বৈচিত্র্যময় মেজবান, বিশ্বজয়ের স্বপ্ন

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০১:৩৬ এএম

চট্টগ্রামে আধুনিক ক্যাফে সংস্কৃতির বিকাশের কথা উঠলে যে কজন উদ্যোক্তার নাম সবার আগে আসে, তাদের অন্যতম মঞ্জুরুল হক। অনেকের কাছে তিনি পরিচিত ‘চট্টগ্রামের ক্যাফে সংস্কৃতির পথিকৃৎ’ হিসেবে। ২০১৩ সালে একটি ছোট ক্যাফে দিয়ে যাত্রা শুরু করে তিনি গড়ে তুলেছেন বারকোড রেস্টুরেন্ট গ্রুপ।

কফি সংস্কৃতির প্রসার, থিমভিত্তিক রেস্টুরেন্ট, ঐতিহ্যবাহী মেজবানকে আধুনিক উপস্থাপনায় পরিবেশন এবং বাংলা খাবারের নতুন ব্র্যান্ডিংপ্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি দেখিয়েছেন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। ব্যবসার শুরু, সাফল্য-ব্যর্থতা, ক্যাফে সংস্কৃতির বিকাশ, খাদ্যশিল্পের চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দেশ রূপান্তর -এর সঙ্গে কথা বলেছেন বারকোড রেস্টুরেন্ট গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল হক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের ফটো সাংবাদিক আকমাল হোসেন

দেশ রূপান্তর : রেস্টুরেন্ট ব্যবসাকে কেন বেছে নিলেন?

মঞ্জুরুল হক : ছোটবেলা থেকে দেখেছি, ব্যবসা মানুষের প্রয়োজন পূরণের একটি মাধ্যম। বিদেশে পড়াশোনার সময় দেখেছি, একটি ভালো রেস্টুরেন্ট শুধু খাবারের জায়গা নয়; এটি মানুষের মিলনস্থল। তখন চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক মানের ক্যাফে সংস্কৃতি ছিল না। সেই শূন্যতা থেকেই ২০১৩ সালে বারকোডের যাত্রা শুরু।

দেশ রূপান্তর : শুরুটা কতটা কঠিন ছিল?

মঞ্জুরুল হক : মোটেও সহজ ছিল না। সিঙ্গাপুরে পড়াশোনার সময় একটি ক্যাফেতে কাজ করেছি। সেখান থেকে ক্যাফেসংস্কৃতি, সেবার মান ও গ্রাহকের রুচি সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা হয়। দেশে ফিরে সীমিত পুঁজি আর বড় স্বপ্ন নিয়েই শুরু করি। অনেকে বলেছিলেন, চট্টগ্রামে ক্যাফে চলবে না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম, মানসম্মত খাবার ও আন্তরিক সেবা মানুষ গ্রহণ করবে। সেই বিশ্বাস আমাদের আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

দেশ রূপান্তর : সবচেয়ে কঠিন সময় কোনটি ছিল?

মঞ্জুরুল হক : করোনা মহামারি। পুরো রেস্টুরেন্টশিল্প অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়। তখন ব্যবসার চেয়ে কর্মীদের চাকরি টিকিয়ে রাখাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সংকটই একজন উদ্যোক্তার প্রকৃত নেতৃত্বের পরীক্ষা নেয়।

দেশ রূপান্তর : বাবার কাছ থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?

মঞ্জুরুল হক : সততা ও প্রতিশ্রুতি। তিনি বলতেন, লাভ কম হতে পারে। কিন্তু মানুষের বিশ্বাস হারানো যাবে না। একজন গ্রাহকের আস্থাই সবচেয়ে বড় সম্পদ।

দেশ রূপান্তর : সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা কতটা কাজে লেগেছে?

মঞ্জুরুল হক : সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল স্ট্যান্ডার্ড। শুধু ভালো খাবার নয়, পরিচ্ছন্নতা, সময়ানুবর্তিতা, সেবা এবং ব্যবস্থাপনাসবকিছুই সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই মান বাংলাদেশেও প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছি।

দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রামে ক্যাফে সংস্কৃতি গড়ে তোলার শুরুতে কী ধরনের বাধা ছিল?

মঞ্জুরুল হক : অনেকে মনে করতেন, ক্যাফে মানেই কেবল কফি বিক্রির জায়গা। আমরা বোঝানোর চেষ্টা করেছি, এটি পরিবার, বন্ধু কিংবা সহকর্মীদের সময় কাটানোর একটি সামাজিক পরিসর। ধীরে ধীরে মানুষ সেটি গ্রহণ করেছে। এখন চট্টগ্রামের ক্যাফে সংস্কৃতি অনেক পরিণত।

দেশ রূপান্তর : মেজবানকে ব্র্যান্ডে রূপ দেওয়ার ভাবনা কীভাবে এলো?

মঞ্জুরুল হক : মেজবান চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় খাদ্যঐতিহ্য। কিন্তু এটি ছিল কেবল সামাজিক অনুষ্ঠানের খাবার। বিদেশি অতিথিরা মেজবান খেতে চাইলে তাদের নিয়ে যাওয়ার নির্ভরযোগ্য জায়গা ছিল না। তখনই ভাবলাম, একই স্বাদ ও মান বজায় রেখে সারা বছর যদি মেজবান পরিবেশন করা যায়, তাহলে এটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হতে পারে। সেই ভাবনা থেকে রে মেজ্জান হাইলে আয়্যুন। আজ শুধু বাংলাদেশ নয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতেও মেজবান জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : বারকোডের সাফল্যের মূলমন্ত্র কী?

মঞ্জুরুল হক : গুণগত মান, ধারাবাহিকতা এবং গ্রাহকের প্রতি সম্মান। প্রতিদিন একই মান বজায় রাখতে পারাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং সাফল্য।

দেশ রূপান্তর : নতুন ব্র্যান্ড চালুর আগে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেন?

মঞ্জুরুল হক : বাজারের চাহিদা, গ্রাহকের আচরণ এবং আন্তর্জাতিক প্রবণতা বিশ্লেষণ করি। ছোট পরিসরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই বড় বিনিয়োগে যাই।

দেশ রূপান্তর : বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

মঞ্জুরুল হক : কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, দক্ষ জনবলের অভাব এবং পরিচালনব্যয় বেড়ে যাওয়া। এগুলো এখন পুরো শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

দেশ রূপান্তর : অনলাইন ফুড ডেলিভারি ব্যবসায় কী পরিবর্তন এনেছে?

মঞ্জুরুল হক : এটি নতুন বাজার তৈরি করেছে। এখন রেস্টুরেন্টকে শুধু ডাইন-ইনের জন্য নয়, ডেলিভারির জন্যও সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুত থাকতে হয়।

দেশ রূপান্তর : নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারি সংস্থাগুলোর সহযোগিতা কেমন?

মঞ্জুরুল হক : আমরা চাই নিয়মিত পরামর্শভিত্তিক পরিদর্শন হোক। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ পাবে। শাস্তির পাশাপাশি সচেতনতা ও সহযোগিতাও জরুরি।

দেশ রূপান্তর : ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় কী আছে?

মঞ্জুরুল হক : বাংলা ঐতিহ্যবাহী খাবারকে আধুনিকভাবে উপস্থাপন এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।

দেশ রূপান্তর : বিদেশি পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশের খাবার জনপ্রিয় করতে কী করা প্রয়োজন?

মঞ্জুরুল হক : শুধু সুস্বাদু খাবার নয়, এর ইতিহাস, গল্প, উপস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করতে হবে। সরকার ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করলে বাংলাদেশ খাদ্য পর্যটনে অনেক দূর এগোবে।

দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রাম কি দেশের ‘ফুড ক্যাপিটাল’ হতে পারে?

মঞ্জুরুল হক : অবশ্যই। আমাদের রয়েছে বৈচিত্র্যময় খাবার, সমুদ্র, পাহাড় ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতি। পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক পর্যটকদের অন্যতম খাদ্যগন্তব্য হতে পারে।

দেশ রূপান্তর : আগামী ১০ বছরে বারকোডকে কোথায় দেখতে চান?

মঞ্জুরুল হক : আমার স্বপ্ন, বারকোড শুধু একটি রেস্টুরেন্ট গ্রুপ নয়; বাংলাদেশের আতিথেয়তা শিল্পের একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হয়ে উঠবে। চট্টগ্রামের মেজবান এবং বাংলা খাবারকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে দিতে চাই। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপেও বারকোডের মাধ্যমে মেজবান পরিবেশন হবে। দেশীয় স্বাদকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরাই আমাদের লক্ষ্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত