আশ্রয়হীন হাজারো মানুষ

সিরাজগঞ্জে যমুনার ভাঙ্গনে বিলীন বাড়িঘর 

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩২ এএম

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নের কুরসি ও ধীতপুর গ্রামে যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙ্গনে ২ শতাধিক বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

ফলে এ এলাকার অসহায় অসংখ্যা নারী ও শিশু যাওয়ার জায়গা না পেয়ে ভাঙ্গন এলাকায় মাছ ধরা জাল দিয়ে ঘেরা জরাজীর্ণ ভাঙ্গা ঘরে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

এসব গ্রামের ভাঙ্গন এলাকায় বালুর বস্তা ফেলে ভাঙ্গণরোধের ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে স্থানীয় এলাকাবাসি মঙ্গলবার (১২ আগষ্ট) বিকেলে কুরসি বাজার এলাকায় ভাঙ্গনপাড়ে দাড়িয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছে।

বিক্ষোভ শেষে ভাঙ্গনরোধে বস্তা ডাম্পিংয়ের দাবি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন, জিন্নাহ মন্ডল, আব্দুল মালেক, আব্দুস সামাদ, ফিটার সরদার, লষ্কর আলী, আব্দুল মান্নান, মহির উদ্দিন, নীল চান প্রামানিক প্রমুখ।

বিক্ষোভকারী বক্তারা বলেন, এ বছর বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকে সোনাতনী ইউনিয়নের শ্রীপুর, ধীতপুর, কুরসী, বারপাখিয়া, গালা ইউনিয়নের মোহনপুর ও হাতকোড়া গ্রামে যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙ্গণ শুরু হয়ে এখনও তা অব্যহত আছে। এই ভয়াবহ ভাঙ্গনে গত ৩ মাসে শত শত বাড়িঘরের পাশাপাশি কৃষকদের শত শত বিঘা আবাদী জমি চোখের সামনে বিলিন হয়ে গেছে।

বাড়িঘর ও আবাদী জমি হারিয়ে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। চোখের সামনে সবকিছু যমুনা নদীতে বিলীন হয়ে গেলেও চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া তাদের আর কিছুই করার ছিলনা। ভাঙ্গনের ভয়াবহতা এতোই তীব্র আকার ধারণ করেছে যে, কেউ বাড়িঘর ও আসবাবপত্র সরিয়ে নেওয়ারও সময় পাচ্ছে না। এ অবস্থায় তারা সরকারের কাছে অবিলম্বে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে এই ভাঙ্গন এলাকায় বালুর বস্তা ডাম্পিং করে ভাঙ্গনরোধের জোরদাবী জানান। 

এ সময় বিক্ষোভকারীরা জানান, গত ২ সপ্তাহে শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নের কুরসী ও ধীতপুর গ্রামের ২ শতাধিক বাড়িঘর যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এ সব গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় অনেক মানুষের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। তারা ভাঙ্গনকবলিত এলাকায় পলিথিনের ছাউনিতে অথবা মাছ ধরা জাল দিয়ে ঘেরা জরাজীর্ণ ভাঙ্গা ঘরে বসবাস করছেন।

এছাড়া ধীতপুর-কুরসী গরুর হাট-বাজার যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় এ অঞ্চলের কৃষকদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য ও গরু-ছাগল বেচা-বিক্রিতে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। ফলে এখানকার কৃষকরা চরম অর্থকষ্টে ভুগছে। ভাঙ্গনকবলিত বাড়িঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় কৃষকেরা অন্ধকারে মানবেতর জীবন যাপন করছে। গরু চুরি ঠেকাতে তারা গরুর পাশে চৌকি পেতে শুয়ে থেকে গরু পাহাড়া দিচ্ছেন। বিদ্যুতের অভাবে এ এলাকার শত শত শিক্ষার্থীর লেখাপড়ায় চরম বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। গরমে গরু-বাছুরের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে।

এই ভাঙ্গনের তান্ডবে এ পর্যন্ত ২টি মসজিদ মাদ্রাসা, ২ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি অফিস ঘর, ২ শতাধিক বাড়িঘর, ২ হাজার বিঘা আবাদী জমি ও অসংখ্য গাছপালা যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বিলীন হওয়া জমিতে প্রচুর পরিমানে ধান, পাট, সরিষা, বাদাম, তীল, কাউন, গম, ভুট্টা ও সবজি চাষ করা হোতো। এ সব ফসল চাষ কওে এ এলাকার শত শত কৃষক আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছিল। রাক্ষুসী যমুনায় জমিজমা সবকিছু বিলীন হয়ে যাওয়ায় তারা নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

এ বিষয়ে ধীতপুর গ্রামের আব্দুল লতিফ ও রেহানা খাতুনের স্বামী পরিত্যাক্তা আন্না খাতুন(রুমা) জানান, তার স্বামী তাকে ত্যাগ করার পর গত ১ বছর ধরে তিনি এক শিশু কন্যাকে নিয়ে কৃষি দিনমজুর বাবা আব্দুল লতিফের বাড়িতে বসবাস করছেন। গত ৪/৫ দিন ধরে তারা বাবার বাড়িটি যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙ্গনের মুখে পড়ায় তাদের বসতঘরটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে শুন্য ভিটায় অপর একটি পরিত্যাক্ত জরাজীর্ণ ভাঙ্গা ঘরে মা রেহানা খাতুন ও কোলের শিশুকন্যাকে নিয়ে বসবাস করছেন। ঘরটির এক পাশে রেড়া না থাকায় কুকুর, বিড়াল ও শিয়ালের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে মাছ ধরা ঝাকিজাল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। অন্যপাশের পাটকাঠির বেড়া পঁচে খোসে খসে পড়ছে। ঘরের চাল নুইয়ে পড়েছে। তারপরেও যাওয়ার কোনো জায়গা না পেয়ে তারা এই জীর্ণ ঘরে মানবেতর জীবন যাপন করছে। গত কয়েক দিনে তাদের কেউ খোঁজ খবর নেয়নি। সরকারি ১ কেজি চাল পেয়ে তা দিয়ে তাদের কোনো মতে জীবন চলছে।

এ বিষয়ে ধীতপুর ঘোনাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা হাফিজ উদ্দিন, নুরুল ইসলাম ও জিন্নাহ মন্ডল জানান, এ এলাকার ভাঙ্গনরোধে দ্রুত বালুভর্তি জিওটিউব বস্তা ফেলা জরুরী। কিন্তু সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড এ চরবাসীর মূল্যায়ন না করায় এখানে বালুরবস্তা ফেলার উদ্যোগ নেয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের চরম অবহেলায় আমাদের গ্রামগুলি যমুনা নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

তারা আরও বলেন, এখানকার ১০/১২টি স্থানে বাঁশের ছটকা তৈরি করে বালুর বস্তা ডাম্পিং করা হলে ভাঙ্গনরোধ করা সম্ভব হবে। তাই অবিলম্বে এখানে এ পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি। 

এ বিষয়ে কুরসি গ্রামের ইয়াসিন মোল্লা বলেন, যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙ্গনে আমার ৮ বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এসব জমিতে আমি ভুট্টা,ধান, সরিষা, বেগুন, টমেটোসহ নানা জাতের সবজি চাষ করে স্বচ্ছল জীবন যাপন করতাম। এখন আমার সব শেষ হয়ে গেছে। সব হারিয়ে আমি এখন পথে বসে গেছি। আমার গোষ্ঠীর সবার মিলে প্রায় ৬০ বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে এ সব জমিজমা হারিয়ে আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি। এখন কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেবো তা নিয়ে চরম দুঃশ্চিন্তায় পড়েছি।

ধীতপুর গ্রামের আছিয়া খাতুন জানান, যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙ্গনে বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাওয়ায় শুণ্য ভিটায় খোলা আকাশের নিচে পলিথিন টানিয়ে আছি। বৃষ্টি এলে সবকিছু ভিজে যায়। কোথায় যাবো তা এখনও ঠিক হয়নি। ছেলে মেয়ে নিয়ে খুব কষ্টে আছি।

এ গ্রামের শামছুল হক জানান, যমুনা নদীতে বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাওয়ায় পাশের শ্রীপুর গ্রামে অন্যের জমিতে বছরে ৫ হাজার টাকা ভাড়ায় আশ্রয় নিয়েছি। বছর শেষে এতো টাকা কিভাবে পরিশোধ করবো তা নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় আছি।

এ বিষয়ে শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাবরিনা সারমিন জানান, ভাঙ্গন এলাকা পরিদর্শন করেছি। সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এছাড়া ভাঙ্গনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলা হয়েছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণের চাল ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। অসহায় ক্ষতিগ্রস্তদের পূণর্বাসনেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। 

এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মখলেছুর রহমান জানান, শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নটি যমুনা নদীর চরাঞ্চল এলাকা হওয়ায় সেখানে আমাদের কোনো প্রকল্প নেই। ফলে ষেখানে আমাদের কোনো কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে নতুন প্রকল্প পাওয়া গেলে সেখানে অবশ্যই কাজ করা হবে। 



   

 

 

 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত