নাটোরে পুলিশের ওপর হামলা, ২৭০ জনের বিরুদ্ধে মামলা

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৫৫ পিএম

দুই শিশুর মৃত্যুর শোক তখনো কাটেনি। জানাজার মাঠে সুরতহাল প্রতিবেদন ঘিরে তৈরি হওয়া উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় পুলিশের ওপর হামলায়। ওই ঘটনার এক দিন পর নাটোরের গুরুদাসপুর থানায় ২০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে।

বুধবার (২৬ আগস্ট) দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে গুরুদাসপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এমদাদুল হক বাদী হয়ে মামলাটি করেন। সরকারি কাজে বাধা, পুলিশের ওপর হামলা এবং কর্তব্য পালনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগে মামলাটি করা হয়েছে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামে নন্দকুঁজা নদীতে গোসল করতে গিয়ে লাম ও ফারহান নামে দুই শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। খবর পেয়ে অপমৃত্যুর ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে এসআই আবুল বাশার ও কনস্টেবল আবু রাকিব ঘটনাস্থলে যান।

সন্ধ্যায় নিহত লামের বাড়িতে প্রথমে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। পরে ফারহানের মরদেহ ওয়াপদা বাজারসংলগ্ন ঈদগাহ মাঠে নেওয়া হয়েছে জানতে পেরে পুলিশ সদস্যরা সেখানে যান এবং তাঁর মরদেহেরও সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। এরপর দুই শিশুর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

এজাহারে বলা হয়েছে, জানাজা শেষে রাত সাড়ে ৭টার দিকে মরদেহ দুটি অভিভাবকদের কাছে লিখিতভাবে হস্তান্তর এবং বিষয়টি থানায় নথিভুক্ত করার প্রস্তাব দেন এসআই আবুল বাশার। এ সময় উপস্থিত লোকজনের একটি অংশ উত্তেজিত হয়ে ওঠে।

পরিস্থিতি দ্রুত বেগতিক হলে এসআই আবুল বাশার ও কনস্টেবল আবু রাকিব পাশের একটি দোকানে আশ্রয় নেন। অভিযোগ রয়েছে, উত্তেজিত লোকজন দোকানটি ঘিরে ফেলেন এবং তাঁদের গালিগালাজ করতে থাকেন।

রাত ৮টা ১০ মিনিটের দিকে পুলিশ সদস্যরা দোকান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে এক ব্যক্তি বাঁশের লাঠি দিয়ে এসআই আবুল বাশারের মাথায় আঘাত করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে আরও কয়েকজন বাঁশের লাঠি, কাঠের বাটাম ও লোহার রড নিয়ে হামলায় অংশ নেন। এতে দুই পুলিশ সদস্য আহত হন।

পরে তাঁরা নিকটবর্তী একটি মাদ্রাসায় আশ্রয় নিলে সেখানেও হামলার চেষ্টা হয় বলে পুলিশের অভিযোগ।

খবর পেয়ে গুরুদাসপুর থানা থেকে এসআই এমদাদুল হকসহ অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সহায়তায় আহত দুই পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করা হয়। পরে এসআই আবুল বাশারকে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।

তবে ঘটনার বিষয়ে স্থানীয়দের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁদের দাবি, দুই শিশুর জানাজার সময় কাফনের কাপড় সরিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির উদ্যোগ নেওয়ায় উপস্থিত মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। প্রথমে তর্কাতর্কি, পরে ধাক্কাধাক্কি এবং একপর্যায়ে হামলার ঘটনা ঘটে।

ঘটনার পর এসআই আবুল বাশার ও কনস্টেবল আবু রাকিবকে গুরুদাসপুর থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে।

মামলার বাদী এসআই এমদাদুল হক বলেন, রাতের ডিউটি শেষে তিনি থানায় ফিরে এজাহার জমা দিয়েছেন।

গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নান বলেন, মামলার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

দুই শিশুর মৃত্যু, জানাজার মাঠে উত্তেজনা, পুলিশের ওপর হামলা ও দুই পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার—সব মিলিয়ে একটি শোকের ঘটনা এখন রূপ নিয়েছে বড় ধরনের আইনগত ও প্রশাসনিক ঘটনায়।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—শোকের মুহূর্তে কোথায় তৈরি হয়েছিল ভুল বোঝাবুঝি, কেন পরিস্থিতি এত দ্রুত সহিংস হয়ে উঠল এবং কারা প্রকৃতপক্ষে হামলায় জড়িত ছিলেন। সেই উত্তর এখন খুঁজবে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত