৩০ বছর ধরে একই সমস্যা, থাকবে আগামীতেও

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০১:২৮ এএম

প্যাসিফিক জিন্স : দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ববাজারে একটি স্বনামধন্য নাম। ১৯৯৪ সালে মো. নাছির উদ্দিন নিজ হাতে যে প্রতিষ্ঠানটির সূচনা করেছিলেন; আজ সেই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) দায়িত্বে আছেন তারই সন্তান সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর। দ্বিতীয় প্রজন্মের হাতে এগিয়ে চলছে প্রতিষ্ঠানটি। দেশের গার্মেন্টস শিল্পে অন্যতম নেতৃস্থানীয় প্যাসিফিক জিন্সের এমডির কাছে শিল্প-কারখানার সমস্যা ও সম্ভাবনা এবং চট্টগ্রামের সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে জানতে চেয়েছিল দেশ রূপান্তর।

কথা বলেছেন : দেশ রূপান্তর চট্টগ্রামের ব্যুরো প্রধান ভূঁইয়া নজরুল

দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রামের অনেক পোশাকশিল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কী?

সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর : দেখুন, একজন বিনিয়োগকারী অনেক স্বপ্ন নিয়ে একটি কারখানা স্থাপন করেন। সেখানে কর্মীরা কাজ করেন, ব্যাংক বিনিয়োগ করে, বিদেশি কোম্পানির সাথে কথা বলে কাজের অর্ডার নেয়াসহ প্রায় সব কাজ করার পর কেউ কিন্তু চায় না তার প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাক। এখন আমরা যদি এই কারখানা পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, কিংবা ব্যাংক থেকে আর্থিক সুবিধা দিতে না পারি কিংবা কারখানাটি সচল রাখার জন্য পর্যাপ্ত সাপোর্ট নিশ্চিত করতে না পারি তাহলে প্রতিষ্ঠানটি সচল থাকবে কীভাবে? আর কারখানা বন্ধের ঘটনা শুধু চট্টগ্রামে নয় সারাদেশে ঘটছে। তবে এটা সত্য, ঢাকার গাজীপুর বা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় গত তিন দশকে চট্টগ্রামের শিল্প কারখানাগুলো কম গ্যাস সংযোগ পেয়েছে। আর এই গ্যাসের অভাবেই অনেক শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

দেশ রূপান্তর : গ্যাস সংযোগ কারা পাবে আর কারা পাবে নাতা নিয়ে কোনো নীতিমালা আছে?

সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর : আমাদের গ্যাসসম্পদ সীমিত, কিন্তু চাহিদা বেশি। দেশে অনেক রপ্তানিমুখী শিল্প রয়েছে যেখানে গ্যাসের ব্যবহার অপরিহার্য। এখন সীমিত গ্যাস সম্পদের কারণে সরকারকে একটি দীর্ঘমেয়াদি এনার্জি পলিসি তৈরি করতে হবে। যেই পলিসির মাধ্যমে কোন ধরনের শিল্প খাতকে কত পরিমাণ গ্যাস বরাদ্দ দিলে বৈদেশিক রাজস্ব আয় কত হবে তা জানা যাবে। আর সেই হিসাবে প্রায়োরিটি নির্ধারণ করে গ্যাস বরাদ্দ দেয়া যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমরা যদি ১ কিউবিক ঘনফুট গ্যাস কোনো শিল্পকারখানায় বরাদ্দ দেই; তাহলে সেখান থেকে বৈদেশিক বাণিজ্যে কত টাকা পাবো এবং অন্যান্য কারখানায় দিলে কত পাবো। যে খাত থেকে বেশি বৈদেশিক আয় আসবে আমরা সেই খাতেই গ্যাস সংযোগ দিবো। এগুলো বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি এনার্জি পলিসি অডিট তৈরি করা যেতে পারে। তাহলে সীমিত গ্যাসের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে।

দেশ রূপান্তর : দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশ আসে গার্মেন্টস খাত থেকে। অন্যান্য খাত পিছিয়ে আছে। এতে কী দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব?

সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর : একটি দেশের অর্থনীতির মানদ- বিবেচনা করা হয় সেই দেশের জিডিপিতে রপ্তানি আয় কত শতাংশ। অর্থাৎ রপ্তানি ও জিডিপির অনুপাত কত সেই উপাত্ত। বাংলাদেশের ৫০০ বিলিয়ন ডলার জিডিপির মধ্যে রপ্তানি আয় থেকে আসে ৪৮ বিলিয়ন ডলার। এই ৪৮ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে পোশাক খাত থেকে আসে ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। যা মোট রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশ। মোট জিডিপির তুলনায় পোশাক শিল্প ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। আমাদের পাশর্^বর্তী দেশ ভারতে তা ২২ দশমিক ৩ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ১৯ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৯০ শতাংশ, কম্বোডিয়ায় ৬০ শতাংশ, নেপালে ৯ শতাংশ। এখন এই শতাংশ যত বেশি হবে ততই দেশের অর্থনীতি মজবুত হবে।

ভিয়েতনাম ও আমাদের দেশ প্রায় একই সময়ে স্বাধীনতা লাভ করেছে। দুই দেশের জিডিপিতে গার্মেন্টস পণ্যের অবদানও প্রায় সমান। ভিয়েতনামের ৪৫০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির মধ্যে গার্মেন্টস পণ্য থেকে আসে ৩৫ বিলিয়ন ডলার, যেখানে পোশাকশিল্পের অবদান ৮ শতাংশ। অপরদিকে বাংলোদেশের জিডিপিতে পোশাকশিল্পের অবদান ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। তাহলে ভিয়েতনামের রপ্তানি আয় বাংলাদেশের তুলনায় এতো বেশি কেন? এই প্রশ্ন সহজে উঠতে পারে। এর কারণ হলো ভিয়েতনাম শুধু গার্মেন্টস বেইজ পণ্য রপ্তানি করে না। তাদের আরও অনেক পণ্য রয়েছে। তাই মোট রপ্তানিতে আমরা পিছিয়ে আছি। সেজন্য আমাদের রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে।

দেশ রূপান্তর : গার্মেন্টস শিল্পে আমাদের রপ্তানি বাড়ানোর আগামীর চ্যালেঞ্জ কী?

সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর : আমরা রপ্তানি বাড়ানোর জন্য এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন করালে ডিউটি ফ্রি মার্কেট হারাবো। সেজন্য অনেক দেশ ইতিমধ্যে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করছে। আমরা এখনো তা করিনি। কিন্তু আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো এগিয়ে গেছে এই চুক্তিতে। ভারত এ পর্যন্ত ১৩ দেশের সাথে এফটিএ চুক্তি করেছে এবং ভিয়েতনাম ১৭, শ্রীলঙ্কা ৬ ও কম্বোডিয়া ১১ দেশের সাথে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করেছে। আর এই চুক্তির মাধ্যমে তারা এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা দ্রুত বিভিন্ন দেশের সাথে এফটিএ চুক্তি করতে না পারলে আগামীতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারি।

দেশ রূপান্তর : ব্যবসা বাণিজ্যে বন্দর-কাস্টমসের প্রতিবন্ধকতার কথা প্রায়ই উঠে আসে। এসবের বাস্তবতা কতটুকু?

সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর : দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে গত ৩০ বছর ধরে চেম্বার প্রেসিডেন্ট, বিজিএমইএ প্রেসিডেন্ট, বিজনেস লিডার, যেকোনো পলিসি ডায়ালগ অনুষ্ঠান কিংবা গোলটেবিল বৈঠক অথবা যেকোনো ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ যে সমস্যার কথা বলে আসছেন এখনো একই সমস্যা আছে এবং আগামীতেও থাকবে। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে, অনেক নেতা এসেছেন অনেকে চলে গেছেন। কিন্তু আমাদের সমস্যার কোনো পরিবর্তন হয়নি। গ্যাস ও এনার্জি সরবরাহ নেই, কিংবা বন্দর কাস্টমস থেকে পণ্য খালাসে জটিলতা বা ধীরগতি। আমরা যদি বৈশ্বিক সূচকের লজিস্টিকস প্ল্যাটফরম ইনডেক্স্রের দিকে তাকাই সেখানে আমাদের পাশর্^বর্তী দেশ ভারতের অবস্থান ৩৮, ভিয়েতনাম ৪৩ ও বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮। বিদেশি কোনো বিনিয়োগকারী এখানে ব্যবসা করতে এলে এসব সূচক দেখে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। অপরদিকে ট্রেডিং এক্রোস বর্ডার সূচকে ভারতের অবস্থান ৬৮, ভিয়েতনাম ১০৪ ও বাংলাদেশে ১৭৬-এ।

দেশ রূপান্তর : আগামীতে আমাদের বাণিজ্যের পরিধি কীভাবে বাড়ানো যায়?

সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর : ব্যবসা-‘বাণিজ্যের অন্যতম বিষয় হলো লজিস্টিক বিষয়গুলো দ্রুত নিশ্চিত করা। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক যে সূচকগুলো রয়েছে সেসব সূচকে আমাদের অবস্থার উন্নতি করতে হবে। এক্ষেত্রে দেশের বিসিক মডেলকে সক্রিয় করা যায়। আমরা যদি দেশজুড়ে আমাদের পণ্যগুলোর জন্য কিছু জোন বা ক্লাস্টার গড়ে তুলতে পারি তাহলে আমাদের রপ্তানি বাড়বে। যেমন- দেশের উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গ কিংবা দেশের অন্য কোনো অঞ্চলে ছোটো ছোটো ক্লাস্টার বা জোন গড়ে তুলতে পারে। যে পণ্যের সরবরাহ যে এলাকায় সেখানে সেই পণ্যের জোন সেই এলাকায় গড়ে তোলা যায়। এক্ষেত্রে এসএমইএ এন্টারপ্রাইজ (ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা) গুলোকে সংগঠিত করা। শুধু সংগঠিত করলেই হবে না তাদেরকে উপযোগী রপ্তানি পণ্য তৈরি বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও মাঠ পর্যায় পর্যন্ত একটি চেইনের মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে। অর্থাৎ একটি সাপ্লাই চেইন গড়ে উঠবে। সেই সাপ্লাই চেইনের মাধ্যমে পণ্যগুলো রপ্তানির জন্য রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর অধীনে একটি প্ল্যাটফরম গড়ে তুলতে হবে। এই প্ল্যাটফরমের মাধ্যমে সমন্বিত কর্ম পরিকল্পনায় পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনা যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত