চমেক হাসপাতালের কাঁধে পুরো চট্টগ্রামের চিকিৎসা

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০১:৩৪ এএম

‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ চট্টগ্রামের জনসংখ্যা হু হু করে বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো। স্বাস্থ্য খাতের সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং ভবিষ্যতের করণীয় নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) অধ্যাপক এবং শিশু কিডনি ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ মারুফ-উল-কাদের।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : স্টাফ রিপোর্টার মিনহাজ তুহিন।

দেশ রূপান্তর : একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে চট্টগ্রামের সার্বিক স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় ‘গ্যাপ’ বা দুর্বলতা আপনি কোনটিকে মনে করেন?

ডা. মোহাম্মদ মারুফ-উল-কাদের : প্রথম ও প্রধান দুর্বলতা হলো, পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের জেনারেল হাসপাতাল কিন্তু সেভাবে ভূমিকা রাখতে পারছে না; এটিকে অবিলম্বে আধুনিকায়ন করা জরুরি। ঢাকায় বেশ কয়েকটি সরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে, চট্টগ্রামে তা নেই। মেডিকেল কলেজের মূল বিশেষত্ব দুটি জায়গায়, এখানে দরিদ্র রোগীরা নামমাত্র মূল্যে চিকিৎসা পান এবং অধ্যাপক ও ফ্যাকাল্টি মেম্বাররা থাকায় জটিল রোগের সমাধান মেলে। যা সাধারণ সদর হাসপাতালে সম্ভব নয়। এমন সমন্বয় ধরে রাখতে চট্টগ্রামে অবিলম্বে আরেকটি বড় সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থাপন করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, চট্টগ্রামে বিশেষায়িত হাসপাতালের তীব্র অভাব রয়েছে। ঢাকায় পঙ্গু, কিডনি, হৃদরোগ বা চক্ষু হাসপাতাল থাকলেও চট্টগ্রামে তা নেই।

এছাড়া চমেক হাসপাতালে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া বা টাইফয়েডের মতো সহজ রোগীর অতিরিক্ত চাপ থাকে; যা উপজেলা বা সদর হাসপাতালেই চিকিৎসা সম্ভব। এসব রোগের চাপের কারণে জটিল রোগীর দিকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা পর্যাপ্ত মনোযোগ দিতে পারেন না। এছাড়া ১০০ শয্যার রেলওয়ে হাসপাতালটি অলস পড়ে আছে। ইনডোর সেবা চালু করা যায়নি।

এই পরিস্থিতি উত্তরণে পতেঙ্গা-মিরসরাই বেল্টে একটি এবং কর্ণফুলী নদী পার হয়ে শিকলবাহার দিকে আরেকটি হাসপাতাল করা দরকার। যাতে দক্ষিণ চট্টগ্রাম এবং শহরের চাপ ভাগ হয়ে যায়। পাশাপাশি দীর্ঘদিন আটকে থাকা চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ দ্রুত শেষ করে এটিকে শুধু ‘রেফারেল’ হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।

দেশ রূপান্তর : রোগীর সেবা পাওয়ার সার্বিক পরিবেশ কেমন? আন্তর্জাতিক বা ঢাকা মানের সেবা দেওয়ার মতো সক্ষমতা কি চট্টগ্রামে আছে?

মারুফ-উল-কাদের : এককথায় বললে, চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক মানের সেবা দেওয়ার মতো দক্ষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন। কিন্তু বড় অভাব হলো অবকাঠামোর। আমাদের দক্ষ কার্ডিওথোরাসিক সার্জন আছেন, কিন্তু তাদের কাজ করার উপযুক্ত ওটি, ওয়ার্ড বা পরিবেশ নেই। চীন সরকারের সহযোগিতায় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের যে অবকাঠামো হচ্ছে, তা একটি ভালো উদ্যোগ। এভাবে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা তৈরি করলে আমাদের তরুণ চিকিৎসকদের দক্ষতাকে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

দেশ রূপান্তর : উপজেলা পর্যায়ে কেন মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না?

মারুফ-উল-কাদের : উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসক কম নয়, বড় সমস্যা প্রাথমিক পর্যায়ের সকল পরীক্ষার সুযোগ না থাকা। অনেক স্থানে এক্স-রে বা অন্যান্য পরীক্ষা করার মেশিন নষ্ট, নয়তো ফিল্ম ও টেকনিশিয়ান নেই। চমেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ রোগী সাধারণ ডায়রিয়া বা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। প্রতিদিন গড়ে ১০-১৫ জন ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার শিশু ভর্তি হয়। শীতকালে এ সংখ্যা  আরো বেড়ে যায়। উপজেলা পর্যায়ে এগুলো সামাল দেওয়া গেলে এখানে চাপ অনেক কমত। আরেকটি বড় কারণ হলো জনগণের আস্থাহীনতা। সাধারণ মানুষ মনে করেন উপজেলায় নিউমোনিয়ার চিকিৎসা হবে না; যদিও যেকোনো মেডিকেল অফিসার এর চিকিৎসা দিতে সক্ষম। এই আস্থাহীনতা দূর করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরা দরকার।

দেশ রূপান্তর : নগরবাসীর প্রাথমিক চিকিৎসায় চসিকের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো কতটা ভরসার জায়গা? রোগীর দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছাতে চসিকের স্বাস্থ্যসেবা কীভাবে ঢেলে সাজানো যায়?

মারুফ-উল-কাদের : চসিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও বিশেষ করে টিকাদান কর্মসূচিতে চমৎকার কাজ করছে। মেমন মাতৃসদন হাসপাতালের পাশাপাশি সিটি করপোরেশন জেনারেল হাসপাতাল এবং অন্যান্য হাসপাতালে রোগী ভর্তি করে মেডিসিন, সার্জারি, অর্থোপেডিক্স ইত্যাদি সেবা চালু করা প্রয়োজন। প্রসূতি ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা বাড়াতে চসিকের আরও ডেডিকেটেড হাসপাতাল দরকার। এজন্য শহরের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ও অভিজ্ঞ স্বাস্থ্য প্রশাসকদের নিয়ে একটি শক্তিশালী ‘উপদেষ্টা পরিষদ’ গঠন করা যেতে পারে।

দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যসেবার সার্বিক মান উন্নয়নে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা সরকারের কোন কোন জায়গায় অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত?

মারুফ-উল-কাদের : প্রথমত, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও বিভাগীয় প্রশাসনের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় দরকার। হাসপাতালের জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম নষ্ট হলে বা প্রয়োজন হলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা না করে তা দ্রুততম সময় এমনকি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরবরাহের ক্ষমতা পরিচালককে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যেবাজেট বাড়িয়ে এর সঠিক বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, নেফ্রোলজি, ক্যান্সার বা কার্ডিয়াকের মতো বিষয়ে লোকাল ফোকাস বাড়াতে হবে। যাতে স্বল্প খরচে চট্টগ্রামে চিকিৎসা নিতে পারে। চট্টগ্রামে এখনও কোনো কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয় না। অথচ এটি খুব কঠিন কিছু নয়। ডায়ালাইসিস করতে একজন রোগীর সপ্তাহে প্রায় ৭ হাজার টাকা খরচ হয় যা বছরে অনেক; এর এক-তৃতীয়াংশ খরচে ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্ভব।

এছাড়া, চিকিৎসকদের প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে এনে যুক্তরাজ্যের এনএইচএসের মতো স্বতন্ত্র কাঠামো তৈরি করা দরকার। যাতে পদোন্নতি ও কাজের মর্যাদা সুরক্ষিত থাকে।

দেশ রূপান্তর : বিশ্বমানের সেবা নিশ্চিতে প্রযুক্তির দিক থেকে চট্টগ্রামের অবস্থান কেমন?

মারুফ-উল-কাদের : উন্নত প্রযুক্তির অভাবে আমাদের একটা পর্যায়ে গিয়ে থেমে যেতে হয়। কারণ পর্যপ্ত বিনিয়োগ নেই। যেমন- কোভিডের সময় তৈরি পিসিআর ল্যাবগুলো আপগ্রেড করে জিনগত পরীক্ষা চালু রাখা যেত। বর্তমানে জিনগত পরীক্ষার জন্য রোগীদের ঢাকায় ৩০-৩২ হাজার টাকা খরচ করতে হয়, যা চট্টগ্রামে করা গেলে ১০-১২ হাজার টাকায় নেমে আসত। এছাড়া চট্টগ্রামে এখনও কোনো ‘পেট স্ক্যান’ মেশিন নেই। হিস্টোপ্যাথলজির জন্য ইলেকট্রন/ইমুনো ফ্লুরিসেনট মাইক্রোস্কপি বা স্টোন অ্যানালাইসিস ইত্যাদি পরীক্ষার জন্য সুপার-স্পেশালাইজড ল্যাবও দ্রুত স্থাপন করা দরকার। তবে কেবল সরকারের ওপর নির্ভর না করে বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। ভারতে ‘টাটা মেমোরিয়াল’ বা পাকিস্তানের ডা. আবিদুল হাসান রিজভীর মতো চট্টগ্রামের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী বা ব্যক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে। শিল্পপতিরা তাদের সিএসআর ফান্ড দিয়ে বড় ক্যান্সার বা হৃদরোগ হাসপাতাল গড়ে তুলতে পারেন।

দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিশুদের কিডনি রোগের চিত্র কেমন এবং চিকিৎসায় কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে?

মারুফ-উল-কাদের : ২০১৩ সালে চমেক হাসপাতালে শিশু নেফ্রোলজি বিভাগ চালু হওয়ার পর ঢাকা নির্ভরতা অনেকটা কমেছে। তবে বর্তমানে কিছু নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। যেমন: শিশুদের পেডিয়াট্রিক ডায়ালিসিস ফ্লুইড বা হিমোডায়ালিসিসের ছোট ডায়ালাইজার/কেথেটার আমদানিতে লাভ কম হওয়ায় সরবরাহকারীদের আগ্রহ কম। এগুলো সহজলভ্য করতে হবে চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিশু কিডনি রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক। এর মধ্যে ৩৩ শতাংশ জন্মগত ত্রুটি, যা সঠিক সময়ে চিকিৎসায় ভালো হয়। প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ নেফ্রোটিক সিনড্রোমে আক্রান্ত যা ভালো হয়ে যায়। প্রান্তিক পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ ও সুবিধার অভাব থাকলেও নতুন, স্থানীয় চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ সংকট কাটানো সম্ভব।   ঢাকার বাইরে সব মেডিকেল কলেজে শিশুদের কিডনি রোগের চিকিৎসা বিস্তৃত করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যখাত টেকসই ও আধুনিক করতে অবিলম্বে কী কী পদক্ষেপে জোর দেওয়া উচিত?

মারুফ-উল-কাদের : প্রথমত, আরেকটি নতুন সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি শহরের চকবাজার বা পাঁচলাইশের ঘিঞ্জি এলাকা পরিহার করে একটি নির্দিষ্ট স্থানে সমন্বিত ‘বিশেষায়িত হাসপাতাল জোন’ গড়ে তুলতে হবে। এতে হৃদরোগ, ক্যান্সার বা কিডনির মতো বিশেষায়িত হাসপাতালগুলো একই এলাকায় থাকবে। ফলে রোগীদের একাধিক সেবার জন্য শহরজুড়ে দৌড়াদৌড়ি করতে হবে না। ভারতের ওড়িশার মতো জায়গায় এ ধরনের সফল মডেল দেখা যায়। দ্বিতীয়ত, উন্নতসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোকে সমন্বিত পরিকল্পনায় আনতে হবে। চতুর্থত, রেফারেল সিস্টেম চালু করতে হবে।

শেষ কথা হলো, মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, পরিচালক, সিভিল সার্জন ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, নগর পরিকল্পনাবিদ, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ, ইঞ্জিনিয়ার এবং অন্যান্যদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করে আগামী ২০ বছরের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ধরে পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত