পদ্মার চরে কাস্তেচরা

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫২ এএম

বহিঃস্থ পরীক্ষক হিসেবে এমফিল থিসিসের ভাইভা নেওয়ার জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি। পরীক্ষা শেষে ঢাকায় ফিরে না গিয়ে রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকার পাখির খোঁজখবর নিতে ক্যাম্পাসের জুবেরি হাউজে রয়ে গেলাম। ২৯ জুন ২০১৯-এর সকালটা ক্যাম্পাসের পাখিপ্রাণী পর্যবেক্ষণ করে দুপুরের খাবার সারলাম। খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে বেলা আড়াইটার দিকে শহরের বটতলা ঘাট থেকে ইঞ্জিন নৌকায় উঠলাম পদ্মা নদী ও আশপাশের চরের পাখি পর্যবেক্ষণের জন্য। বেলা সোয়া ৩টা নাগাদ মাজারদিয়ার চরের সোনাইকান্দি অংশে নামলাম। চরে নেমেই প্রথমে দেখা হলো একজোড়া লাল-লতিকা হট্টিটির সঙ্গে। খানিকটা হাঁটার পর চারটি শামুকখোলকে চরের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। প্রায় সিকি কিলোমিটার হাঁটর পর একটি শ্বেতলেজি শিলাফিদ্দা চোখে পড়ল। পাশেই একটি জলমগ্ন জমিতে চার চারটি ছোট সরালিকে চড়তে দেখলাম। ওখান থেকে হেঁটে আরেকটু সামনে যেতেই বাসাসহ বেশকিছু কালোবুক বাবুইয়ের দেখা পেলাম।

হাঁটতে হাঁটতে ও পাখি দেখতে দেখতে প্রায় এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার পর চরের মধ্যে ছোট একটি অস্থায়ী জলাধারের সন্ধান পেলাম। জলাধারের চারদিকে লম্বা লম্বা ঘাসে ছেয়ে আছে, যেন এক বিশাল ঘাসবন। এই ঘাসবনের কারণেই জলাধারটি সহজে নজরে আসে না। আমরা ধীর পায়ে ও নিঃশব্দে ঘাসের আড়ালে থেকে জলাধারটির কাছাকাছি গেলাম। জলাধারে হেঁটে হেঁটে খাবার খুঁজছে বিভিন্ন প্রজাতির সাদা বর্ণের জলচর পাখি। গো-বক, ছোট সাদা বক, বড় সাদা বক, শামুকখোলের সঙ্গে কালো-মাথা ও বাঁকানো ঠোঁটের সাত সাতটি পাখিও ছিল। ওদের দেখেই মনটা খুশিতে ভরে উঠল। কারণ এ সময়টা ওদের প্রজনন মৌসুমের শুরু। হতে পারে এক সময়ের আবাসিক পাখিগুলো এদেশে আবার বাসা করা ও ডিম-ছানা তোলার পরিবেশ ফিরে পেয়েছে। আর এটা হলে তো অত্যন্ত খুশির খবর। আবারও ওরা এদেশের বংশবৃদ্ধি করুক ও এদেশের আবাসিক পাখির তালিকায় নাম লেখাক সেই কামনাই করি। সর্বশেষ ২০২৬-এর ১৭ জানুয়ারি সকালে চাঁপাইনবাগঞ্জের রহনপুরের চরইল বিলে ওদের একটি ঝাঁক চোখে পড়ল।

রাজশাহীর পদ্মা নদীর চরে দেখা কালো-মাথা ও বাঁকানো ঠোঁটের বকের মতো দেখতে পাখিগুলো এদেশের এক সময়ের আবাসিক ও বর্তমানে সচরাচার দৃশ্যমান পরিযায়ী পাখি কাস্তেচরা। কালোমাথা কাস্তেচরা, কাঁচিচোরা, ধলবদনী বা সাদা দোচরা নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Black-headed Ibis, Oriental White Ibis, White Ibis, Indian White Ibis ev Black-necked Ibis। থ্রেস্কিওরনিথিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Threskiornis melanocephalus। যদিও আশির দশক পর্যন্ত পাখিটিকে এটিকে আবাসিক পাখি হিসেবে গণ্য করা হতো, কিন্তু পরিবেশগত বিপর্যয় ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে পাখিটি এদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস ও প্রজনন বন্ধ করে দেয়। তবে শীতে এদেশের উপকূলীয় কাদাচর, হাওর ও জলাভূমিগুলোতে ওদের নিয়মিত দেখা যায়। বর্তমানে ওরা এদেশে সংকটাপন্ন বলে বিবেচিত। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে প্রজাতিটির বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।

কাস্তের মতো নিচের দিকে বাঁকানো কালো, লম্বা ও মজবুদ ঠোঁটজোড়া এবং পালকবিহীন কালো মাথা-ঘাড়-গলা ছাড়া কাস্তেচরা একনজরে বকের মতো সাদা পাখি। দেহের দৈর্ঘ্য ৬৫-৭৫ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ১৩০ সেন্টিমিটার ও ওজন ১.১-১.৫ কেজি। দেহের উপরের অংশের সাদা পালকে কিছুটা ধূসর আভা দেখা যায়। লেজে রয়েছে ধূসর পালক। চোখ, পা, পায়ের পাতা ও আঙুল কুচকুচে কালো। স্ত্রী-পুরুষের চেহারায় কোনো পার্থক্য নেই। প্রজননকালে ঘাড়ের গোড়ায় মনোরম সুতোপালক ঝুলে থাকে। এ ছাড়া ডানার নিচের পালকহীন অংশে রক্ত-লাল ছোপ দেখা যায়। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথা ও ঘাড়ের নিচ ধূসর ও সামনের অংশ সাদা কোমল পালকে আবৃত। 

শীতে ওদেরকে চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের হাওর, বিল, নদী, মোহনা, প্লাবিত তৃণভূমি, জলাশয় ইত্যাদিতে বিচরণ করতে দেখা যায়। সচরাচর ঝাঁকে থাকে। কাদা ও অগভীর পানিতে কাস্তের মতো বাঁকা ঠোঁটটি ঢুকিয়ে দিয়ে মাছ, ব্যাঙ, শামুক-গুগলি, জলজ কীটপতঙ্গ ইত্যাদি ধরে খায়। ওড়ার সময় বকের মতো করে গলা ভাঁজ করে না। সচরাচর নীরব, তবে প্রজননকালে বাসায় নাকিসুরে ঘোঁত ঘোঁত শব্দ করে।

জুন থেকে অক্টোবর প্রজননকাল। সচরাচর বক, সারস ও পানকৌড়ির সঙ্গে উপনিবেশ বা কলোনি গড়ে বাসা বানায়। পানির ধারে আংশিক জলমগ্ন গাছে বা গ্রামীণ কুঞ্জবনে গাছের ডালে ডালপালা ও কাঠিকুটি দিয়ে মাচার মতো বাসা বানায়। ডিম পাড়ে দুই থেকে তিনটি, রঙ সাদা; যা ২২-২৪ দিন তা দেওয়ার পর ফোটে। বাসা বানানো, ডিমে তা দেওয়া ও ছানাদের লালনপালন বাবা-মা মিলেমিশে করে। ছানারা প্রায় ৪০ দিন বয়সে উড়তে শিখে। তবে অতিরিক্ত গরম এবং কাক ও মানুষের অত্যাচারে বাসাপ্রতি এক থেকে দুইটি ছানার বেশি বাঁচে না। আয়ুষ্কাল ১০ বছরের বেশি।

লেখা : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত