বিবিসির বিশ্লেষণ

দিল্লি কেন তারেক রহমানকে চায়?

বাংলাদেশ পরিষ্কার জানিয়েছে, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার বিষয়ে প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা। এর মধ্যেই দিল্লিতে প্রকাশ্যে বক্তব্য রেখে বাংলাদেশে ফিরে আসার ঘোষণা দেন শেখ হাসিনা, যা ঢাকায় তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪০ পিএম

প্রতিবেশী দুটি দেশের সরকারি কূটনৈতিক বার্তার অনাকাঙ্ক্ষিত প্রকাশ অনেক সময় গভীর ভূরাজনৈতিক সম্পর্কের গোপন সমীকরণ সামনে এনে দেয়। বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়, সম্প্রতি ভারতের রাষ্ট্রপতির দফতর থেকে পাঠানো একটি বার্তা প্রত্যাহার এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। 

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিবর্তন, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সমীকরণের কারণে বাংলাদেশকে ঘিরে দিল্লির আগ্রহ এখন তুঙ্গে।

২০২৪ সালের আগাস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ঢাকা ও দিল্লির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে দৃশ্যমান শৈত্যপ্রবাহ তৈরি হয়।

পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিপুল জয়ে বিএনপি সরকার গঠন করার পর বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে দ্রুত সম্পর্ক পুনর্গঠনে তৎপরতা শুরু করে ভারত। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ সম্মান ও উষ্ণ অভ্যর্থনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লি সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

দিল্লির জন্য এমন প্রকাশ্য আগ্রহ দেখানো কিছুটা অস্বাভাবিক হলেও, এর পেছনে রয়েছে গভীর ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণ।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশে বিস্তৃত। চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সীমান্ত, সাড়ে ১২ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের নির্ভরতা দুই দেশকে একে অপরের পরিপূরক করে তুলেছে।

হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে ভারত যেভাবে সড়ক, রেল ও বন্দর ব্যবহারের সুবিধা পেয়েছিল, নতুন সরকারের অধীনেও সেই সুবিধা বজায় রাখা তাদের অগ্রাধিকার। তাছাড়া, নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা দমন দিল্লির অন্যতম বড় স্বার্থ।

তবে এই সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছেন শেখ হাসিনা নিজে। বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হাসিনাকে ফেরত পেতে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতকে চিঠি দিয়েছে।

বাংলাদেশ পরিষ্কার জানিয়েছে, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার বিষয়ে প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা। এর মধ্যেই দিল্লিতে প্রকাশ্যে বক্তব্য রেখে বাংলাদেশে ফিরে আসার ঘোষণা দেন শেখ হাসিনা, যা ঢাকায় তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

ঢাকার কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের মাটিতে হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে তা সম্পর্ক পুনর্গঠনে সাধারণ মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়। ফলে, দেশের ভেতরের রাজনৈতিক পরিবেশ বিবেচনায় রেখে দিল্লি সফরে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন তারেক রহমান।

অন্যদিকে, ঢাকার পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতিও দিল্লির দুশ্চিন্তার বড় কারণ। শেখ হাসিনার বিদায়ের পর বাংলাদেশ তার ঐতিহ্যবাহী পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য আনার কৌশল নিয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের যে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে, তা ভারতের জন্য বেশ উদ্বেগের।

একই সঙ্গে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সমন্বয়ে সম্প্রতি গঠিত ‘মক্কা চুক্তি’ নামক যৌথ প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার আগ্রহ দিল্লির কূটনৈতিক নজরদারিতে রয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তা ও দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের একক প্রভাব ধরে রাখতে ঢাকার এই নতুন বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি ভারতকে গভীরভাবে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে।

এমন পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের সরকার দেখাতে চায় যে তাদের পররাষ্ট্রনীতি একক কোনো প্রতিবেশীর ওপর নির্ভরশীল নয়। তবে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা হলো, ভৌগোলিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত সম্পর্ক বজায় রাখতেই হবে।

ভারতীয় পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞদের মতে, দিল্লি এখন শেখ হাসিনাকেন্দ্রিক পুরনো সমীকরণ থেকে বেরিয়ে এসে ঢাকার নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে একটি নতুন ও টেকসই সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী।

সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন এবং দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলনকে ঘিরে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে বরফ গলার সুযোগ রয়েছে।

একাধিক কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং কৌশলগত প্রয়োজনের পর এখন দেখার বিষয়, ঢাকা ও দিল্লির এই নতুন সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত