তুরস্ক, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি সই হওয়া ঐতিহাসিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে এবার মিশরও যোগ দিতে পারে বলে জানিয়েছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। আল জাজিরা অ্যারাবিকের বিখ্যাত অনুষ্ঠান ‘আল মুকাবালা’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই তথ্য জানান। মিশর ছাড়াও আরও একাধিক দেশের এই জোটে যুক্ত হওয়ার পথ খোলা রয়েছে বলে ইঙ্গিত দেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট।
গত শুক্রবার (১৪ আগস্ট) পবিত্র নগরী মক্কায় প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের মধ্যে এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি সই হয়, যা আন্তর্জাতিক মহলে ‘মক্কা চুক্তি’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। এই চুক্তির মূল শর্ত হলো- চুক্তিবদ্ধ তিন দেশের যেকোনো একটি যদি বাইরের কোনো শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয়, তবে বাকি দুই দেশও তা নিজেদের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করবে এবং সবাই মিলে যৌথভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
বিশ্লেষকরা এই সমঝোতাকে ন্যাটোর বিখ্যাত ‘আর্টিকেল ৫’-এর মতো শক্তিশালী সামরিক প্রতিরক্ষা পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তবে পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এই জোট নির্দিষ্ট কোনো দেশকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়নি এবং এটিকে হুট করে ন্যাটোর বিকল্প হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
সাক্ষাৎকারে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাল পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এরদোয়ান স্পষ্ট জানান, আঞ্চলিক এই সংকটের সময়ে তুরস্ক তার প্রতিবেশীদের কখনোই একা ফেলে দেবে না। বিশেষ করে গাজা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তুরস্ক কোনোভাবেই গাজাকে একা ছেড়ে দেবে না এবং ফিলিস্তিনিদের সহায়তায় আঙ্কারা সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ নেবে। তিনি অভিযোগ করেন, হামাস সততার সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতিশ্রুতি মেনে চললেও ইসরায়েল একতরফাভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
লেবাননের ওপর ইসরায়েলি হামলা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুরস্ক সফরের সময় তিনি এই যুদ্ধ থামানোর বিষয়ে সরাসরি আলোচনা করেছেন এবং যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন প্রশাসনকে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়া সিরিয়ার দীর্ঘদিনের অস্থিরতা দূর করতে খুব শিগগিরই দেশটি সফর করার কথা জানান এরদোয়ান। তিনি আশ্বাস দেন, সিরিয়ার কুর্দি জনগোষ্ঠীর শান্তি ও অধিকার রক্ষায় তুরস্ক সব ধরনের সহযোগিতা করবে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রুটের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে এরদোয়ান জানান, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় কোনো পক্ষেরই লাভ হচ্ছে না, তাই এটি পুনরায় চালু করাই এখন আঙ্কারার প্রধান অগ্রাধিকার। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা কমাতে ও যুদ্ধবিরতি কার্যকরে কাতার যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে, সাক্ষাৎকারে তারও ভূয়সী প্রশংসা করেন তুর্কি প্রধান। পাশাপাশি সুদান ও লিবিয়ার মতো বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর পাশে তুরস্ক আগের মতোই দৃঢ়ভাবে থাকবে বলে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) তুরস্কের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে এরদোয়ান বেশ কড়া সুরেই কথা বলেন। তিনি জানান, ইইউ হয়তো তুরস্ককে তাদের সদস্য করতে আগ্রহী নয়, তবে এটি নিয়ে তুরস্কের আর কোনো মাথাব্যথা নেই। ইইউ-এর সদস্যপদ এখন আঙ্কারার অগ্রাধিকারের তালিকায় পড়ে না এবং তুরস্ককে বাদ দিয়ে দিনশেষে ইউরোপই ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বহুপ্রতীক্ষিত এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পাওয়ার বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন এরদোয়ান। রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কেনার অপরাধে ২০১৯ সালে তুরস্ককে এফ-৩৫ প্রকল্প থেকে বাদ দিয়েছিল ওয়াশিংটন। তবে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আশ্বাস অনুযায়ী তুরস্কের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে আবারও এই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান প্রকল্পে ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট।
সূত্র: আলজাজিরা
ইসরায়েল যেন যুক্তরাষ্ট্র–ইরান চুক্তি ভাঙতে না পারে: এরদোয়ান