সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের সোনাতনী ইউনিয়নের কুরসি ও ধীতপুর গ্রামের দুই শতাধিক পরিবারের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু কেড়ে নিয়েছে নদী। সব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে শত শত মানুষ। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, নেই কোনো নিরাপদ আশ্রয়। চরম বিপাকে পড়েছেন নারী ও শিশুরা। ভাঙনকবলিত এলাকাতেই মাছ ধরার জরাজীর্ণ জাল দিয়ে ঘিরে তৈরি করা হয়েছে এক টুকরো মাথাগোঁজার ঠাঁই। রোদ-বৃষ্টি আর তীব্র অনিশ্চয়তার মধ্যে সেই ভাঙা ঘরেই কাটছে তাদের মানবিক বিপর্যয়ের রাত।
সরেজমিনে ভুক্তভোগীরা জানান, সম্প্রতি ২ সপ্তাহে শাহজাদপুরের কুরসী ও ধীতপুর গ্রামের ২ শতাধিক বাড়িঘর যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এসব গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় অনেক মানুষের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। তারা ভাঙনকবলিত এলাকায় পলিথিনের ছাউনিতে অথবা মাছ ধরা জাল দিয়ে ঘেরা জরাজীর্ণ ভাঙা ঘরে বসবাস ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এছাড়া ধীতপুর-কুরসি গরুরহাট-বাজার যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় এ অঞ্চলের কৃষকদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য ও গরু-ছাগল বেচাবিক্রিতে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। ফলে এখানকার কৃষকরা চরম অর্থকষ্টে ভুগছেন। ভাঙনকবলিত বাড়িঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় কৃষকরা অন্ধকারে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। গরু চুরি ঠেকাতে তারা গরুর পাশে চৌকি পেতে শুয়ে থেকে গরু পাহারা দিচ্ছেন। বিদ্যুতের অভাবে এ এলাকার শত শত শিক্ষার্থীর লেখাপড়ায় চরম বিঘœ সৃষ্টি হচ্ছে। গরমে গরু-বাছুরের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে।
এই ভাঙনের তা-বে এ পর্যন্ত ২টি মসজিদ-মাদ্রাসা, ২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি অফিস ঘর, ২ শতাধিক বাড়িঘর, ২ হাজার বিঘা আবাদি জমি অসংখ্য গাছপালা যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বিলীন হওয়া জমিতে প্রচুর পরিমাণে ধান, পাট, সরিষা, বাদাম, তিল, কাউন, গম, ভুট্টা ও সবজি চাষ করা হতো। এসব ফসল চাষ করে এ এলাকার শত শত কৃষক আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছিল। রাক্ষসী যমুনায় তাদের জমিজমা সবকিছু বিলীন হয়ে যাওয়ায় তারা নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
ধীতপুর গ্রামের স্বামী পরিত্যক্তা আন্না খাতুন (রুমা) জানান, তার স্বামী তাকে ত্যাগ করার পর গত ১ বছর তিনি এক শিশুকন্যাকে নিয়ে কৃষি দিনমজুর বাবা আব্দুল লতিফ ও মা রেহানা খাতুনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে বসবাস করছেন। গত ৪/৫ দিন তার বাবার বাড়িটি যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়ায় তাদের বসতঘরটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে শূন্য ভিটায় অপর একটি পরিত্যক্ত জরাজীর্ণ ভাঙা ঘরে মা রেহানা খাতুন ও কোলের শিশুকন্যাকে নিয়ে বসবাস করছেন। ঘরটির এক পাশে বেড়া না থাকায় কুকুর, বিড়াল ও শিয়ালের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে মাছ ধরার ঝাঁকিজাল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। অন্যপাশের পাটকাঠির বেড়া পচে খসে খসে পড়ছে। ঘরের চালও নুয়ে পড়েছে। তারপরেও যাওয়ার কোনো জায়গা না পেয়ে তারা এই জীর্ণ ঘরের মধ্যে বসবাস ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। গত কয়েক দিনে তাদের কেউ খোঁজ খবর নেয়নি। সরকারি ১ কেজি চাল পেয়ে তা দিয়ে তাদের কোনোমতে জীবন চলছে।
এ বিষয়ে কুরসি গ্রামের ইয়াসিন মোল্লা বলেন, যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে আমার ৮ বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এসব জমিতে আমি ভুট্টা, ধান, সরিষা, বেগুন, টমেটোসহ নানা জাতের সবজি চাষ করে সচ্ছল জীবনযাপন করতাম। এখন আমার সব শেষ হয়ে গেছে। সব হারিয়ে আমি এখন পথে বসে গেছি। আমার গোষ্ঠীর সবার মিলে প্রায় ৬০ বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে এসব জমিজমা হারিয়ে আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি। এখন কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেব তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছি।
এদিকে গত ১৩ আগস্ট শুক্রবার বিকেলে এলাকাবাসী ভাঙন এলাকায় বালুর বস্তা ফেলে ভাঙনরোধের দাবিতে কুরসি বাজারের ভাঙন এলাকায় দাঁড়িয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন।
শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাবরিনা সারমিন এ বিষয়ে জানান, ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছি। সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এছাড়া ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণের চাল ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। অসহায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মখলেছুর রহমান জানান, শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নটি যমুনা নদীর চরাঞ্চল এলাকা হওয়ায় সেখানে আমাদের কোনো প্রকল্প নেই। ফলে সেখানে আমাদের কোনো কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে নতুন প্রকল্প পাওয়া গেলে সেখানে অবশ্যই কাজ করা হবে।