স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বর্তমান সরকার বিশ্বাস করে পুলিশ কোনো বিশেষ দলের বা গোষ্ঠীর লাঠিয়াল বাহিনী নয় বরং পুলিশ হবে জনগণের কৃত্রিম বন্ধু। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছি, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পুলিশ বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে একটি আধুনিক, সেবাধর্মী ও মানবিক সংস্থায় রূপান্তর করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
রবিবার (২ আগস্ট) সকালে রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে ২৭তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের প্রথম পর্যায়ের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
ছয় মাসব্যাপী কঠোর প্রশিক্ষণ শেষে আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ যেখানে সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হল ২৭তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচ ১ম পর্যায়ের শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপারদের মৌলিক প্রশিক্ষণ। ১ ফেব্রুয়ারী শুরু হওয়া ২৭তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচ ১ম পর্যায়ের ৫৮ জন প্রশিক্ষণার্থী আজকের এই প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে বাস্তব কর্মজীবনে প্রবেশ করলেন। সমাপনী কুচকাওয়াজের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে অভিবাদন গ্রহণ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পরে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন এবং নবীন কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন।
সমাপনী কুচকাওয়াজে বিশেষ অতিথি ছিলেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ, পুলিশের আইজি আলী হোসেন ফকির।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা এমন এক সময় দাঁড়িয়ে আছি যখন দেশ এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আগোচ্ছে। আপনারা এমন এক ব্যাচ যারা এক নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় কর্মজীবনে পদার্পণ করছেন। সুতরাং আপনাদের দায়িত্ব অনেক বেশি। রাষ্ট্রের এই রূপান্তরকালে আপনাদের নিজেদের উপযোগী করে প্রস্তুত করতে হবে। সততা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আপনাদের আচরণ হতে হবে মানবিক ও আইনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল। মনে রাখতে হবে, চেইন অফ কমান্ড, শৃঙ্খলা, আনুগত্য ও সমন্বিত নেতৃত্বই একটি বাহিনীর শক্তির মূল ভিত্তি।
প্রশিক্ষনার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনারা সমাজে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সৈনিক। আইনের প্রতি অবিচল আস্থা ও দেশের নাগরিকদের প্রতি দায়িত্ব ও জবাবদিহিতাই হবে আপনাদের কর্মের মূল ভিত্তি। মনে রাখবেন, আইনের চোখে সবাই সমান সেটিই হোক কোনো রাজনৈতিক কর্মী বা প্রান্তিক কৃষক, যে-ই হোক। সেবা নিতে এসে কেউ যেন কোনো বৈষম্যের শিকার না হয়, সে বিষয়ে আপনাদের সচেষ্ট থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনমনে স্বস্তি প্রদান ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা অগ্রগণ্য। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে অন্যান্য সকল প্রতিষ্ঠানের ন্যায় পুলিশ বাহিনীও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমান সরকার বিশ্বাস করে, পুলিশ কোনো বিশেষ দলের বা গোষ্ঠীর লাঠিয়াল বাহিনী নয় বরং পুলিশ হবে জনগণের কৃত্রিম বন্ধু। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছি, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পুলিশ বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে একটি আধুনিক, সেবাধর্মী ও মানবিক সংস্থায় রূপান্তর করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সেজন্য পুলিশ বাহিনীর মনোবল পুনপ্রতিষ্ঠাসহ একটি দক্ষ ও আধুনিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার ইতোমধ্যে জনবল বৃদ্ধিসহ নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো- পুরস্কার ও তিরস্কারের নীতি চালু করা। এরই অংশ হিসেবে সাহসিকতা ও প্রশংসনীয় কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পুলিশের সদস্যদের যেমন পুরস্কৃত করা হচ্ছে, একইভাবে শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও অপরাধের সঙ্গে জড়িত পুলিশের সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
নবীন কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আপনারা জনগণের সেবক হন। সাধারণ মানুষ যখন থানায় আসে, তারা যেন আপনাদের মধ্যে সেবার মানসিকতা দেখতে পায়। বর্তমান যুগ আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। সেজন্য ডিজিটাল অপরাধ দমনে আপনাদের সর্বোচ্চ কারিগরি জ্ঞান অর্জন করতে হবে। সাইবার নিরাপত্তা থেকে শুরু করে আধুনিক অপরাধ তদন্তে আপনাদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছে। দুর্নীতির করাল গ্রাস যেন আপনাদের স্পর্শ করতে না পারে, সেদিকে সদা সতর্ক থাকবেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ২৭তম পুলিশ ব্যাচ ১ম পর্যায়কে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, ২৭তম বিসিএস পুলিশ ব্যাচের প্রথম পর্যায়ের প্রতিটি সদস্য দেশ ও জাতির প্রত্যাশা পূরণে নিজেদের নিয়োজিত করবে। দীর্ঘ সময় বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থেকে আপনাদের লব্ধ জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ পুলিশকে সমৃদ্ধ করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ পুলিশের ঐতিহ্য ও গৌরব ধরে রাখতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ২০২৪ সালের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানাতে এবং একটি শান্তিপূর্ণ ও উন্নত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে আপনারা ভূমিকা পালন করবেন এই প্রত্যাশা রইল। আমি আপনাদের পেশাগত সাফল্য, সুস্বাস্থ্য এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করে আমার বক্তব্য শেষ করছি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমি আপনাদের এই প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজে উপস্থিত হতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত। আজকের এই আনন্দঘন দিনটি অনেক আগেই আপনাদের জীবনে আসার কথা ছিল। দীর্ঘ ১৮ বছরের প্রতীক্ষা ও সীমাহীন বঞ্চনা কতটা অমানবিক ও পীড়াদায়ক, তা সহজেই অনুমান করতে পারি আমরা, আপনারা। প্রায় দেড় যুগ আগে অবৈধ সরকারের প্রতিহিংসার শিকার হয়েছিলেন আপনারা। স্বৈরাচারী-ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পরে ন্যায্য অধিকার ফিরে পাওয়ায় আপনাদের অভিনন্দন। কিন্তু আপনাদের মনে রাখতে হবে এই বঞ্চনার পরে, এই নিপীড়নের পরে অধিকার ফিরে পাওয়ার কারণে আপনাদের কাছে আমাদের এবং জাতির যে প্রত্যাশা, সেই প্রত্যাশা যেন আপনারা সবসময় মনে রাখেন।
তিনি বলেন, ২৪-এর ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের পরের যে গণমানুষের প্রত্যাশা, জাতির প্রত্যাশা, বর্তমান রূপান্তরমূলক এই রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্য দিয়ে আমরা যে যাচ্ছি, আমাদের জাতির যে প্রত্যাশা, সেই প্রত্যাশাকে আপনারা পূরণ করবেন। দুর্নীতিমুক্ত থাকবেন, দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি সবসময় আপনারা এমন আচরণ করবেন যাতে মনে করে দেশের মানুষ পুলিশ সত্যিকারভাবেই জনবান্ধব হয়েছে এবং জনগণের বন্ধু হয়েছে।
কুচকাওয়াজে প্যারেড কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার ড. মো. নূরুল হুদা ভূঁইয়া। তিনি দীর্ঘ প্রশিক্ষণের কৃতিত্বের অংশ হিসেবে বেস্ট প্রবেশনার এবং বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ অ্যাওয়ার্ড- এই দুই ক্যাটাগরিতে অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
এছাড়াও বেস্ট একাডেমিক অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার আবু নুমান মোহাম্মদ খাইরুল ইসলাম এবং বেস্ট শ্যুটার হওয়ার গৌরব অর্জন করেন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ এ, বি, এম মামুন।
এদিকে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আগস্ট মাসে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর কার্যক্রম পরিলক্ষিত হওয়ার প্রেক্ষিতে পুলিশকে সতর্ক রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, আওয়ামী ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী, যেটা নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক গোষ্ঠী-তাদের বিভিন্ন কার্যক্রম আগস্ট মাসে পরিলক্ষিত হচ্ছে। সেই জন্য আমরা সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেছি।
সাম্প্রতিক সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিত্যক্ত ব্যাগ ঘিরে সৃষ্ট ‘বোমা আতঙ্ক’ নিয়ে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতি কোনোভাবেই উদ্বেগজনক নয়। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ‘বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট’ ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
গত ৫-৬ মাসের অপরাধপ্রবণতার পরিসংখ্যান টেনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, আনুপাতিক হারে ও তুলনামূলক বিচারে দেশে বর্তমানে অপরাধ বা নাশকতার পরিমাণ অনেকটাই কম। নাশকতার যেকোনো পরিকল্পনা নস্যাৎ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সজাগ রয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
