রবীন্দ্র কুঠিবাড়িতে রবীন্দ্র নাটক মঞ্চায়ন

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৬, ১২:২১ এএম

একটি লিখিত নাটক তখনই প্রাণ পায়, যখন নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। ক্লাসরুমে সাহিত্যের শিক্ষার্থী হিসেবে যে নাটকগুলো পড়েছি সেগুলো মঞ্চস্থ করার একটা ইচ্ছা আমাদের ছিল। সেই ইচ্ছা থেকেই গত বৃহস্পতিবার কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্নাতক (সম্মান), চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীরা বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাইফুজ্ জামান স্যারের তত্ত্বাবধানে শিলাইদহের রবীন্দ্র কুঠিবাড়িতে পরপর তিনটি নাটক মঞ্চস্থ করি। কুঠিবাড়িতে মঞ্চস্থ করার জন্য আমরা বেছে নিয়েছিলাম রবীন্দ্রনাথের দুটি নাটক ‘রক্তকরবী’, ‘ডাকঘর’ এবং অপরটি ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসের নাট্যরূপ।

নাটকটি মঞ্চস্থ করার জন্য আমরা মঞ্চায়নের প্রায় ২০ দিন আগ থেকেই আমাদের ক্লাসের শেষে নাটকের রিহার্সাল করতাম। রিহার্সালে জামান স্যার আমাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন বলে দ্রুত অভিনয় রপ্ত করতে সুবিধা হয়েছে। পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী যাত্রার দিন সকাল ৯টায় আমরা সবাই নাটকের পূর্বপ্রস্তুতি স্বরূপ কস্টিউম ও অন্যান্য উপাদান সামগ্রী সঙ্গে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে বাসে উঠে রওনা দিই কুঠিবাড়ির উদ্দেশ্যে। শত ব্যস্ততার মধ্যে অনেক দিন পর ক্লাসের সবাই একসঙ্গে বাসযাত্রা করার মজাই আলাদা। গানের তালে হৈ-হুল্লোড় করতে করতে আমরা চলতে শুরু করি। কুষ্টিয়া শহর থেকে স্যার আমাদের সঙ্গে যোগ দেন। স্যারের সঙ্গে ওনার স্ত্রী ও মেয়ে আমাদের আনন্দময় দিনটির ভাগীদার হয়েছিলেন। এতে আমাদের আনন্দ আরও বেড়ে গিয়েছিল।

ক্যাম্পাস থেকে কুঠিবাড়ি কাছে হওয়ায় আমরা দ্রুতই সেখানে পৌঁছে গেলাম। আনন্দ উন্মাদনায় রাস্তা যেন আরও একটু দ্রুতই ফুরিয়ে গেল। যদিও এর আগে বন্ধুরা মিলে সেখানে ঘুরতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ক্লাসের সবার সঙ্গে নাটকের উদ্দেশ্যে এসে মনে এক ভিন্নরকম রোমাঞ্চ তৈরি হলো। তার ওপর যদি বর্ষার বৃষ্টি নামে, তাহলে তো কথাই নেই! আমরা সেখানে পৌঁছাতেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। ততক্ষণে আমরা কুঠিবাড়ির ভেতরে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন প্রদর্শনী ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। এত বছর পরেও সেখানকার সবকিছুই প্রাণবন্ত মনে হলো। চারদিকে সবুজের ছড়াছড়ি; আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দোতলা বাড়িটি, যেখানে বসে তিনি একসময় জমিদারি দেখাশোনা করতেন। এই কুঠিবাড়িতেই রবীন্দ্রনাথ অনেক বিখ্যাত সাহিত্য রচনা করেছেন। কুঠিবাড়ির দোতলার বারান্দায় আমরা সবাই মিলে স্যারের নির্দেশনায় গলায় গলা মিলিয়ে রবীন্দ্রসংগীত গাইলাম। বৃষ্টির মধ্যে, রবীন্দ্রনাথের ঘরেই রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার অনুভূতি ছিল ভীষণ আলাদা। পাশেই মাঠের মধ্যে একটা ছাউনির ভেতরে সবাই মিলে দুপুরের খাবার খেলাম। চারদিকে খোলা মাঠে বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টি দেখতে দেখতে খাওয়ার অভিজ্ঞতাটা মজার ছিল।

খাওয়া-দাওয়ার পরে স্যারের তত্ত্বাবধানে ও সহযোগিতায় বৃষ্টির কারণে আমরা কুঠিবাড়ির গ্রন্থাগারের ভেতরের বারান্দায় বসেই নাটক মঞ্চায়নের ব্যবস্থা করলাম। স্যারের মেয়ের কণ্ঠে একটি রবীন্দ্রসংগীত দিয়ে শুরু হলো আমাদের নাটক। সবার অসাধারণ অভিনয় দেখে সত্যি বিমোহিত হলাম। চরিত্রের জন্য একেকজন একেক ঢঙে সেজেছে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সব আনুষ্ঠানিকতা ভালোভাবেই সম্পন্ন হয়েছিল এবং বেশ আনন্দঘনই ছিল দিনটি।

কুঠিবাড়িতে অনেকগুলো দোকানপাটে নানা রকমের খেলনা, মাটির জিনিসপত্র, বাদ্যযন্ত্র বিক্রি হচ্ছে দেখে এগিয়ে গেলাম। পছন্দ হতেই সেখান থেকে শখ করে একটি বাঁশি কিনলাম আমি। ফেরার আগে সবার উৎফুল্ল প্রস্তাবের ভিত্তিতে স্যারের সম্মতি নিয়ে আমরা কুঠিবাড়ির পাশেই পদ্মা নদীর পাড়ে ঘুরতে গেলাম। বর্ষাকালে নদীর পানি থই থই করছিল। দূরের নৌকা, আর নদীর ওপর আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা দেখতে দারুণ লাগছিল। সময় স্বল্পতার কারণে আমরা দ্রুতই সেখানে থেকে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে করে ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ফেরার পথেও বাসের মধ্যে হৈ-হুল্লোড় এবং আনন্দ উন্মাদনার কোনো কমতি ছিল না। এই সুযোগে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব ও আন্তরিকতা আরও গাঢ় হলো আমাদের। অল্প কিছুদিন পরেই হয়তো পড়ালেখা শেষে আমরা যে যার নিজ গন্তব্যে ফিরে যাব। চেনা মুখগুলো খুব শিগগিরই হারিয়ে যাবে, কিন্তু এমন দিনের স্মৃতি কখনোই হারাবার নয়।

লেখক : শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত