ধ্বংসের প্রান্তে পর্তুগিজ ভবন

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩৮ এএম

ধসে পড়েছে একাংশের দেয়াল। সামনের দিকে হেলে পড়েছে আরেক অংশ। চারদিকের প্লাস্টার খসে বেরিয়ে আসছে লাল ইট। দেয়াল আর ছাদে আগাছা থেকে জন্ম নেওয়া গাছের বয়স কয়েক বছর। চট্টগ্রাম সরকারি হাজী মুহম্মদ মহসিন কলেজের পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটির বর্তমান চিত্র এটি। কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কাছে এটি পর্তুগিজ ভবন নামে পরিচিত। ঔপনিবেশিক আমলে নির্মিত ভবনটি চট্টগ্রামের প্রথম আদালত ভবন বা ‘দারুল আদালত’ হিসেবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের অভাবে দীর্ঘ দুই যুগ ধরে পড়ে থেকে এখন এটি বিনাশের চূড়ান্ত প্রান্তে পৌঁছেছে। তবে ভবনটি সংরক্ষণে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর উদ্যোগ নিয়েছে।

সম্প্রতি মহসিন কলেজ ক্যাম্পাসে সরেজমিনে দেখা যায়, অনন্য স্থাপত্যশৈলীর দ্বিতল ভবনটি এখন জীর্ণতার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। এর ৩ ফুট চওড়া ইটের দেয়াল ও চুন-সুরকির গাঁথুনি থেকে খসে পড়ছে পুরনো প্লাস্টার, কোথাও কোথাও ধসে পড়েছে ভবনের অংশবিশেষ। ভেতরে ভূতুড়ে পরিবেশ, বিষাক্ত সাপ ও পোকামাকড়ের বসতি। এর মধ্যে জুলাইয়ের শুরুতে এক সপ্তাহের অতিভারী বর্ষণে ভবনের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক হয়ে গেছে। বৃষ্টির কারণে ভেতর থেকে বালু, ইট, মাটি সরে এসেছে। যেকোনো মুহূর্তেই ভবনটি ধসে পড়ার আশঙ্কা করছেন কলেজ সংশ্লিষ্টরা।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৭৬১ সালে ব্রিটিশরা চট্টগ্রামের শাসনভার গ্রহণের পর এই ভবনে চট্টগ্রামের প্রথম আদালত পরিচালনা শুরু করে। ফারসি ভাষায় ‘দারুল আদালত’ শব্দের অর্থ বিচারালয় ভবন। ১৮৩৭ সাল পর্যন্ত ফারসি ভাষা দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় ভবনটি এই নামেই পরিচিতি পায়। পরবর্তী সময়ে ১৮৫৭ সালের দিকে লালদীঘির পাড়ে ‘লালকুঠি’ বা লাল বিল্ডিংয়ে আদালত স্থানান্তরিত না হওয়া পর্যন্ত এটিই ছিল চট্টগ্রামের মূল আদালত।

ইতিহাসবিদ আব্দুল হক চৌধুরী তার ‘বন্দর শহর চট্টগ্রাম’ গ্রন্থে লিখেছেন, ব্রিটিশরা ১৭৬১ সালে চট্টগ্রাম দখল করার পরপরই ভবনটি নির্মিত হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনের প্রথম দিকে তারা তাদের আদালত স্থাপনের জন্য ভবনটি নির্মাণ করেছিল। মোগল ও পশ্চিমা বৈশিষ্ট্যে নির্মিত দোতলা ভবনটিতে দুটি টাওয়ার ছিল এবং প্রতিটি টাওয়ারে একটি করে গম্বুজ ছিল যেখান থেকে ব্রিটিশ প্রহরীরা বাইনোকুলার দিয়ে কর্ণফুলী নদী ও সমুদ্রে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণ করত।

তিনি জানান, ১৮৫৭ সালের দিকে ব্রিটিশ শাসকরা চট্টগ্রামের লালদীঘির পাশে লালকুঠিতে (লাল বিল্ডিং) আদালত স্থানান্তর না করা পর্যন্ত ভবনটি আদালত হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

তবে স্থানীয় লোককথায় এটি ‘পর্তুগিজ দুর্গ’ হিসেবেও পরিচিত। প্রবাদ আছে, ১৬ শতকে পর্তুগিজ জলদস্যুরা পাহাড়ের ওপর কৌশলগত কারণে এই ভবন নির্মাণ করেছিল এবং এর নিচে নদী পর্যন্ত যোগাযোগের সুড়ঙ্গ পথ ছিল। যদিও ইতিহাসবিদরা এই লোককাহিনির সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ পাননি।

মহসিন কলেজের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৭৯ সালে তৎকালীন চট্টগ্রাম মাদ্রাসা (বর্তমান মহসিন কলেজ) কর্তৃপক্ষ সরকার থেকে ৩০ হাজার টাকায় পাহাড়সহ ভবনটি ক্রয় করে। পরবর্তী সময়ে এটি দীর্ঘদিন কলেজের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) মহসিন কলেজ শাখার কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। তবে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কারণে ২০০২ সালে কলেজ কর্তৃপক্ষ ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে এবং এতে সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে ভবনের কক্ষগুলো ও পেঁচানো সিঁড়ির প্রবেশদ্বার সিলগালা করে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত করা রয়েছে। দেয়ালে ঝুলানো আছে পরিত্যক্ত ও ঝুঁকির বার্তা। ভবনটিতে ১৬টি কক্ষের পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম কোণে দুটি টাওয়ার রয়েছে। টাওয়ারে পৌঁছানোর জন্য দুটি সর্পিল সিঁড়ি রয়েছে। প্রতিটি টাওয়ারে আছে ছোট গম্বুজ।

ভবনটির পাশেই স্টাফ কোয়ার্টারে বসবাসকারী মহসিন কলেজ মসজিদের মুয়াজ্জিন আব্দুর রহিম বলেন, ‘আমি ১৮ বছর ধরে এই অবস্থায় দেখে আসছি ভবনটি। আগে ডিসি অফিসের লোকজন এসে ভবনে গজিয়ে ওঠা গাছপালা কেটে দিয়ে যেত। কয়েক বছর ধরে তাও দেখছি না। আমরাও মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে আছি।’

২০১৩ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ভবনটি পরিদর্শন করে একে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু সে সময় জমি হস্তান্তরের আইনি জটিলতায় বিষয়টি আটকে যায়। পরে ২০১৯ সালেও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এটিকে ‘চট্টগ্রাম বিভাগীয় জাদুঘর’ হিসেবে রূপান্তরের সুপারিশ করে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়। কিন্তু ‘এ পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হয়নি।

চট্টগ্রাম সরকারি হাজী মুহম্মদ মহসিন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক বেনুয়ারা বেগম বলেন, ‘আমরা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে বারবার চিঠি দিচ্ছি। কিছুদিন আগেই ভবনটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে তাদের জানিয়েছি। শিক্ষা প্রকৌশল দপ্তরেও চিঠি দিয়েছি। টানা ভারী বর্ষণে ভবন থেকে বালু ও ইট ধসে গেছে।’

ভবনটি সংরক্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে সিডিএর মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্পের পরিচালক ও উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আবু ঈসা আনছারী বলেন, ‘আমাদের ২০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান শেষ পর্যায়ে। এই মাস্টারপ্ল্যানে আমরা নগরীর ১০৫টি পুরনো ভবনকে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছি। এর মধ্যে মহসিন কলেজের পর্তুগিজ ভবনটিও রয়েছে। এই মাস্টারপ্ল্যানে পুরনো ভবনগুলো ঐতিহাসিক গুরুত্বসহ সংরক্ষণের জন্য প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের কাছে চিঠি দেওয়া হচ্ছে।’

এ বিষয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের আওতাধীন আগ্রাবাদ যাদুঘরের উপপরিচালক ড. নাহিদ সুলতানা বলেন, ‘আমরা মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন কয়েক মাস আগে আমাদের প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়েছি। ভূমি তফসিলটা হয়ে গেলে প্রধান কার্যালয় থেকে গেজেট প্রকাশ করার জন্য প্রতিবেদনসহ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর এটা নিয়ে কাজ করা যাবে।’

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতœতত্ত্ব ও জাদুঘর অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব দীপংকর বিশ্বাস বলেন, ‘কাজ কতটুকু এগিয়েছে বা থেমে আছে কেন, আমি পুরো বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব। পরবর্তী সময়ে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত