জনবল সংকটে বসছে না স্থায়ী পুলিশ চেকপোস্ট

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০৩ এএম

কয়েক দশক ধরে চলা মাদকের আগ্রাসনে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বিষফোঁড়ায় রূপ নিয়েছে আটকেপড়া বিহারিদের আবাসস্থল জেনেভা ক্যাম্প। মাদক বিক্রি, অস্ত্রের ঝনঝনানি, খুন-ছিনতাইসহ এমন কোনো অপরাধ নেই, যা ঘটছে না এখানে। ক্যাম্পের চারটি মাদক কারবারি গ্রুপের স্পট নিয়ন্ত্রণ-দ্বন্দ্বের জেরে হত্যা এখন নিয়মিত ঘটনা। জুলাই অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর লুট হওয়া থানার অস্ত্রে সংঘর্ষ এখন লাগামছাড়া। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিস্ফোরক দ্রব্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক ধরপাকড় অভিযানেও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না মাদকের স্রোত। জেনেভা ক্যাম্পে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, বহিরাগতদের তল্লাশি ও অবৈধ দখল উচ্ছেদ করার জন্য পুলিশ ক্যাম্পের চারপাশে স্থায়ী চেকপোস্ট বসানোসহ বিশেষ নিরাপত্তা রোডম্যাপ হাতে নেয়। কিন্তু জনবল স্বল্পতায় সেই পরিকল্পনার অনুমোদন মেলেনি। 

তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা দেশ রূপান্তরকে জানান, উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজানের তত্ত্বাবধানে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে অত্যাধুনিক একটি রোডম্যাপ তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়, যার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। সিটি করপোরেশনসহ সব স্টেকহোল্ডারের সহযোগিতায় নিরাপত্তাব্যবস্থা সাজাতে ও ক্যাম্প ঘিরে যুগের পর যুগ চলা অপরাধের লাগাম টানতে পরিকল্পনা বা প্রস্তাব জানানো হয়েছিল। কিন্তু জনবল স্বল্পতায় সেই পরিকল্পনার অনুমোদন পাওয়া যায়নি।

মোহাম্মদপুর থানা সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে জেনেভা ক্যাম্পে অন্তত ৪০টি মাদক ও অস্ত্রবিরোধী অভিযান হয়েছে। ৯টি হত্যা মামলাসহ শতাধিক মাদক মামলা হয়েছে। গত ১০ মাসে অন্তত মাদক ও হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন দেড় হাজারের বেশি। এদিকে, অবাক করা বিষয়, জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা ঠিক কত, তার সঠিক সংখ্যা কারও জানা নেই। কোনো সংস্থাই বলতে পারছে না কারা বৈধ অথবা কারা অবৈধ। সঠিক হিসাব না থাকায় সহজেই অপরাধীরা ক্যাম্পে আত্মগোপনে থেকে বছরের পর বছর অপরাধ করে যাচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জেনেভা ক্যাম্পের প্রধান প্রবেশপথ চারটি। ক্যাম্পকে ৯টি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩৬টি গলি। এই ৩৬ গলির ৩২টি দিয়ে ক্যাম্পের ভেতরে-বাইরে যাতায়াত করা যায়। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের খবরে সহজেই সটকে পড়ে মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধীরা। ক্যাম্পের বাসিন্দা ইউসুফ শেখ বলেন, জেনেভা ক্যাম্পে ৯টি ব্লকের নিয়ন্ত্রণ বড় চারটি মাদক কারবারি গ্রুপের হাতে। তারা হলো ইমতিয়াজ, ভূঁইয়া সোহেল ও আলতাফ ওরফে বম এবং চুয়া সেলিম। মাদক কারবারিদের বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ ভূঁইয়া সোহেল ও তার ভাই টুনটুনের হাতে। হেরোইন ও ইয়াবার বিরাট সাম্রাজ্য গড়ে ক্যাম্পের স্বঘোষিত মুকুটহীন মাদক সম্রাট বনে গেছে গলাকাটা মনু। তার সহযোগী বিখ্যাত বোবা বিরিয়ানির মালিক আলতাফ ওরফে বম ও তার ছেলে ইরফান ওরফে দাম্মাক।

তেজগাঁও বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, ক্যাম্পের ভেতরে-বাইরে নানাবিধ সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ২০ হাজার বাংলাদেশি নাগরিক, যারা ক্যাম্পের কেউ না। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসে জেনেভা ক্যাম্পে ভাড়া নিয়ে দিনমজুর সেজে কাজ করে। তাদের অধিকাংশই অন্য এলাকায় অপরাধ করে এসে ক্যাম্পে আত্মগোপন করে থাকে। এসব বাসিন্দারাও ক্যাম্পের নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে বহিরাগতদের বড় একটি অংশ ক্যাম্পের মাদক সরবরাহের কাজের সঙ্গে জড়িত।

তেজগাঁও বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মাদকের সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমাতে জেনেভা ক্যাম্পের চারপাশে থাকা হুমায়ুন রোড, বাবর রোড, গজনবী রোডের ১০টি পয়েন্টে চারজন পুুরুষ ও একজন নারী পুলিশের সমন্বয়ে একটি টিম করে প্রবেশ ও বাহিরের সময় তল্লাশি চেকপোস্ট স্থাপন করার পরিকল্পনা ছিল। পরিকল্পনা মতে, চেকপোস্ট দিয়ে হেঁটে বৈধ বাসিন্দারা ক্যাম্পে প্রবেশ করবেন। যাতায়াতের সময় প্রত্যেককেই মুখোমুখি হতে হবে তল্লাশির। এ ছাড়া কয়েকটি সড়কে গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। ফলে কেউ চাইলেই গাড়ি ব্যবহার করে মাদক পরিবহন করতে পারবে না। এমনকি জরুরি গাড়ি ছাড়া ক্যাম্পের ভেতরে কোনো যানবাহন চলাচল করতে দেওয়া হবে না।

ক্যাম্পের প্রবেশপথে চেকপোস্টের বিষয়ে এডিসি জুয়েল রানা বলেন, ‘একক অভিযান চালিয়ে এভাবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। অধিকাংশ মানুষ অপরাধ করে বাধ্য হয়ে। এদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।  অবাক হলেও সত্য, জেনেভা ক্যাম্পের অধিকাংশ মাদক কারবারি জন্মসূত্রে মাদক কারবারি। এখানে এমন একটা পরিবেশ, যা মাদক কারবারে বাধ্য করে। আমরা ছোট কারবারিদের খারাপ বলি, অথচ কক্সবাজারে বসে যারা মাদকের বড় বড় কারবার করছে, তাদের আমরা কিছুই বলি না, বলতে পারি না। অথচ তারাই দেশের ভেতরে মাদকের সরবরাহ দেয়। তাই আমরা জেনেভা ক্যাম্প ঘিরে নতুন করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা হাতে নিই এবং একটা রোডম্যাপ তৈরি করি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫ এর নির্বাহী কর্মকর্তাকে নিয়ে আমরা সরেজমিন পরিদর্শনে যাব।  সিটি করপোরেশনসহ সবার সহযোগিতা পেলে ক্যাম্পে মাদকের রমরমা কারবার বন্ধ করতে সক্ষম হব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত