বেশি ক্ষতিপূরণ পেতে কৃষিজমিতে বহুতল ভবন নির্মাণের হিড়িক

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০৩ এএম

সারি সারি বহুতল ভবন। দূর থেকে দেখলে মনে হবে রাজধানী ঢাকা কিংবা বড় শহরের কোনো আবাসিক এলাকা। আসলে এগুলো দাঁড়িয়ে আছে বিস্তীর্ণ কৃষিজমির মাঝখানে। ভবনের বেশির ভাগই জনশূন্য, তালাবদ্ধ। বিদ্যুৎ নেই, নেই যাতায়াতের কোনো রাস্তা, জমির আল ধরে ধরে হেঁটে যেতে হয় সেখানে। তার মধ্যেও চলছে নতুন নতুন বাড়ি নির্মাণের কাজ। এটি দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উত্তর দিকে হামিদপুর ইউনিয়নের বাঁশপুকুর, কাজীপাড়া ও চৌহাটি গ্রামের চিত্র।

এলাকাবাসী জানান, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি সম্প্রসারণের খবরে ওই এলাকায় কৃষিজমি ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণের ধুম পড়েছে। খনির জন্য জমি অধিগ্রহণ থেকে অধিক ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় অনুমোদন ছাড়াই নিয়মবহির্ভূতভাবে এসব ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। তিন-চার তলার দুই শতাধিক ভবন গড়ে উঠেছে বিল্ডিং কোড, নকশা অনুমোদন কিংবা নিরাপত্তা বিধি না মেনেই। এসব নির্মাণকাজে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির অসাধু কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী বেনামে বা দালালের মাধ্যমে অর্থ বিনিয়োগ করছেন। আছেন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর আন্দোলনের নেতা থেকে শুরু করে বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান ও স্থানীয় প্রভাবশালীরাও। এলাকাবাসীর দাবি, সরকার যেন সুষ্ঠু তদন্ত করে, সঠিক চিত্র যাচাই করে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দেয়।

সরেজমিন দেখা যায়, বিস্তীর্ণ ফসলি জমির মাঝখানে অপরিকল্পিতভাবে বহু ভবন তৈরি হয়েছে। ভবনের চারপাশে নেই কোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পাকা রাস্তা বা অন্য কোনো নাগরিক সুবিধা। এলাকায় সংবাদকর্মী বা অপরিচিত কেউ ছবি কিংবা ভিডিও ধারণ করতে গেলে বাধার মুখে পড়তে হয়। বাঁশপুকুর ও কাজিপাড়া গ্রামের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা বলেন, যে তিনতলা ও চারতলা ভবনগুলো তৈরি হচ্ছে, তার অধিকাংশেই কেউ থাকে না। শুধু ভবন বানিয়ে রাখা হয়েছে। আমরা চাই সরকার সুষ্ঠু তদন্ত করে সঠিক অবস্থা যাচাই করুক, যাতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পান।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিন-চার তলার এসব ভবন নির্মাণে নিয়মানুযায়ী পার্বতীপুর উপজেলা ইমারত ভবন নকশা কমিটি এবং হামিদপুর ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতির প্রয়োজন হয়। পার্বতীপুর উপজেলা ইমারত ভবন নকশা কমিটিতে রয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা প্রকৌশলী, ডিপ্লোমা প্রকৌশলী, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন কর্মকর্তা ও ইউপি চেয়ারম্যান। উপজেলা ইমারত ভবন নকশা কমিটির দাবি, ওই সব ভবন নির্মাণের ব্যাপারে তারা কিছুই জানে না। আর হামিদপুর ইউনিয়ন পরিষদ জানিয়েছে, তারা ২০২৪ সালে প্রথমে চারতলা ও দ্বিতীয় তলার অনুমতি দিয়েছিল। এরপর আর দেওয়া হয়নি।

১৯৮৫ সালে বড়পুকুরিয়ায় কয়লা খনি আবিষ্কার হওয়ার পর এ পর্যন্ত খনির জন্য ৭৯২ দশমিক ৭৫ একর জমি অধিগ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। খনি সম্প্রসারণের জন্য এর উত্তর দিকে ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর আরও ৩০০ একর এবং ২০২৬ সালের ২০ মে পূর্ব-দক্ষিণ পাশের্^ আরও ১.৩৬ একর জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিএমসিএল) পরিচালনা পর্ষদ। জমি অধিগ্রহণের আগে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করতে ৫০ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটিও করা হয়েছে। এ খবরেই খনির উত্তর দিকের গ্রামে কৃষিজমিতে স্থাপনা নির্মাণের হিড়িক পড়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাঁশপুকুর ও কাজিপাড়া গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, অধিক ক্ষতিপূরণের আশায় বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির অসাধু কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী বেনামে বা দালালের মাধ্যমে এসব নির্মাণকাজে অর্থ বিনিয়োগ করছেন। শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীই নয়, এসব বাড়ির মালিকের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর আন্দোলনের নেতা ইব্রাহম খলিল, বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান ও স্থানীয় প্রভাবশালীরাও আছেন।

কৃষিজমিতে নিয়মবহির্ভূতভাবে ভবন নির্মাণের অভিযোগ ওঠার পর সম্প্রতি বিষয়টি সরেজমিন পরিদর্শনে যান খনির এমডি আবু তালেব ফারাজীসহ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. জানে আলম ও জেলা প্রশাসক কার্যালয় এবং খনির কয়েকজন কর্মকর্তা। তখন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ড্রোন দিয়ে এলাকার ছবি ও ভিডিওচিত্র ধারণ করতে চাইলে ভবন মালিকদের বাধার মুখে করা যায়নি।

সরেজমিন কথা হয় চলমান একটি নির্মাণকাজে কর্মরত এক রাজমিস্ত্রির সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রায় ৩০ শতক জমির ওপর একটি দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে এবং ভবনটির মালিক কয়লা খনির এক কর্মকর্তা।

পার্বতীপুর উপজেলা প্রশাসন বলছে, সার্ভে করতে গিয়ে দেখা গেছে সেখানে খনির ২২ কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভবন রয়েছে। স্থানীয় দালালচক্রের যোগসাজশে তারা এসব বহুতল ভবন তুলেছেন। অভিযোগ রয়েছে, হামিদপুর-কাজিপাড়া গ্রামে দুই থেকে তিনটি বিল্ডিং ও কয়েকটি গুদামঘর নির্মাণ করেছেন বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির মহাব্যবস্থাপক (সারফেস অপারেশন) আবুল কালাম মুহাম্মদ বদরুল আলম।  তিনি দৈনিক দেশ রূপান্তরকে মোবাইল ফোনে বলেন, আমি বিল্ডিং ও গুদাম করিনি, আমার স্ত্রীর নামে সম্প্রসারণ এলাকায় জায়গায় ছিল, সেখানে তার নামে গুদাম ঘর রয়েছে। আপনি অফিসে আসেন সরাসরি সাক্ষাতে কথা বলি।’

খনির আরেক কর্মকর্তা (ব্যবস্থাপক সাবসিডেন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট) মুহাম্মদ আক্কাছ আলী চৌহাটি গ্রামে নির্মাণ করেছেন দুইতলা বাড়ি, যা জেলা প্রশাসক পরিদর্শনকালে নিশ্চিত হন। তিনি বলেন, ‘আমি সম্প্রসারণ এলাকায় কোনো বাড়ি করিনি, আমার জায়গা নেই সম্প্রসারণ এলাকায়।’

এ ব্যাপারে হামিদপুর ইউনিয়ন পরিষদ সচিব সাজেদুর রহমান বলেন, বাঁশপুকুর, কাজিপাড়া ও চৌহাটি মৌজায় অনিয়ম করে নির্মিত ভবনগুলোর কোনো হোল্ডিং ট্যাক্স বা নিবন্ধন করা হয়নি। নতুন সরকারি জরিপের সময় এসব ভবনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

হামিদপুর ইউপি চেয়ারম্যান রেজওয়ানুল হক মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভবন নির্মাণে অনুমতি লাগে, কিন্তু গ্রামের লোকজন তা মানে না। দুইতলা ভবন নির্মাণে ইউনিয়ন পরিষদ অনুমতি দিতে পারে। ২০২৪ সালে চারতলা ভবন নির্মাণ করার অনুমতি ছিল, এখন তা নেই। তিন থেকে চারতলা ভবন নির্মাণের অনুমোদন এখন উপজেলা কমিটির মাধ্যমে দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, বাঁশপুকুর কাজিপাড়া গ্রামে ১৫০ ও চৌহাটি মৌজায় ৫০ মিলে ২০০ ভবন নির্মাণ হয়েছে। ৪০ থেকে ৫০টির মতো হোল্ডিং রয়েছে। প্রায় ২ বছর ধরে এ ধরনের বহুতল ভবন নির্মাণ চলছে।’ ওই সম্প্রসারণ এলাকায় আপনার তিন-চারটি ভবন রয়েছে এমন প্রশ্ন রাখলে চেয়ারম্যান বলেন, ‘সরাসরি দেখা করে আপনার সঙ্গে কথা বলব ভাই।’

বাঁশপুকুর গ্রামের বাসিন্দা বেলাল হোসেন বলেন, আগেও আমাদের অনেক জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। যে ক্ষতিপূরণ পেয়েছি, তা দিয়ে অন্য জায়গায় সমপরিমাণ জমি কেনা সম্ভব হয়নি।

হামিদপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জাহেদুজ্জামান বলেন, হামিদপুর ইউনিয়নের ২৮ মৌজায় ৯ হাজার ৫০২ একর কৃষি জমি রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৩ একর অকৃষি জমি আছে। প্রায় অধিকাংশ কৃষিজমিতে বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। এই এলাকায় ধীরে ধীরে কৃষি জমি কমে যাচ্ছে।

ভবন নির্মাণ প্রসঙ্গে পার্বতীপুর উপজেলা ইমারত ভবন নকশা কমিটির সদস্য ও পার্বতীপুর উপজেলা প্রকৌশলী মো. মানিক মিঞা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাঁশপুকুর, কাজিপাড়া ও চৌহাটি মৌজা এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমতির জন্য এখন পর্যন্ত কেউ আবেদন করেননি। এখন নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে, কী পরিমাণ ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান নেই।

পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. মাহমুদ হুসাইন রাজু দেশ রূপান্তরকে বলেন, এসব ব্যাপারে এলাকাবাসী অনেক অভিযোগ দিয়েছেন। বিল্ডিং কোড না মেনে এসব বিল্ডিং নির্মাণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে ওই সব এলাকার খাজনা গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনিব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দিনাজপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের (এলএ) শাখা সূত্র জানায়, স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন-২০১৭ অনুযায়ী, জেলা রেজিস্ট্রি অফিস থেকে হামিদপুর ইউনিয়নের মৌজার জমি গত তিন বছরে যে দামে বিক্রি হয়েছে, তার গড় হিসাব করে অধিগ্রহণকৃত জমি ও স্থাপনার মূল্য নির্ধারণ করা হবে।

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. শাহ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খনি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অধিগ্রহণের আগেই তো খনির উত্তর দিকের বাঁশপুকুর, কাজিপাড়া ও চৌহাটিতে বহুতল ভবন নির্মাণ হয়েছে। অধিগ্রহণ এলাকায় খনির কোনো কর্মকতার ভবন নির্মাণের প্রমাণ পাওয়া গেলে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নেওয়া হবে। সম্প্রসারণ এলাকায় যারা এসব নির্মাণ করেছেন, তাদের উদ্দেশ্য ভালো নয়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত