দৃশ্যের নিভৃত ছন্দ

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩২ এএম

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শুরুর এক বিকেল। সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমে, অথচ বাতাসে স্বস্তি নেই। গুমোট গরমে মানুষ হাঁপিয়ে উঠছে। প্রকৃতির অন্য প্রাণীরাও তৃষ্ণায় অস্থির। রমনা পার্কের লেকের ধারে বসে আমরা কয়েকজন ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার ঘাম মুছছি আর মাঝেমধ্যে পানির বোতলে চুমুক দিচ্ছি। অপেক্ষা করছি এমন এক মুহূর্তের, যার স্থায়িত্ব হয়তো এক নিমেষেরও কম।

একসময় উঁচু গাছের আশ্রয় ছেড়ে একে একে উড়ে আসে বাদুড়ের দল। তারা লেকের পানির খুব কাছ দিয়ে ডাইভ দেয় বারবার; পানিতে ছুঁয়ে নেয় পা, কখনো গলা। পার্কের ব্যস্ততা, লেকের ধারে মানুষের ভিড় কিংবা কায়াকিং করা নৌকা কিছুই যেন তাদের তৃষ্ণা নিবারণের অভিযাত্রা থামাতে পারে না। ঢাকা শহরের নাগরিক কোলাহলের মধ্যেও এই দৃশ্য একদিকে যেমন মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থানের নীরব ইঙ্গিত, অন্যদিকে বেঁচে থাকার অনিবার্য তাগিদের এক অনুচ্চারিত গল্প।

আমরা মূলত সেই ডাইভ দেওয়ার মুহূর্তগুলো ধারণ করতেই অপেক্ষা করছিলাম। বেশ কয়েকটি ছবি তোলার পর হঠাৎ মনে হলো, যদি এমন একটি মুহূর্ত পাওয়া যায়, যখন বাদুড়টি ক্যামেরার ঠিক সামনে এসে দুই ডানা সমানভাবে মেলে ধরবে! সেই ভাবনা থেকেই শুরু হলো নতুন অপেক্ষা। বহু ব্যর্থ চেষ্টার পর হঠাৎ একটি বাদুড় সরাসরি ক্যামেরার দিকে উড়ে এলো। দুই ডানা সমানভাবে প্রসারিত, মাঝখানে তার শরীর যেন প্রতিসাম্যের একটি অদৃশ্য রেখা। উত্তেজনা কাজ করলেও শাটার চাপতে ভুল করিনি; ফ্রেমে স্থায়ী হয়ে রইল সেই ক্ষণস্থায়ী মুহূর্তটি। ছবিটির সৌন্দর্য শুধু বাদুড়ের ভঙ্গিতে নয়; অন্তরালে কাজ করেছে আলোকচিত্রের একটি মৌলিক কম্পোজিশন রুল অব সিমিট্রি (প্রতিসাম্যের বিন্যাস)।

প্রতিরূপ যেন প্রকৃতির সহজাত ভাষা। প্রজাপতির ডানায়, অসংখ্য ফুলের পাপড়িতে, মানুষের মুখাবয়বে কিংবা পাখা মেলা বিহঙ্গে আমরা সেই সাদৃশ্য খুঁজে পাই। আলোকচিত্রের ভাষায় প্রতিরূপ সৃষ্টির এই বিন্যাসই রুল অব সিমিট্রি। একটি কাল্পনিক রেখার দুই পাশে যখন দৃশ্যের উপাদানগুলো পরস্পরের প্রতিরূপ হয়ে ওঠে, তখন ছবির সৌন্দর্য শুধু চোখে ধরা পড়ে না; মনকেও স্পর্শ করে। তাই স্থাপত্য, প্রতিফলন, বন্যপ্রাণী কিংবা প্রতিকৃতি এ ধরনের আলোকচিত্রে এই কম্পোজিশনের সিমিট্রির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এটি দর্শকের দৃষ্টিকে দ্বিধায় ফেলে না। চোখ প্রথমেই এসে থামে ছবির কেন্দ্রবিন্দুতে, তারপর ধীরে ধীরে দুই পাশের সাদৃশ্য অনুসরণ করে। আমরা অনুভব করি স্থিরতা, শৃঙ্খলা এবং এক ধরনের নান্দনিক প্রশান্তি। অনেক সময় এমন কম্পোজিশন শক্তি, গাম্ভীর্য কিংবা আত্মবিশ্বাসের অনুভূতিও জাগিয়ে তোলে।

আমার তোলা এই ছবিতে সেই অনুভূতি আরও গভীর হয়েছে দৃষ্টিকোণের কারণে। বাদুড়টি সরাসরি ক্যামেরার দিকে উড়ে আসায় ক্যামেরা ও বিষয়বস্তুর কেন্দ্ররেখা এক হয়ে গেছে। তৈরি হয়েছে এক অনন্য ভিজ্যুয়াল পার্সপেক্টিভ যেন জীবন্ত অনুভূতি। চারপাশের অনাড়ম্বর গাঢ় পটভূমি ও সংযত নেগেটিভ স্পেস দর্শকের চোখকে অনায়াসে নিয়ে যায় বাদুড়টির মুখাবয়ব এবং বিস্তৃত দুই ডানার প্রতিসাম্যের দিকে। সিমিট্রির সৌন্দর্য চোখের দুয়ার দিয়ে পৌঁছে যায় অনুভবের অলিন্দে।

গতিশীল কোনো বিষয়কে সিমিট্রির নিয়মে ফ্রেমে ধরা মোটেও সহজ নয়। ক্যামেরা যদি কেন্দ্ররেখা থেকে সামান্যও সরে যায়, প্রতিসাম্যের অনুভূতিও ভেঙে যেতে পারে। তাই বিষয়বস্তুকে যতটা সম্ভব ফ্রেমের মাঝখানে রাখা এবং ফোকাসও তার কেন্দ্রীয় অংশে স্থির করাই সবচেয়ে কার্যকর। আর যদি প্রতিফলনের মাধ্যমে সিমিট্রি তৈরি হয়, তবে মূল বিষয় কিংবা তার প্রতিফলন যেকোনো একটিতে নিখুঁত ফোকাস রাখাই যথেষ্ট। তবে এসব কৌশলের চেয়েও বড় বিষয় হলো ধৈর্য। এমন ছবির জন্য যতটা না প্রয়োজন পরিকল্পনা, তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ, অপেক্ষা ও অধ্যবসায়।

তবে সিমিট্রি মানেই দুই পাশকে যান্ত্রিকভাবে হুবহু এক করে ফেলা নয়। সামান্য পার্থক্য অনেক সময় ছবিকে প্রাণবন্ত করে তোলে। কাজেই এই কম্পোজিশনের সার্থকতা তখনই, যখন সেই প্রতিরূপ ছবির গল্পকে সমৃদ্ধ করে; শুধু ব্যাকরণ মেনে চলার জন্য নয়।

প্রকৃতির সব সৌন্দর্য একক কোনো অস্তিত্বের মধ্যে জন্ম নেয় না। একটি ডানা অন্য ডানাকে সম্পূর্ণ করে, একটি পাপড়ি অন্য পাপড়ির সঙ্গে মিলেই ফুল হয়ে ফোটে, একটি মুখের এক পাশ অন্য পাশের প্রতিরূপ হয়েই গড়ে তোলে তার পূর্ণ অবয়ব। হয়তো এই কারণেই প্রতিসাম্য আমাদের কাছে এত সহজাত, এত স্বস্তিদায়ক।

সেদিন রমনার লেকে আমি শুধু কিছু বিরল মুহূর্তের সাক্ষীই হইনি; প্রকৃতিকে যেন তার নিজস্ব বিন্যাসে দেখেছিলাম নতুন করে। হয়তো রুল অব সিমিট্রির সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই কিছু নিভৃত সৌন্দর্য আমাদের চোখের সামনেই থাকে; শুধু তাকে দেখার জন্য প্রয়োজন একটি নান্দনিক দৃষ্টি।

লেখক : আলোকচিত্রী ও ব্যাংকার

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত