চট্টগ্রামের শিল্পায়নের ইতিহাসে পোশাক, শিপিং, ইস্পাত কিংবা বন্দরনির্ভর ব্যবসার আলোচনা বেশি হলেও নীরবে এগিয়ে যাচ্ছে ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প। সেই সম্ভাবনাময় খাতের অন্যতম প্রতিষ্ঠান ‘এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড’। পারিবারিক উদ্যোগে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানটি এখন দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। নতুন উৎপাদন ইউনিট, আন্তর্জাতিকমানের অবকাঠামো, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান রাইসুল উদ্দিন সৈকত-এর সঙ্গে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের ফটো সাংবাদিক আকমাল হোসেন
দেশ রূপান্তর : এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজের শুরু থেকে আজকের অবস্থানে আসার গল্পটা জানতে চাই।
রাইসুল উদ্দিন সৈকত : এলবিয়নের গল্প একটি পরিবারের স্বপ্ন, পরিশ্রম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গল্প। আমার বাবা মো. নেজাম উদ্দিন ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু করেন। তখন বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প আজকের মতো বড় ছিল না। সীমিত সুযোগ ও প্রযুক্তির মধ্যেও তিনি মানসম্মত ওষুধ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেন।
আমি অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা শেষে ২০০৬ সালে দেশে ফিরি। বিদেশে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ থাকলেও দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের সম্ভাবনা বিবেচনা করে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। দেশে ফিরে ব্যবসা সম্প্রসারণ, আধুনিক ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক বাজার ও রপ্তানির ওপর গুরুত্ব দিই। বর্তমানে আমরা তিন ভাইবোন মিলে বাবার স্বপ্নকে আরও বড় পরিসরে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি।
দেশ রূপান্তর : বর্তমানে এলবিয়নের উৎপাদন সক্ষমতা সম্পর্কে বলুন।
রাইসুল উদ্দিন সৈকত : বর্তমানে আমাদের উৎপাদন কার্যক্রম প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার বর্গফুটের আধুনিক স্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। এখানে ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, সিরাপ, সাসপেনশন, অয়েন্টমেন্ট, সফট জেলাটিন ক্যাপসুলসহ বিভিন্ন ধরনের ওষুধ উৎপাদন করা হচ্ছে।
ওষুধ শিল্পে উৎপাদনের চেয়ে মান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি ওষুধ সরাসরি মানুষের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন ও কঠোর মান নিয়ন্ত্রণকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই।
দেশ রূপান্তর : রপ্তানি কার্যক্রম কীভাবে শুরু হলো?
রাইসুল উদ্দিন সৈকত : রপ্তানি আমাদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার অংশ। তবে ওষুধ রপ্তানি সাধারণ পণ্য রপ্তানির মতো নয়। প্রতিটি দেশের নিজস্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন, নিবন্ধন ও মান যাচাইয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
২০২১ সালে আমরা প্রথম আন্তর্জাতিক রপ্তানি শুরু করি। প্রথম চালান যায় আফগানিস্তানের কাবুলে, যার মূল্য ছিল ৬৬ হাজার ৬৯০ মার্কিন ডলার। এরপর ইয়েমেনসহ বিভিন্ন বাজারে রপ্তানি শুরু হয়। বর্তমানে কম্বোডিয়া, আফগানিস্তান, মিয়ানমার, তিমুর ও জর্ডানসহ বিভিন্ন দেশে আমাদের পণ্য যাচ্ছে। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের ওষুধ রপ্তানি করছি।
দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রামভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কী ধরনের সুবিধা পাচ্ছেন?
রাইসুল উদ্দিন সৈকত : চট্টগ্রাম আমাদের বড় শক্তি। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এখানে থাকায় কাঁচামাল আমদানি ও পণ্য রপ্তানিতে সুবিধা পাওয়া যায়। এতে পরিবহন খরচ ও সময় দুটোই কমে। আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতেও চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
দেশ রূপান্তর : নতুন এলবিয়ন স্পেশালাইজড ফার্মা লিমিটেড নিয়ে কী পরিকল্পনা রয়েছে?
রাইসুল উদ্দিন সৈকত : এটি আমাদের জন্য একটি বড় মাইলফলক। সীতাকুন্ডে ২০২৩ সালে এলবিয়ন স্পেশালাইজড ফার্মা লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং ২০২৪ সালে উৎপাদন শুরু হয়। ২০ একর জমির ওপর প্রায় ২৪ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই প্ল্যান্টে আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
বর্তমানে এখানে প্রায় ৩৫ ধরনের ওষুধ উৎপাদিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে ১০০টির বেশি পণ্যের অনুমোদন রয়েছে। সফট জেলাটিন ক্যাপসুল ও ইনজেক্টেবল ওষুধ উৎপাদনের সুবিধাও থাকবে। পাশাপাশি অন্য প্রতিষ্ঠানের জন্য কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং সেবাও দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশ রূপান্তর : আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আপনাদের অগ্রাধিকার কী?
রাইসুল উদ্দিন সৈকত : মান নিয়ন্ত্রণই আমাদের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। প্রতিটি ব্যাচ বাজারে ছাড়ার আগে কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়। আধুনিক ল্যাবরেটরি, দক্ষ জনবল এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে আমরা উৎপাদন ব্যবস্থা পরিচালনা করছি।
দেশ রূপান্তর : ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি কতদূর?
রাইসুল উদ্দিন সৈকত : ইউরোপ ও আমেরিকার বাজার আমাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। এসব বাজারে প্রবেশের জন্য কঠোর মান, নিরাপত্তা, ডকুমেন্টেশন ও রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্স প্রয়োজন। আমরা ইতিমধ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন, ল্যাব সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের কাজ করছি। আশা করছি ২০২৮ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে এসব বাজারে প্রবেশের উপযোগী অবস্থানে পৌঁছাতে পারব।
দেশ রূপান্তর : ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ কী?
রাইসুল উদ্দিন সৈকত : সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা। বাংলাদেশের অধিকাংশ ওষুধ কোম্পানির মতো আমরাও বেশিরভাগ কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করি। ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তন আমাদের প্রভাবিত করে। তবে মান বজায় রেখে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে থাকার চেষ্টা করছি।
দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রাম কি ফার্মাসিউটিক্যাল হাব হতে পারে?
রাইসুল উদ্দিন সৈকত : অবশ্যই পারে। তবে এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণা, দক্ষ জনবল ও বিনিয়োগ প্রয়োজন। চট্টগ্রামের বন্দর সুবিধা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং শিল্প সম্ভাবনা কাজে লাগানো গেলে এখানে শক্তিশালী ফার্মাসিউটিক্যাল ক্লাস্টার গড়ে উঠতে পারে।
আমি চাই, আগামী এক দশকে চট্টগ্রাম শুধু বন্দরনগরী নয়, জ্ঞানভিত্তিক শিল্প ও উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পের কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত হোক।
দেশ রূপান্তর : আগামী ১০ বছরে এলবিয়নকে কোথায় দেখতে চান?
রাইসুল উদ্দিন সৈকত : আমরা চাই এলবিয়ন শুধু একটি সফল কোম্পানি নয়, বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রতীক হয়ে উঠুক। আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করা, নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করাই আমাদের লক্ষ্য।
আমরা বিশ্বাস করি, সঠিক পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক মান ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে চট্টগ্রাম থেকেই বিশ্বমানের ফার্মাসিউটিক্যাল ব্র্যান্ড গড়ে তোলা সম্ভব।
