শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই সঞ্চয়ে অভ্যস্ত করে তোলা এবং আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া শিক্ষার্থী ব্যাংকিং কার্যক্রমে হিসাবের সংখ্যা ৭০ লাখ ছাড়িয়েছে। চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ৫৯টি ব্যাংকে শিক্ষার্থীদের মোট হিসাব দাঁড়িয়েছে ৭০ লাখ ৫৯ হাজার ৬১৫টি। এসব হিসাবে জমা রয়েছে ৩ হাজার ৫১৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন ২০২৬ প্রান্তিকের শিক্ষার্থী ব্যাংকিং-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন নীতিমালায় শিক্ষার্থী ব্যাংকিং হিসাব খোলার বয়সসীমা বাড়ানোর পর এ কার্যক্রমে হিসাব ও আমানত, দুটিই বেড়েছে। জুন প্রান্তিকে শিক্ষার্থী ব্যাংকিং হিসাবে আমানতের পরিমাণ আগের প্রান্তিকের তুলনায় ২০ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অন্যতম উদ্যোগ হিসেবে চালু হওয়া এ কার্যক্রম শুরুতে ‘স্কুল ব্যাংকিং’ নামে পরিচিত ছিল। গত ৯ ফেব্রুয়ারি জারি করা সংশোধিত নীতিমালায় এর নাম পরিবর্তন করে ‘শিক্ষার্থী ব্যাংকিং’ করা হয়। নতুন নীতিমালায় ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের এ হিসাব খোলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সাধারণত অভিভাবকের সহায়তা প্রয়োজন হয়।
শিক্ষার্থী ব্যাংকিং হিসাব খোলার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ শর্ত রাখা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, ন্যূনতম ১০০ টাকা জমা দিয়ে কোনো সেবা মাশুল ছাড়াই এ হিসাব খোলা যায়। এসব হিসাবে ডেবিট কার্ড, এটিএম, এসএমএস ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মতো সুবিধা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে ব্যাংকগুলোকে বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়ারও সুযোগ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বিনামূল্যে ডেবিট কার্ড, বৃত্তি, শিক্ষা উপকরণ ও বিভিন্ন পুরস্কার রয়েছে।
শিক্ষার্থী ব্যাংকিং কার্যক্রমে ব্যাংক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পর্ক বাড়াতে ‘এক শাখা এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান’ নীতির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকের প্রতিটি শাখাকে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শিক্ষার্থীদের আর্থিক শিক্ষা ও ব্যাংক হিসাব খোলার কার্যক্রমে উৎসাহ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে ৬১টি ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে ৫৯টি ব্যাংক শিক্ষার্থী ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। জুন শেষে এসব ব্যাংকে মোট হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭০ লাখ ৫৯ হাজার ৬১৫টি।
ব্যাংকভেদে শিক্ষার্থী ব্যাংকিং কার্যক্রমে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক বা পিসিবির আধিপত্য রয়েছে। মোট শিক্ষার্থী ব্যাংকিং হিসাব খোলার ক্ষেত্রে তাদের অংশ প্রায় ৭৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, জুন প্রান্তিকে শিক্ষার্থী ব্যাংকিং হিসাবের আমানত দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ১৮৮ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৩ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। আগের প্রান্তিকের তুলনায় আমানত বেড়েছে ২০ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, শিক্ষার্থী ব্যাংকিংয়ের বয়সসীমা বাড়ানোর কারণে নতুন হিসাব খোলার প্রবণতা বেড়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি হওয়ায় এসব হিসাবে আমানতও বাড়ছে।
শিক্ষার্থী ব্যাংকিং হিসাবের ভৌগোলিক বণ্টনে শহরাঞ্চল এগিয়ে রয়েছে। মোট হিসাবের ৫৬ দশমিক ০৮ শতাংশ শহরাঞ্চলে এবং ৪৩ দশমিক ৯২ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে।
তবে আগের প্রান্তিকের তুলনায় গ্রামেও শিক্ষার্থী ব্যাংকিং হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে। জুন প্রান্তিকে শহরাঞ্চলে হিসাব বৃদ্ধির হার ছিল ১৩ দশমিক ৪২ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে এ হার ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
অর্থাৎ শিক্ষার্থী ব্যাংকিংয়ের বিস্তার শহরের পাশাপাশি গ্রামেও হচ্ছে। তবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির দিক থেকে গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ব্যাংকিং হিসাব রয়েছে ঢাকা বিভাগে। মোট হিসাবের ২২ দশমিক ২৪ শতাংশ এ বিভাগে। ঢাকা বিভাগে শিক্ষার্থী ব্যাংকিং হিসাবের সংখ্যা ১৫ লাখ ৭০ হাজার ৭৮টি। এসব হিসাবে আমানতের পরিমাণ ১ হাজার ২৮৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা।
এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। মোট শিক্ষার্থী ব্যাংকিং হিসাবের ১৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ এ বিভাগে। চট্টগ্রামে হিসাবের সংখ্যা ১২ লাখ ৯৭ হাজার ৬৭৫টি। এসব হিসাবে জমা রয়েছে ৭২৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ঢাকা বিভাগে থাকা শিক্ষার্থী ব্যাংকিং হিসাবগুলোতে মোট আমানতের ৩৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ রয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগের হিসাবগুলোতে রয়েছে মোট আমানতের ২০ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
শিক্ষার্থী ব্যাংকিংয়ের অন্যতম লক্ষ্য ছিল নারী শিক্ষার্থীসহ পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনা। কিন্তু হিসাবধারীদের মধ্যে নারী শিক্ষার্থীদের অংশ এখনো তুলনামূলক কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে পুরুষ শিক্ষার্থীদের হিসাবের অংশ ৫৪ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং নারী শিক্ষার্থীদের অংশ ১৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি হিসাবের ক্ষেত্রে অন্যান্য শ্রেণির হিসাবধারী রয়েছে।
এ অবস্থায় নারী শিক্ষার্থীদের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে ব্যাংকগুলোর বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষার্থী ব্যাংকিংকে শুধু সঞ্চয় হিসাব হিসেবে দেখছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অর্থ ব্যবস্থাপনা, সঞ্চয়, ব্যাংকিং সেবা এবং ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত করে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও নারী শিক্ষার্থীদের এ কার্যক্রমের আওতায় আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ছোট বয়স থেকেই ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তৈরি হলে ভবিষ্যতে তাদের আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়বে, এমন প্রত্যাশা রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের।
তবে ৭০ লাখের বেশি হিসাব খোলা হলেও এসব হিসাবের সক্রিয় ব্যবহার, নিয়মিত সঞ্চয় এবং গ্রামীণ ও নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু হিসাব খোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষার্থীদের বাস্তব আর্থিক শিক্ষা ও সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলেই শিক্ষার্থী ব্যাংকিং কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে।
বেড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষের অ্যাকাউন্ট সংখ্যা