জীবনের সব প্রশ্নের উত্তর আমরা সঙ্গে সঙ্গে পাই না। অনেক ঘটনা আমাদের বিস্মিত করে। কিছু ঘটনা কষ্ট দেয়। কিছু বিষয় অন্যায় বলেও মনে হয়। তখন মনে প্রশ্ন জাগে, কেন এমন হলো? কেন আল্লাহ এমনটি হতে দিলেন? মানুষের দৃষ্টি সীমিত। সে বর্তমান দেখে। সামনের কয়েক কদম পর্যন্ত ভাবতে পারে। কিন্তু আল্লাহ দেখেন অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। তিনি জানেন প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সবকিছু। তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত জ্ঞান, ন্যায় ও প্রজ্ঞার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই কোনো ঘটনা আমাদের কাছে কঠিন মনে হলেও সেটিই হতে পারে সর্বোত্তম কল্যাণের পথ।
সুরা কাহাফে হজরত মুসা (আ.) ও খিজির (আ.)-এর ঘটনা আমাদের সেই শিক্ষা দেয়। এমন শিক্ষা, যা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। ধৈর্য শেখায়। আল্লাহর প্রতি আস্থা বাড়ায়। বুঝিয়ে দেয়, সব সত্য চোখে দেখা যায় না। সব রহস্য সঙ্গে সঙ্গে উন্মোচিতও হয় না। কখনো কখনো সময়ই আল্লাহর হেকমতের ব্যাখ্যা হয়ে ওঠে।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর তারা চলতে থাকল। অবশেষে যখন তারা নৌযানে চড়ল, সে তা ফুটো করে দিল। সে বলল, আপনি কি এর আরোহীদের ডুবানোর জন্য তা ফুটো করে দিলেন? আপনি অবশ্যই মন্দ কাজ করলেন।’ (সুরা কাহাফ ৭১)-এর পরের আয়াতগুলোতে মহান আল্লাহ তিনটি ঘটনা এবং সেগুলোর রহস্য প্রকাশ করেন। ঘটনাগুলো প্রতিটি মুমিনের জীবনের জন্য দিকনির্দেশনা।
মুসা (আ.) ছিলেন মহান রাসুল। আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার মর্যাদা লাভ করেছিলেন। তবুও আল্লাহ তাকে এমন এক বান্দার কাছে পাঠালেন, যাকে বিশেষ জ্ঞান দান করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে প্রথম যে শিক্ষা পাওয়া যায়, তা হলো মানুষের জ্ঞান কখনো পূর্ণ নয়। যত বড় জ্ঞানীই হোক, তার চেয়েও আরও বড় জ্ঞানী থাকতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাকে (খিজির) আমার পক্ষ থেকে রহমত দান করেছিলাম এবং নিজের পক্ষ থেকে বিশেষ জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছিলাম।’ (সুরা কাহাফ ৬৫) মানুষ যতই জ্ঞান অর্জন করুক, আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় তা এক ফোঁটা পানিরও সমান নয়।
হজরত মুসা (আ.) খিজির (আ.)-এর সঙ্গে চলার অনুমতি চাইলে তাকে ধৈর্যের শর্ত দেওয়া হয়। কারণ এমন কিছু ঘটনা সামনে আসবে, যা বাহ্যিকভাবে বোঝা সম্ভব হবে না।
বাস্তব জীবনও এমন। আমরা অনেক ঘটনার ব্যাখ্যা সঙ্গে সঙ্গে পাই না। চাকরি হারাই। ব্যবসায় লোকসান হয়। প্রিয়জনকে হারাই। অসুস্থ হয়ে পড়ি। কোনো স্বপ্ন ভেঙে যায়। তখন মনে হয় সব শেষ। কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা তখনও চলতে থাকে।
প্রথম ঘটনাটি ছিল নৌকা ক্ষতিগ্রস্ত করার ঘটনা। সাধারণ দৃষ্টিতে এটি অন্যায়। একজন দরিদ্র মানুষের সম্পদ নষ্ট করে দেওয়া কীভাবে ভালো কাজ হতে পারে? পরে জানা গেল, সামনে এক অত্যাচারী রাজা ছিল। সে ভালো নৌকা দেখলেই জোর করে নিয়ে নিত। সামান্য ত্রুটির কারণে সেই নৌকাটি রক্ষা পায়। সামান্য ক্ষতি তাদের বড় ক্ষতি থেকে বাঁচিয়ে দেয়। (সুরা কাহাফ ৭৯)
আমাদের জীবনেও এমন ঘটে। কোনো ক্ষতি হয়তো বড় বিপদ থেকে আমাদের রক্ষা করছে। কিন্তু তখন আমরা তা বুঝতে পারি না।
দ্বিতীয় ঘটনা আরও কঠিন। খিজির (আ.) একটি শিশুকে হত্যা করেন। মুসা (আ.) বিস্মিত হন। এটি তো আরও বড় অন্যায় বলে মনে হয়।
কিন্তু আল্লাহ পরে জানিয়ে দেন, সেই শিশু বড় হয়ে ইমানদার বাবা-মায়ের জন্য বড় ফেতনার কারণ হতো। তাই আল্লাহ তাদের জন্য এর পরিবর্তে আরও উত্তম সন্তান নির্ধারণ করেছিলেন। (সুরা কাহাফ ৮০-৮১)
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেক প্রশ্ন আসে। মনে রাখতে হবে, এটি কোনো মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল না। এটি ছিল সরাসরি আল্লাহর নির্দেশে সংঘটিত একটি বিশেষ ঘটনা। সাধারণ মানুষের জন্য এর কোনো অনুসরণীয় বিধান নেই।
এখানে শিক্ষা হলো, আল্লাহ ভবিষ্যৎ জানেন। আমরা জানি না। তাই তার সিদ্ধান্তকে আমাদের সীমিত জ্ঞান দিয়ে বিচার করা উচিত নয়।
তৃতীয় ঘটনায় খিজির (আ.) এমন এক গ্রামের মানুষের জন্য একটি ভেঙে পড়া দেয়াল মেরামত করে দেন, যারা তাদের আপ্যায়ন পর্যন্ত করেনি। মুসা (আ.) বলেন, চাইলে এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়া যেত।
কিন্তু পরে জানা গেল, সেই দেয়ালের নিচে দুই এতিম শিশুর সম্পদ লুকানো ছিল। তাদের বাবা ছিলেন নেককার মানুষ। তারা বড় হওয়ার আগে কেউ যেন সেই সম্পদ খুঁজে না পায়। তাই দেয়ালটি মেরামত করা হয়। (সুরা কাহাফ ৮২)
এখানে আমরা দেখি, একজন নেককার মানুষের সৎকর্মের বরকত তার সন্তানের জীবনেও প্রভাব ফেলে। আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাদের কল্যাণ এমনভাবে সংরক্ষণ করেন, যা মানুষের কল্পনারও বাইরে।
এই তিনটি ঘটনাই একটি সত্য স্পষ্ট করে। মানুষের চোখ যা দেখে, সেটিই পুরো সত্য নয়। অনেক সময় দৃশ্যমান ঘটনার আড়ালে লুকিয়ে থাকে আল্লাহর অসীম হেকমত।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘হতে পারে তোমরা কোনো একটি বিষয় অপছন্দ করছ, অথচ সেটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আবার হতে পারে তোমরা কোনো একটি বিষয় ভালোবাসো, অথচ সেটাই তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা ২১৬)
এই আয়াত মুমিনের অন্তরে গভীর প্রশান্তি সৃষ্টি করে। কারণ সে জানে, তার রব কখনো অন্যায় করেন না। তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত কল্যাণকর।
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের অবস্থা সত্যিই বিস্ময়কর। তার প্রতিটি অবস্থাই কল্যাণকর। সুখ পেলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। এতে তার কল্যাণ হয়। আর দুঃখ পেলে সে ধৈর্য ধারণ করে। এতেও তার কল্যাণ হয়।’ (সহিহ মুসলিম ২৯৯৯)
এই হাদিস আমাদের শেখায়, মুমিনের জীবনে ব্যর্থতা বলে কিছু নেই। যদি সে ইমান, ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা ধরে রাখতে পারে, তবে প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য সওয়াবের কারণ হয়ে যায়।
আজ আমরা অনেক সময় ছোট একটি সমস্যায় হতাশ হয়ে পড়ি। মনে করি, আল্লাহ হয়তো আমাদের ভুলে গেছেন। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। হয়তো এই পরীক্ষাই আমাদের গুনাহ মাফের কারণ। হয়তো এই ব্যর্থতাই বড় কোনো বিপদ থেকে রক্ষা করছে। হয়তো এই অপেক্ষার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সফলতা।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (সুরা তালাক ২-৩)
তাই একজন মুমিন কখনো হতাশ হয় না। সে জানে, আল্লাহর সিদ্ধান্তে ভুল নেই। দেরি আছে, কিন্তু অবহেলা নেই। পরীক্ষা আছে, কিন্তু উদ্দেশ্যহীন নয়। কষ্ট আছে, কিন্তু সেটার পেছনেও রয়েছে অগণিত কল্যাণ।
আল্লাহর হেকমত উপলব্ধি করার জন্য প্রয়োজন বিনয়। প্রয়োজন ধৈর্য। প্রয়োজন তাওয়াক্কুল। সবকিছু বুঝে নেওয়ার চেষ্টা নয়, বরং আল্লাহর ওপর ভরসা করার মানসিকতা। কারণ সব রহস্য এই পৃথিবীতে উন্মোচিত হবে না। কিছু রহস্যের উত্তর মিলবে কিছু সময় পর। আর কিছু উত্তর জানা যাবে আখেরাতে।
মুসা (আ.) ও খিজির (আ.)-এর ঘটনা আমাদের শেখায়, চোখের দেখা সবকিছু নয়। সীমিত জ্ঞান দিয়ে অসীম প্রজ্ঞার বিচার করা যায় না। আল্লাহ যা করেন, তা জ্ঞান ও হেকমতের ভিত্তিতেই করেন। তার প্রতিটি ফয়সালার পেছনে থাকে নিখুঁত পরিকল্পনা।
জীবনে যখন কোনো দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তখন আরেকটি দরজার অপেক্ষা করতে শিখতে হবে। যখন কোনো প্রার্থনার উত্তর বিলম্বিত হয়, তখন বিশ্বাস রাখতে হবে, আল্লাহ সবচেয়ে উপযুক্ত সময়টিই নির্ধারণ করেছেন। আর যখন কোনো ঘটনা আমাদের বোধের বাইরে চলে যায়, তখন মনে রাখতে হবে, আমাদের রব সবকিছু জানেন। তিনি কখনো তার বান্দার অকল্যাণ চান না। তার হেকমত মানুষের বোধের ঊর্ধ্বে। কিন্তু তার রহমত সব সময় মানুষের কাছেই থাকে।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার
