স্মার্ট ডিজাইনের ভবন নির্মাণের কারিগরি সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা আশরাফুল ইসলাম আলভী। সার্বিক বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তর চট্টগ্রামের ব্যুরো প্রধান ভূঁইয়া নজরুল
দেশ রূপান্তর : উইকন এত কম সময়ে গ্রাহকের আস্থা অর্জন করলো কিভাবে?
মোস্তফা আশরাফুল ইসলাম আলভী : ডিজাইন, নির্মাণ স্থাপত্য, ইন্টেরিয়র ও জীবনযাত্রার প্রতিটি উপাদান একই ছাদের নিচে থাকবেএই লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে ‘উইকন প্রপার্টিজ’ মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। অ্যাপার্টমেন্ট শুধু ইট পাথরের কাঠামো নয়, এটি একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা ও স্বপ্নের ঠিকানা। সেই ভাবনা থেকে ‘প্ল্যান ফর পারফেকশন’ দর্শন নিয়ে আমাদের পথচলা। দুটি প্রকল্প দিয়ে ২০১৮ সালে রিয়েল এস্টেট শিল্পে যাত্রা শুরু করলেও ইতোমধ্যে পাঁচ প্রকল্প সম্পন্ন করেছি। ঢাকা-চট্টগ্রামে চলমান রয়েছে আরো ৩১ প্রকল্প। এ পর্যন্ত ১২০টি অ্যাপার্টমেন্ট হস্তান্তর করা হলেও আগামী পাঁচ বছরে তা ১৫০০-তে উন্নিত হবে। নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রকল্প হস্তান্তর করতে পারছি। এতে গ্রাহকদের কাছে আমাদের আস্থা বেড়ে গেছে বহুগুণ।
দেশ রূপান্তর : খুব কম সময়ে ‘উইকন’ সফল হয়েছে। কিন্তু আমাদের রিয়েল এস্টেট শিল্পে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। প্রতিবন্ধকতাগুলো কী?
মোস্তফা আশরাফুল ইসলাম আলভী : দেখুন, একটি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে চলে কর্মীদের ঐকান্তিকতা এবং ব্যবসায় সততার ওপর। আমরা উইকনকে সেভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছি। এখন আমাদের একই ধারায় তো আর সকল আবাসন প্রতিষ্ঠান কাজ করে না। প্রতিটি কোম্পানির নিজস্ব পলিসি আছে এবং সেই পলিসি অনুযায়ী অগ্রসর হয়। তবে সবারই লক্ষ্য হওয়া উচিত গ্রাহকের সন্তুষ্টি।
আমাদের এই শিল্পে অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে অন্যতম হলো চট্টগ্রামে কাঠাপ্রতি জমির মূল্য অনেক বেশি। এলাকাভেদে কাঠাপ্রতি মূল্য ৮০ থেকে ২ কোটি টাকা। এতো বেশি টাকায় জমি কেনে আধুনিক স্থাপত্য নকশার টেকসই ভবন নির্মাণ সত্যি কষ্টকর। ভূমির মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি রয়েছে রড সিমেন্টেরও উচ্চমূল্য। আরও রয়েছে প্রকল্প অনুমোদন পেতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) থেকে নকশা অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা। শহরের ৪০ শতাংশ এলাকা এখনো পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ও সড়ক অবকাঠামো সেবার বাইরে। অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে ব্যাংক সুদের হার ১২ শতাংশ। এত বেশি সুদ দিয়ে ফ্ল্যাট কেনা নাগরিকদের জন্য কঠিন। এগুলোর সাথে যুক্ত হয়েছে দক্ষ প্রকৌশলী ও অভিজ্ঞ শ্রমিকের ঘাটতি। সব মিলিয়ে আমরা হাজারো প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।
দেশ রূপান্তর : এসব প্রতিবন্ধকতা সমাধান করে এগিয়ে যাওয়ার উপায় কী?
মোস্তফা আশরাফুল ইসলাম আলভী : এসব সমস্যা সমাধান ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের হাতে নেই। সরকার, সিডিএ, সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, ব্যাংকিং খাত এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে। ভবনের নকশা অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা কমাতে পারে সিডিএ। এক্ষেত্রে অনলাইন অনুমোদন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) এই পদ্ধতি চালুর ফলে ৩০ শতাংশ সময় কমে গেছে। একইসাথে ২০ থেকে ২৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি হাউজ ফাইন্যান্সিং চালু করা হলে মধ্যবিত্তের জন্য আবাসন সহজ হবে।
দেশ রূপান্তর : ঢাকায় স্যাটেলাইট সিটি গড়ে উঠলেও চট্টগ্রামে হচ্ছে না কেন?
মোস্তফা আশরাফুল ইসলাম আলভী : চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী হলেও দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনায় ঘাটতি রয়েছে। এখানকার ৬০ শতাংশ মানুষ মূল শহর এলাকায় বসবাস করে। এতে যানজট ও অবকাঠামোগত চাপ বাড়ছে। এই শহরে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন ছাড়া স্যাটেলাইট সিটি গড়ে তোলা কঠিন। ভারতের মুম্বাই কিংবা মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ জনগোষ্ঠী পরিকল্পিত স্যাটেলাইট শহরে বসবাস করছে। আমাদের এখানে স্যাটেলাইট সিটি গড়ে তোলার জন্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আহ্বান করতে হবে। তাদের সাথে দেশীয় কোম্পানিগুলো জয়েন্ট বেঞ্চারে কাজ করলে ফ্ল্যাটের দাম যেমন কম পড়বে তেমনিভাবে বিদেশি বিনিয়োগও বাড়বে। এর অন্যতম সুবিধা হলো বিদেশি কোম্পানিগুলো কম সুদে ঋণ পাবে, যা আমরা পাবো না। আর সুবিধা পাবে আমাদের গ্রাহকরা। এতে মধ্যবিত্তের অনেকে ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ পাবে।
দেশ রূপান্তর : একটি আধুনিক নগরের কী কী সুবিধা থাকা প্রয়োজন?
মোস্তফা আশরাফুল ইসলাম আলভী : একটি আধুনিক শহরে শুধু ভবন থাকলে হবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একজন ব্যক্তির জন্য ৯ বর্গমিটার সবুজ জায়গার প্রয়োজন; সেখানে চট্টগ্রামে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ থেকে এক বর্গমিটার এলাকা। নেই প্রশস্ত সড়ক ও স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল সিস্টেম। জোনভিত্তিক আন্তর্জাতিকমানের হাসপাতাল ও স্কুল থাকার কথা থাকলেও এই শহরে তা অনুপস্থিত। নেই নিরাপদ ও সময়নিষ্ট গণপরিবহন এবং শতভাগ ডিজিটাল নাগরিকসেবা। শিশু ও বয়স্কবান্ধব নাগরিকসেবার অভাবের পাশাপাশি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা রিসাইক্লিংপ্ল্যান্ট নেই। স্মার্ট, পরিবেশবান্ধব ও কমিউনিটিভিত্তিক আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
দেশ রূপান্তর : পরিকল্পিত আবাসনে রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো কীভাবে কাজ করতে পারে?
মোস্তফা আশরাফুল ইসলাম আলভী : ভবন নির্মাণ করাই রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব নয়। এক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোকে ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যাতে প্রকল্প হস্তান্তর করা যায় সেদিকে খেয়াল রাখার পাশাপাশি ভবন নির্মাণে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। চট্টগ্রাম ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে রয়েছে। তাই ভবন নির্মাণে ভূমিকম্প সহনশীল ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার ও নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জোর দেওয়া যায়।
দেশ রূপান্তর : আগামী ১০ বছরে আবাসনে চট্টগ্রামের কী কী পরিবর্তন দেখতে চান?
মোস্তফা আশরাফুল ইসলাম আলভী : চট্টগ্রামে জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। মিরসরাইতে ইকোনমিক জোনের বিস্তার ঘটছে। মহেশখালীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হচ্ছে। বলা যায়, আগামী ১০ বছরে এখানে তিন থেকে ৫টি স্যাটেলাইট সিটি গড়ে উঠতে পারে। এর উপযুক্ত স্থান হতে পারে পতেঙ্গা, আনোয়ারা ও মিরসরাই। সামনে স্মার্ট ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্ক মেট্রোরেল চালু হতে পারে। ভবনের অনুমোদনে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি প্রতিটি আবাসিক এলাকায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ সবুজ অঞ্চল দরকার। শিশু ও বয়স্কদের খেলার জায়গার পাশাপাশি আধুনিক বিনোদনের সুযোগ চাই। সরকারি-বেসরকারি ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে আগামী দশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বাসযোগ্য শহরে পরিণত হতে পারে প্রিয় চট্টগ্রাম।
