২ বছরে খেলাপি ঋণ পাঁচ শতাংশে নামাতে চাই

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৭:১১ এএম

দেশের চতুর্থ প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একটি এসবিএসি ব্যাংক। ২০১৩ সালে কার্যক্রম শুরু হওয়া ব্যাংকটি ইতিমধ্যে আধুনিক ও সম্ভাবনাময় ব্যাংক হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং, গ্রাহকসেবার মান উন্নয়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে। ব্যাংকটি ঝুঁকিব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মাধ্যমে ইতিবাচক অগ্রগতির পরিচয় দিয়েছে। এসবিএসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ইঞ্জিনিয়ার মো. মোখলেসুর রহমান। এর আগে তিনি ব্যাংকের ভাইস-চেয়ারম্যান ছিলেন। ব্যাংকের বর্তমান অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

প্রশ্ন : আপনি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা পেয়েছেন কী?

উত্তর : হ্যাঁ, পেয়েছি। দায়িত্ব নিয়ে ব্যাংকের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কিছু দুর্বলতা ও চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছি। সেগুলো কাটিয়ে উঠতে কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিব্যবস্থাপনা জোরদার, পরিচালন ব্যয় কমানোসহ আয় বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে ব্যাংকটি আরও শক্তিশালী ও টেকসই অবস্থানে পৌঁছাবে।

প্রশ্ন : ব্যাংকের পর্ষদে আপনার হস্তক্ষেপ নেই, এটা গ্রাহকরা বুঝবে কীভাবে?

উত্তর : ব্যাংকের পর্ষদের ওপর কোনো হস্তক্ষেপ আছে কি না, তা তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন, স্বচ্ছতা ও কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় প্রতিফলিত হয়। আমাদের পর্ষদ সম্পূর্ণভাবে নীতিমালা ও সুশাসনের ভিত্তিতে কাজ করছে। ঋণ অনুমোদন, ঝুঁকিব্যবস্থাপনা, অডিট ও অন্যান্য সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই হয়। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করাই লক্ষ্য।

প্রশ্ন : ব্যাংকের নামে ‘Agriculture’ থাকলেও কৃষক কতটা উপকৃত?

উত্তর : কৃষি খাতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকের দায়বদ্ধতা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা ও নির্দেশনা অনুযায়ী কৃষকদের জন্য কৃষিঋণ বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সহায়তা দিতে ব্যাংক নিয়মিতভাবে কৃষি ও পল্লীঋণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

প্রশ্নœ : ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে কত সময় লাগতে পারে?

উত্তর : প্রভিশন ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। এটি একদিনে সম্ভব নয়, তবে একটি সুপরিকল্পিত কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে ধাপে ধাপে এ ঘাটতি কমিয়ে আনা হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে জোর দেওয়া, ঋণের গুণগত মান উন্নয়ন, পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি ও মুনাফা বাড়ানোর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করা হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করে আমরা ধারাবাহিকভাবে কাজ করছি।

প্রশ্ন : খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে কী পরিকল্পনা রয়েছে?

উত্তর : খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ বাস্তবায়ন পর্যায়ে আছে। এর ইতিবাচক ফলও পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ২০ শতাংশ ছিল, যা ধারাবাহিক উদ্যোগের ফলে বর্তমানে ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে। আমারে লক্ষ্য আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এটা ১০ শতাংশের কাছাকাছি নিয়ে আসা। সেজন্য নিয়মিত ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার করা, বড় খেলাপিদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ঋণ পুনঃতফসিল, আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের নিবিড় পর্যবেক্ষণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

প্রশ্ন : দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয় কী?

উত্তর : বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের জন্য জরুরি হলো সুশাসন নিশ্চিত করা। এতে খেলাপি ঋণ কমবে, ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতাসহ গ্রাহকদের আস্থা বাড়বে। একই সঙ্গে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আধুনিক করা, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক তদারকি আরও কার্যকর করা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সম্প্রসারণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন : করপোরেট গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করতে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কীভাবে কাজ করছে?

উত্তর : ঋণ অনুমোদনে কঠোর ক্রেডিট মূল্যায়ন, যথাযথ জামানত যাচাই, গ্রাহকের নগদ প্রবাহ বিশ্লেষণসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করি। বোর্ড, অডিট কমিটি, রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কমিটি ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা হয়েছে। আমরা প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, নিয়মিত ঋণ পর্যালোচনা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্তের ওপর জোর দিচ্ছি।

প্রশ্ন : বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এসবিএসি ব্যাংকের সার্বিক পারফরম্যান্সকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

উত্তর : চ্যালেঞ্জের মধ্যেও এসবিএসি ব্যাংক টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার আমানত বেড়েছে, যা আগে ছিল ৯ হাজার কোটি। আমরা আমানত সংগ্রহ, ঋণের গুণগত মান, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণ ও পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি। একই সঙ্গে মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করছি।

প্রশ্ন : নতুন গ্রাহকরা আপনার ব্যাংকে আসবে কেন?

উত্তর : ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অনেক ব্যাংকই গ্রাহকের অর্থ ফেরত দিতে হিমশিম খেয়েছে, অনেক ব্যাংক গ্রাহকের অর্থ ফেরত দিতে পারেনি। সেখানে এসবিএসি ব্যাংকের গ্রাহকদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়নি। ফলে গ্রাহকের আস্থা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার কারণে ব্যাংকটির আমানত, হিসাবধারীর সংখ্যা, বিনিয়োগ, রেমিট্যান্স প্রবাহ, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ও খেলাপি ঋণ আদায়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূচকে অগ্রগতি হয়েছে। এসবিএসি ব্যাংক আগামী দিনে শুধু চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর মধ্যেই নয়, দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য ব্যাংকে পরিণত হবে।

প্রশ্ন : নগদবিহীন লেনদেন বাড়াতে ‘বাংলা কিউআর’কে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন?

উত্তর : ক্যাশহীন অর্থনীতি গড়ে তুলতে ‘বাংলা কিউআর’ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। আমরা ‘বাংলা কিউআর’-এর বিস্তার ও কার্যকর ব্যবহারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।

প্রশ্ন : ডিজিটাল ব্যাংকিং ও সাইবার নিরাপত্তায় ব্যাংকের বর্তমান প্রস্তুতি কেমন?

উত্তর : ডিজিটাল ব্যাংকিং এখন আর শুধু একটি সেবা নয়, এটি ব্যাংকিং খাতের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে সাইবার ঝুঁকিও বাড়ছে, তাই আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করছি, যাতে গ্রাহকদের তথ্য ও অর্থ সর্বোচ্চ সুরক্ষায় থাকে।

প্রশ্ন : ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই?

উত্তর : আগামী দুই বছরের মধ্যে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের মধ্যে নিয়ে আসার একটি লক্ষ্য রয়েছে। আমাদের ব্যাংকিং সেবাকে ‘গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড’-এ উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের দিকে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত