তীব্র বিরোধিতায় ফিফার নতিস্বীকার

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৬, ০২:৪৫ এএম

বিশ্বজুড়ে তীব্র বিরোধিতা, টুর্নামেন্ট বয়কটের হুমকি এবং নিজস্ব কর্মকর্তাদের পদত্যাগের মুখে অবশেষে নতিস্বীকার করেছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। ২০ বিলিয়ন ডলারের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠন করে বিশ্বকাপের অংশীদারত্ব ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করার আলোচিত ও বিতর্কিত পরিকল্পনাটি সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করেছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।

পরিকল্পনা বাতিলের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ফিফা সভাপতি বলেন, ‘সব পক্ষের মতামত গভীরভাবে পর্যালোচনার পর এটি পরিষ্কার যে, এই প্রজেক্টটি এমন বিভেদ তৈরি করেছে যা আমাদের মূল লক্ষ্যের সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আমাদের মূল উদ্দেশ্য সর্বদা ছিল এবং থাকবে; সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং ফুটবলের উন্নয়ন করা। ফলে এই প্রস্তাব আর সামনে এগোবে না।’

তবে এই সিদ্ধান্ত আসার আগে প্রস্তাবটি ঘিরে বিশ্ব ফুটবলে নজিরবিহীন প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ইউরোপীয় ফুটবলের সংস্থা উয়েফা অভিযোগ তোলে যে ফিফা ফুটবলের ‘আত্মা’ বিক্রির চেষ্টা করছে এবং উয়েফার ৫৫টি সদস্য দেশ সর্বসম্মতিক্রমে ফিফার সব টুর্নামেন্ট বয়কটের পক্ষে ভোট দেয়। এই প্রতিবাদের ঝড় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে উত্তর আমেরিকার কনকাকাফ ও এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন উয়েফার প্রতি পূর্ণ সংহতি জানিয়ে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে। তিনটি মহাদেশীয় সংস্থার অধীনে মোট ১৪৩টি দেশ একজোট হয়ে দাঁড়ায়, যা ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের অর্ধেকেরও বেশি।

এই অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চাপের প্রভাব পড়ে ফিফা প্রশাসনের অন্দরেও। ফিফা সভাপতির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস করদেইরো এই সিদ্ধান্তকে ‘ফুটবলের জন্য ক্ষতিকর’ অ্যাখ্যা দিয়ে পদত্যাগ করেন। অন্যদিকে, ফিফার চিফ অপারেটিং অফিসার কেভিন লামুর অভিযোগ করেন যে ইনফান্তিনো তার একক স্বার্থে পুরো ফিফা কর্মীদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন।

মূলত ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামের ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি সাবসিডিয়ারি গঠন করে বিশ্বকাপের মতো বড় ইভেন্টগুলোর পরিচালনা স্বত্ব নিয়ন্ত্রণের ছক কষেছিল ফিফা। প্রায় ২০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে প্রায় ৪.২ বিলিয়ন ডলার তহবিল সংগ্রহের এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল, যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জোশুয়া কুশনারের মালিকানাধীন ‘থ্রাইভ ক্যাপিটাল’-এর নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল। এমনকি আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে যেসব সদস্য দেশ এতে সম্মত হতো, তাদের প্রত্যেককে ৪ কোটি ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন ইনফান্তিনো। এই উচ্চাভিলাষী ও বিতর্কিত বাণিজ্যিক পরিকল্পনা থেকে ফিফার শেষ পর্যন্ত সরে আসাকে স্বাগত জানিয়েছেন এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা। তবে একই সঙ্গে ফিফাকে কঠোর বার্তাও দিয়েছে এএফসি; আগে থেকে কোনো ধরনের পূর্বাভাস বা আলোচনা ছাড়াই হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে সংস্থাটি।

পরিকল্পনাটি বাতিলের পর এএফসি সভাপতি স্পষ্ট করে জানান যে, ভবিষ্যতে ফুটবলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন যেকোনো উদ্যোগ অবশ্যই সময়মতো, স্বচ্ছ ও অর্থবহ উপায়ে কনফেডারেশন, ফিফা কাউন্সিল এবং অংশীজনদের সামনে উপস্থাপন করতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ সর্বদা সঠিক পরামর্শ, যৌথ সংলাপ এবং প্রচলিত শাসন কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই রূপ দিতে হবে।

বিশ্বকাপকে একটি ‘বিনিয়োগ পণ্য’ বানানোর প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়ায় বিশ্বজুড়ে সমর্থক ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে শেষ পর্যন্ত স্বস্তি ফিরে এসেছে। তীব্র রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ সামাল দেওয়ার পর ইনফান্তিনো জানিয়েছেন, আগামী দিনে তিনি সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে ফুটবলের মূল ধারা ধরে রেখে একযোগে কাজ করার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।

তবে বিতর্কিত প্রস্তাব প্রত্যাহার করলেও সহজে পার পাচ্ছেন না ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, আন্তর্জাতিক ফুটবলের শীর্ষ পদে থাকার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন ইনফান্তিনো। উয়েফা এখন এই পুরো ঘটনার একটি গভীর ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আগামী বছরের ফিফা নির্বাচনে তার বিকল্প খোঁজার জোর প্রস্তুতি শুরু করেছে।

শনিবার উয়েফা অত্যন্ত কড়া ভাষায় ফিফা সভাপতির বিরুদ্ধে তোপ দাগে, ‘অদৃশ্য ও মুখোশধারী কিছু ব্যক্তির মস্তিষ্কপ্রসূত গোপন ছক ও দ্রুত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ফুটবলকে আর চালাতে দেওয়া যায় না। এতে খেলাধুলার কোনো কল্যাণই হয় না। এই ঘটনার জন্য যারা দায়ী, তাদের চিহ্নিত করে অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’

উয়েফা আরও যোগ করে, ‘আগামী দিন ও সপ্তাহগুলোতে উয়েফা তাদের সদস্য দেশ এবং অন্য কনফেডারেশনগুলোর সঙ্গে একযোগে কাজ করবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কখনোই এভাবে ফুটবলকে গোপনে বিক্রি করার মতো ঘটনা না ঘটতে পারে। বর্তমান ফিফা নেতৃত্ব কেবল উয়েফা নয়, সমগ্র ফুটবল পরিবারের আস্থা হারিয়েছেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত