২০০ টাকা মজুরিতে একটি ফলের দোকানে কাজ নেন তিনি। পরে আরেকটি দোকানে মাসিক ৩০০০ টাকা বেতনে চাকরি পান। দুই বছর পর নিজের ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। মূলধন না থাকায় একজন অংশীদারের সঙ্গে বহদ্দারহাট এলাকায় একটি ভাসমান ফলের দোকান চালু করেন। সাড়ে সাত হাজার টাকার মূলধন জোগান দেন তার অংশীদার, আর আরিফ দেন শ্রম ...
উদ্যোক্তা হওয়া শুধু একটি ব্যবসা শুরু করার নাম নয়; এটি সাহস, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের দীর্ঘযাত্রা। প্রতিকূলতা পেরিয়ে শুন্য থেকে সফলতার শিখরে পৌঁছানো সহজ নয়। তবে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম বরুমচড়ার আলী হোসেন আরিফ প্রমাণ করেছেন স্বপ্ন, কঠোর পরিশ্রম ও দৃঢ় সংকল্প থাকলে অসম্ভবও সম্ভব।
১৯৮৪ সালে জন্ম নেওয়া আরিফের শৈশব কেটেছে অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে। কৃষক বাবা নাছির আহমেদ ও মা সমুদা খাতুন সীমিত সামর্থ নিয়েও ছেলেকে শিক্ষিত করার স্বপ্ন দেখতেন। চার ভাই ও পাঁচ বোনের সংসারে তৃতীয় সন্তান আরিফ পড়াশোনা করতেন পটিয়া উপজেলার সাঁইদাইর এলাকার একটি মাদ্রাসায়।
দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় একদিন বাড়ি ফিরে পরিবারের আর্থিক সংকট আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেন তিনি। সেদিনই সিদ্ধান্ত নেন, পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হবে। কিন্তু পকেটে ছিল না কোনো অর্থ। এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে ৫০ টাকা ধার করে চলে আসেন বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। সেখান থেকেই শুরু হয় তার সংগ্রামের পথচলা।
প্রথমে সপ্তাহে ২০০ টাকা মজুরিতে একটি ফলের দোকানে কাজ নেন। পরে আরেকটি দোকানে মাসিক তিন হাজার টাকা বেতনে চাকরি পান। দুই বছর কাজ করার পর ২০০৩ সালে নিজের ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। মূলধন না থাকায় একজন অংশীদারের সঙ্গে বহদ্দারহাট এলাকায় একটি ভাসমান ফলের দোকান চালু করেন। সাড়ে সাত হাজার টাকার মূলধন জোগান দেন তার অংশীদার, আর আরিফ দেন শ্রম ও নিষ্ঠা।
সেই ছোট্ট উদ্যোগ বদলে দেয় তার জীবন। ২০১০ সালের মধ্যে বহদ্দারহাট এলাকায় তার মালিকানায় একাধিক ফলের দোকান গড়ে ওঠে। এরপর তিনি চট্টগ্রামের বৃহত্তম পাইকারি ফলের বাজার ফলমন্ডিতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন। ‘মেসার্স তৈয়বিয়া ফার্ম’ নামে পাইকারি ব্যবসা শুরু করে ধীরে ধীরে ফল আমদানির ব্যবসাতেও যুক্ত হন। পরে বাবা-মায়ের নামে প্রতিষ্ঠা করেন ‘এন.এস. ফ্রুটস ইন্টারন্যাশনাল’। তার হাত ধরেই পরিবারের অন্য ভাইয়েরাও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
নিজের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প বলতে গিয়ে আলী হোসেন আরিফ বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই ভাবতাম, কীভাবে মানুষের জন্য কাজ করা যায়। পরে বুঝতে পারলাম, উদ্যোক্তা হতে পারলে শুধু নিজের নয়, অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই আমার এই পথচলা।’
ব্যবসার পাশাপাশি সমাজসেবামূলক কর্মকা-েও পরিচিত মুখ আলী হোসেন আরিফ। অসহায় ও গরিব মানুষের চিকিৎসা সহায়তা, দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের বিয়েতে সহযোগিতা, শীতবস্ত্র বিতরণ, ঈদ উপহার প্রদান, ঘর নির্মাণ, বন্যাদুর্গতদের ত্রাণ বিতরণ, মসজিদ ও মাদ্রাসায় সহায়তা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এসব কাজ নিয়মিত করে আসছেন তিনি।
মানবসেবার বিষয়ে আরিফ বলেন, ‘আমার কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা নেই, নেই ব্যক্তিগত প্রচারের আগ্রহ। মানুষের সেবা করাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। গত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে সাধ্যমতো মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছি।’
স্থানীয়দের মতে, একজন সফল উদ্যোক্তা হওয়ার পাশাপাশি সমাজসেবক হিসেবেও আলী হোসেন আরিফ ইতোমধ্যে নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছেন। তার সংগ্রাম, সাফল্য ও মানবসেবার গল্প নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
