চট্টগ্রামে ৬০০ এনজিও, প্রয়োজন সমন্বিত ভূমিকা

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০১:৩৫ এএম

দেশের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) একজন সুপরিচিত সংগঠক, উন্নয়নকর্মী ও চিন্তাশীল ব্যক্তিত্ব ড. মো. আরিফুর রহমান। চার দশকেরও বেশি সময় তিনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন, যুব উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে নিরলস কাজ করছেন। তিনি ইপসার প্রতিষ্ঠা, সামাজিক উদ্যোক্তা হিসেবে অভিজ্ঞতা, শিল্পায়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য, এনজিও খাতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিজের ভাবনা জানিয়েছেন দেশ রূপান্তরকে। কথা বলেছেন স্টাফ রিপোর্টার মিনহাজ তুহিন ও সীতাকুন্ড প্রতিনিধি সাইফুল ইসলাম

দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রামের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এনজিওগুলো কোন ধরনের কাজ করে?

ড. মো. আরিফুর রহমান : চট্টগ্রাম বহুসংস্কৃতির একটি সমৃদ্ধ অঞ্চল। এনজিওগুলো এই অঞ্চলের তৃণমূল ও প্রান্তিক মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নে কাজ করে। বিশেষভাবে এনজিওগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারী ও যুব উন্নয়ন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি, মানবাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি এবং জীবিকাভিত্তিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। এছাড়া উপকূলীয় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে তারা স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করে।

দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রাম প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকা। এই অঞ্চলের দুর্যোগ মোকাবিলা ও পুনর্বাসনে এনজিওর ভূমিকা কী হতে পারে?

ড. আরিফুর রহমান : ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, পাহাড়ধস ও নদীভাঙনের মতো দুর্যোগের মুখোমুখি চট্টগ্রামকে সবসময় হতে হয়। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় এনজিওগুলো তিন প্রধান ধাপে কাজ করে। পূর্বাভাস ব্যবস্থা উপকূলীয় মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও মেরামত এবং ‘সিপিডি’ কমিটি গঠনের মাধ্যমে উদ্ধারকারী স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করা হয়। জরুরি সাড়াদান ধাপে দুর্যোগ চলাকালীন ও তাৎক্ষণিকভাবে দুর্গতদের উদ্ধার, রান্না করা খাবার, সুপেয় পানি, স্যালাইন ও জরুরি ওষুধ পৌঁছে দেওয়া হয়। সবশেষে টেকসই পুনর্বাসন ধাপে ঘরবাড়ি মেরামত, নতুন জলবায়ু-সহনশীল ঘর তৈরি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের কৃষি বীজ বা সম্পদ দিয়ে আবার অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করা হয়।

দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রাম মহানগরীর সমস্যা সমাধানে এনজিওগুলোর করণীয় কী?

ড. আরিফুর রহমান : চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রধান সমস্যাগুলো নিরসনে এনজিওগুলো বহুমুখী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রথমত, ড্রেন বা নালায় পলিথিন ও বর্জ্য ফেলার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে নাগরিকদের সচেতন করা এবং প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার জোরদার করার মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় অবদান রাখা সম্ভব। পাহাড়ধস রোধে বাসিন্দাদের পুনর্বাসন ও বিকল্প জীবিকার সন্ধান দেওয়া এবং ব্যাপকভাবে সবুজায়নে অংশ নেওয়া প্রয়োজন। বায়ুদূষণ নিরসনে বনায়ন বৃদ্ধি, পাহাড় কাটা রোধে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং পরিবেশবান্ধব ইটভাটা ও শিল্পে ইটিপি ব্যবহারে সহায়তার পাশাপাশি বায়ুমান পর্যবেক্ষণ, গবেষণা ও নীতিগত সুপারিশ করা যেতে পারে। এছাড়া যানজট হ্রাসে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও বিকল্প রুট নিয়ে গবেষণা করা, পথচারী ও গণপরিবহনবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়ন, হকার পুনর্বাসন এবং চালকদের ট্রাফিক আইন ও নিরাপদ ড্রাইভিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা জরুরি। যুব বেকারত্ব দূরীকরণে আইটি, কারিগরি ও শিল্পভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া, উদ্যোক্তা তৈরিতে বীজ মূলধন, ইনকিউবেশন ও মেন্টরিং সেবা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে ইন্টার্নশিপ ও জব ফেয়ারের আয়োজন করা যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো ও কৃষির উন্নয়ন, কমিউনিটি-ভিত্তিক আগাম সতর্কীকরণ ও স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন এবং জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবিকা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রামে শিল্পায়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন?

ড. আরিফুর রহমান : শিল্পায়ন উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হলেও পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। চট্টগ্রাম অঞ্চলে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি শিল্পায়নের কারণে কীভাবে সমুদ্র ও

প্রাকৃতিক সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারসাম্য রক্ষায় প্রথমত পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন কঠোরভাবে মেনে চলা আবশ্যক। দ্বিতীয়ত, পরিবেশবান্ধব সবুজ প্রযুক্তি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শূন্যবর্জ্য নীতি নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, পরিবেশ রক্ষায় এলাকাভিত্তিক ‘কমিউনিটি ওয়াচডগ’ গড়ে তুলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ করতে হবে এবং  স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : দেশের এনজিও খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

ড. আরিফুর রহমান : বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের এনজিও খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থায়নের অনিশ্চয়তা। বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে আন্তর্জাতিক অনুদান ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে এবং উন্নয়ন সহযোগীদের অগ্রাধিকারও পরিবর্তিত হচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : ইপসা প্রতিষ্ঠার গল্পটা যদি একটু বলতেন?

ড. আরিফুর রহমান : ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘ যখন ‘আন্তর্জাতিক যুববর্ষ’ ঘোষণা করে, তখন এর মূল সুর ‘অংশগ্রহণ, উন্নয়ন ও শান্তি’ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এই বৈশ্বিক আহ্বানে অনুপ্রাণিত হয়ে আমি উপলব্ধি করি সমাজকে বদলে দিতে যুবশক্তিকে কাজে লাগানো সবচেয়ে জরুরি। এই চিন্তা থেকে স্থানীয় সচেতন যুবকদের সংগঠিত করে ১৯৮৫ সালের ২০ মে প্রতিষ্ঠা করি ‘ইয়ং পাওয়ার’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী যুব ক্লাব। শুরুতে মূল কাজ ছিল তামাক ও মাদকবিরোধী প্রচারণা, গাছ লাগানো এবং রক্তদানের মতো ছোট ছোট সামাজিক কর্মকান্ড। তবে এই ক্লাবে সবচেয়ে বড় মোড় আসে ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর। সেই ভয়াবহ দুর্যোগে আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উপকূলীয় মানুষের ত্রাণ ও পুনর্বাসনে ঝাঁপিয়ে পড়ি। এই বড় দুর্যোগ সামলাতে গিয়ে বুঝতে পারি, ক্ষণস্থায়ী ক্লাবের কাজের চেয়ে মানুষের ভাগ্য বদলাতে দীর্ঘমেয়াদি পেশাদার উদ্যোগ প্রয়োজন। সেই উপলব্ধি থেকে ১৯৯২ সালে এটি রূপান্তরিত হয় পূর্ণাঙ্গ অলাভজনক উন্নয়ন সংস্থা ‘ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন’ বা ইপসাতে।

দেশ রূপান্তর : কাজ করতে গিয়ে বিদেশি সহযোগিতা কেমন পাচ্ছেন?

ড. আরিফুর রহমান : আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের কারণে এবং বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ায় অনেক আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা তহবিল গুটিয়ে নিচ্ছে বা সীমিত করে দিচ্ছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট এবং দেশে রোহিঙ্গা সংকটের দিকে আন্তর্জাতিক নজর চলে যাওয়ায় অন্যান্য নিয়মিত উন্নয়ন ফান্ডের পরিমাণ কমেছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, মানবিক কার্যক্রম, গ্রাম আদালত, ক্ষুদ্রঋণ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এখনো সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রামে বর্তমানে কতগুলো এনজিও কাজ করে?

ড. আরিফুর রহমান : চট্টগ্রামে ছোট-বড় মিলিয়ে এনজিও বিষয়ক ব্যুরো, সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং এনজিওদের বিভিন্ন নেটওয়ার্কের নিবন্ধিত প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ এনজিও বা উন্নয়ন সংস্থা সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের উল্লেখযোগ্য বড় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ প্রতিষ্ঠান বড় পরিসরে কাজ করে।

দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রামে কাজ করতে গিয়ে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে?    

ড. আরিফুর রহমান : চট্টগ্রামে উন্নয়নমূলক কাজ করতে গিয়ে কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। যেমন সিডিএ, সিটি করপোরেশনসহ একেক সংস্থার কাজের ধরন একেক রকম হওয়ায় যৌথভাবে দীর্ঘমেয়াদি কাজ করা অনেক সময় জটিল হয়ে পড়ে। তাছাড়া বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকটের কারণে আগের মতো বৈদেশিক অনুদান পাওয়া কষ্টকর, ফলে কাজের পরিধি বজায় রাখা কঠিন হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে প্রকল্প অনুমোদন এবং ছাড়পত্র পেতে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক বিলম্ব দেখা যায়। পাশাপাশি দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল ও দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় দ্বীপগুলোতে কাজ পরিচালনা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সীমিত অর্থায়ন, দ্রুত নগরায়ণ ও জনসচেতনতার অভাবের মতো সমস্যাগুলোও কাজের ক্ষেত্রে বড় বাধা সৃষ্টি করে।

দেশ রূপান্তর : আগামী ১০ বছরে এনজিও খাতকে কোন অবস্থায় দেখতে চান?

ড. আরিফুর রহমান : আগামী এক দশকে আমি এনজিও খাতকে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উদ্ভাবনী সামাজিক উদ্যোক্তা হিসেবে দেখতে চাই। এর জন্য প্রথমত স্বাবলম্বী হতে হবে। অর্থাৎ বিদেশি অনুদানের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সামাজিক ব্যবসা বা আয়ের উৎস তৈরির মাধ্যমে ফান্ড সংগ্রহ করতে হবে। দ্বিতীয়ত প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়াতে হবে। যেখানে এআই, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং ডিজিটাল সার্ভিস ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নয়নমূলক কাজের কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব হবে। তৃতীয়ত, যুব নেতৃত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে আগামী দিনে তরুণ প্রজন্মকে সামাজিক পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে নিয়ে আসতে হবে। এবং চতুর্থত ন্যায্য অংশীদারত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক এনজিওদের সাথে দেশীয় বা স্থানীয় এনজিওগুলোর সমমর্যাদার সম্পর্ক নিশ্চিত করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত