নিকুঞ্জের ‘অভিশপ্ত’ সেই রিকশা গ্যারেজে অভিযান, গ্রেপ্তার ১

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম

রাজধানীর খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ টানপাড়া জামতলার একটি রিকশা গ্যারেজকে ঘিরে বহুদিন ধরে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ছিল। দিনের বেলায় রিকশা রাখা ও মেরামতের সাধারণ গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও সন্ধ্যার পর সেটি মাদকসেবী ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আড্ডাস্থলে পরিণত হতো বলে তাদের দাবি।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের কেনাবেচা চলত প্রকাশ্যেই। একাধিকবার অভিযোগ জানানো হলেও দীর্ঘদিন কার্যকর ব্যবস্থা না হওয়ায় গ্যারেজটি ধীরে ধীরে পুরো এলাকার আতঙ্কের প্রতীকে পরিণত হয়। অনেকেই একে ‘অভিশপ্ত গ্যারেজ’ নামে ডাকতে শুরু করেন।

দীর্ঘদিনের সেই অভিযোগের পর অবশেষে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) অভিযান চালিয়ে ওই গ্যারেজ থেকে মো. শাকিল মিয়া (২৪) নামে এক যুবককে ২০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করেছে।

এ ঘটনায় ডিএনসির উপপরিদর্শক বাদী হয়ে খিলক্ষেত থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেছেন।

ডিএনসি সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে ঢাকা মেট্রো কার্যালয় (দক্ষিণ)-এর খিলগাঁও সার্কেলের পরিদর্শক সিদ্দিকুর রহমানের নেতৃত্বে একটি আভিযানিক দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নিকুঞ্জ টানপাড়া জামতলার খ-১৩২/২/বি নম্বরের রিকশা গ্যারেজ ও আশপাশের এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানের সময় গ্যারেজের সামনে অবস্থানরত শাকিলকে তল্লাশি করে তার জিন্স প্যান্টের পকেট থেকে ২০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া ইয়াবার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ছয় হাজার টাকা। পরে তাকে জব্দকৃত আলামতসহ খিলক্ষেত থানায় হস্তান্তর করা হয়।

এই অভিযানের পর নতুন করে সামনে এসেছে এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ। তাদের দাবি, শাকিল এই চক্রের একজন সদস্য মাত্র। প্রকৃত পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা এবং নিয়ন্ত্রকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এই মাদক কারবার বন্ধ হবে না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্যারেজ পরিচালনাকারী রুবেল হোসেন দীর্ঘদিন ধরে এই কারবারের সঙ্গে জড়িত। তাদের দাবি, গ্রেপ্তার হওয়া শাকিল তার সহযোগী হিসেবে মাঠপর্যায়ে ইয়াবা সরবরাহ ও বিক্রির দায়িত্ব পালন করতেন। একই সঙ্গে টিন মিস্ত্রি রিপন, ফুচকা শফিকুল জুয়ারু মাসুমসহ আরও কয়েকজনের সমন্বয়ে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট এলাকায় সক্রিয় রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দিনের বেলায় গ্যারেজে রিকশা রাখা ও মেরামতের কাজ চললেও সন্ধ্যার পর থেকেই পরিবেশ বদলে যেত। অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা বেড়ে যেত, গভীর রাত পর্যন্ত চলত আড্ডা। তাদের অভিযোগ, ওই আড্ডার আড়ালেই চলত মাদক লেনদেন। অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের ওই এলাকা দিয়ে চলাচল করতে নিষেধ করতেন। সন্ধ্যার পর নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, গ্যারেজটি বিদ্যুৎ ও হাসান নামে দুই ব্যক্তির জমিতে পরিচালিত হলেও দীর্ঘদিন ধরে অপকর্মের অভিযোগ ওঠার পরও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তাদের দাবি, আবাসিক এলাকার নিরাপত্তা, সামাজিক পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থের চেয়ে আর্থিক সুবিধাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যদি অভিযোগগুলো সত্য হয়ে থাকে, তবে এটি কেবল সামাজিক দায়িত্বহীনতার নয়, নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নও সামনে আনে।

স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, একটি আবাসিক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারের অভিযোগ থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাদের মতে, কোনো স্থানে ধারাবাহিকভাবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠার পরও যদি তা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তাহলে অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে এবং সমাজে এর নেতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে।

তাদের ভাষ্য, মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করে। মাদক ব্যবসার কারণে তরুণদের বিপথে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধও বৃদ্ধি পায়। ফলে মাদকবিরোধী অভিযানকে শুধু আইন প্রয়োগের বিষয় হিসেবে না দেখে সামাজিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবেও বিবেচনা করা জরুরি।

স্থানীয়দের মতে, ডিএনসির সাম্প্রতিক অভিযান একটি ইতিবাচক সূচনা। তবে একজনকে গ্রেপ্তার করেই অভিযান শেষ হয়ে গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। তাঁরা চান, তদন্তের মাধ্যমে মাদকের উৎস, অর্থের জোগানদাতা, সরবরাহকারী, মাঠপর্যায়ের বিক্রেতা এবং অভিযোগে উঠে আসা পুরো নেটওয়ার্কের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হোক। অপরাধে যার সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হবে, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

তাদের আরও দাবি, সংশ্লিষ্ট রিকশা গ্যারেজটি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, এর বৈধতা কী, দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এ কার্যক্রমকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা উচিত।

নিকুঞ্জ টানপাড়া একটি ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা। এখানে হাজারো পরিবার, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও প্রবীণ মানুষের বসবাস। এমন একটি এলাকায় মাদক কারবারের অভিযোগ স্থানীয়দের জন্য শুধু উদ্বেগের নয়, নিরাপত্তারও বড় প্রশ্ন।

তাই এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সাম্প্রতিক এই অভিযান যেন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা না হয়ে ধারাবাহিক অভিযানের সূচনা হয়। নিয়মিত নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে মাদকচক্রের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হোক।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত