শেকলবন্দি দুই বছর

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৭:২৫ এএম

তিনটি খুঁটির সঙ্গে ছয়টি তালা। পায়ে আরও তিনটি। মোট ৯টি তালার ভারী শেকলে টানা দুই বছর বন্দি ৪৫ বছর বয়সী ইলিয়াস উদ্দিন ওরফে সবুজ মিয়া। ময়মনসিংহ  জেলারা ঈশ্বরগঞ্জের রামকৃষ্ণপুর গ্রামের এই মানুষটির খাওয়া, ঘুমানো কিংবা মলমূত্র ত্যাগ সবই কাটে এই বন্দিদশায়। ঘরজুড়ে এখন তীব্র দুর্গন্ধ, আর সবুজের চোখে শুধুই অসহায়ত্ব। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সম্পত্তির লোভে সবুজকে তার দুই ভাই  শেকলে বেঁধে রেখেছেন। তাকে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ বানিয়ে সম্পত্তি ও বাবার ভাতার টাকা ভোগ করার অভিযোগও করেছেন তারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, রামকৃষ্ণপুর গ্রামের একটি ঘরের ভেতর শেকলে বাঁধা অবস্থায় বসে আছেন সবুজ। ঘরের তিনটি খুঁটির সঙ্গে একাধিক তালা দিয়ে শেকল আটকানো। তার দুই পায়েও তালা লাগানো। দীর্ঘ সময় একই জায়গায় বাঁধা থাকার কারণে ঘরটির ভেতরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। খাবার, ঘুম ও মলমূত্র ত্যাগ সবকিছুর জন্যই তাকে ওই অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। সাংবাদিকদের দেখে সবুজ নিজেকে সুস্থ দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘আমি সুস্থ ছিলাম। আমাকে বেঁধে রেখে সম্পত্তির লোভে পাগল বানিয়েছে আমার দুই ভাই। আমার বাঁধন খুলে দেন। আপনাদের দাদা-ভাই ডাকব।’ কথার মধ্যে ইংরেজিতেও কয়েকটি কথা বলেন তিনি ‘সামথিং এনি টাইম’, ‘হাউ আর ইউ?’, ‘আই লাভ ইউ’।

সবুজের একমাত্র ছেলে আনন্দ চৌধুরী নিরব। বয়স ১২ বছর। উচাখিলা ইউনিয়নের রেডিয়াম মডেল স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবাকে এভাবে শেকলে বাঁধা অবস্থায় দেখে তার চোখে পানি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিরব বলে, ‘সবার বাবা তাদের সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যায়, ঘুরতে নিয়ে যায়। যা বলে, তা কিনে দেয়। কিন্তু আমার বাবা শেকলে বাঁধা। আমার বাবা খুব ভালো মানুষ। আপনারা আমার বাবার বাঁধন খুলে দেন।’ নিরবের একমাত্র ছোট বোন বন্যা চৌধুরী তমা বর্তমানে কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলায় তার ফুফু আছমা বেগমের বাড়িতে থাকে।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সবুজ ১৯৯৫ সালে উচাখিলা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে ঈশ্বরগঞ্জ সরকারি কলেজে ভর্তি হলেও এইচএসসি পরীক্ষা দেননি। পরবর্তী সময়ে ময়মনসিংহ শহরে কসমেটিকসের ব্যবসা করতেন। স্ত্রী পপি আক্তার ও দুই সন্তানকে নিয়ে সংসার ছিল তার। স্থানীয় অন্তত ১৫ জন বাসিন্দা দাবি করেন, সবুজ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেন। তাদের ভাষ্য, তিনি সৎ ও মিশুক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তাদের অভিযোগ, প্রায় আড়াই বছর আগে সম্পত্তি লিখে নেওয়া এবং বাবার ভাতার টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে সবুজকে তার দুই ভাই আব্দুল মতিন ও খোরশেদ আলম শেকলে বেঁধে রাখেন।

সবুজের মা জহুরা খাতুনের দাবি, প্রায় তিন বছর আগে বাড়ির একটি গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে সবুজের ওপর ‘জিনে ভর’ করে। এরপর তার আচরণ আরও অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে। ভাইয়ের দাবি, ‘চিকিৎসা চলছে’ সম্পত্তির জন্য ভাইকে শেকলে বেঁধে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সবুজের ভাই খোরশেদ আলম। তার দাবি, সবুজ মানুষকে বিরক্ত করেন বলেই তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে।

সবুজের স্ত্রী বিষয়ে স্থানীয়রা জানান, সবুজ অসুস্থ হওয়ার প্রায় এক বছর পর তার স্ত্রী পপি আক্তার দুই সন্তানকে রেখে বাবার বাড়িতে চলে যান। বর্তমানে তিনি ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা হাসান কিবরিয়া বলেন, বিষয়টি জানতে পেরেছি। কোনো শেকল দিয়ে বেঁধে রাখার আইনগত বৈধতা নেই। খোঁজ নিয়ে সবুজের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা রহমান বলেন, সবুজের বর্তমান অবস্থা, পারিপার্শ্বিক বিষয় ও প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দিয়েছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত