কমবে দূরত্ব বাঁচবে সময়

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৭:২৭ এএম

মেঘনা, তেঁতুলিয়া ও বঙ্গোপসাগরবেষ্টিত দ্বীপজেলা ভোলার মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন সড়কপথে দেশের মূল ভূখ-ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়া। অবশেষে সেই স্বপ্নপূরণের পথে নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। ভোলাকে দেশের জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে ‘রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ-ভোলা’ রুটে মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গত ২২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রস্তাবিত রুটটি বাস্তবায়িত হলে বরিশাল ও রাজধানী ঢাকার সঙ্গে ভোলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগের এক নতুন যুগের সূচনা হবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এই প্রকল্প চালু হলে ভোলার দীর্ঘদিনের নৌপথনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে জেলাটির বিখ্যাত ইলিশ, তাজা মাছ ও উৎপাদিত কৃষিপণ্য দেশের অন্য অঞ্চলে দ্রুত পরিবহনের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হবে। আধুনিক এই যোগাযোগব্যবস্থা ভোলার ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামগ্রিক শিল্পায়নকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত রুটে প্রায় সাড়ে ২১ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান প্রায় ৩৬ কিলোমিটার সড়ক ১৮ ফুট থেকে ৩৪ ফুটে প্রশস্ত করার প্রয়োজন হবে। নদী ও খাল পারাপারের জন্য ইলিশা চ্যানেল, হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জ এলাকায় তিনটি ছোট সেতু নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে।

সওজ সূত্র বলছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা যাচাইসহ প্রয়োজনীয় কারিগরি কাজ করা হবে। এ জন্য পরামর্শক নিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত সমীক্ষা শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। বর্তমানে ভোলার লাহারহাট হয়ে বরিশালের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ থাকলেও ফেরি ও নদীপথের কারণে সরাসরি ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। নতুন রুট বাস্তবায়িত হলে ভোলার সঙ্গে বরিশাল ও ঢাকার যোগাযোগ আরও সহজ হবে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, ভোলা থেকে শরীয়তপুরের ঘোষেরহাট হয়ে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হলে বর্তমান পথের তুলনায় দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার পর্যন্ত কমতে পারে।

ভোলার মানুষ বলছেন, সড়ক যোগাযোগের অভাবে যুগের পর যুগ জেলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। গ্যাসসমৃদ্ধ এই জেলায় শিল্পকারখানা ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা থাকলেও পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে আছে। নতুন মহাসড়ক নির্মাণ হলে গ্যাস, কৃষিপণ্য, মাছ ও ইলিশসহ স্থানীয় উৎপাদন দ্রুত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছানো সম্ভব হবে। আবার ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে শিল্পের কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় পণ্যও সহজে ভোলায় আনা যাবে। ভোলা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নাসির লিটন বলেন, ভোলা হাজার বছর ধরে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতার মধ্যে রয়েছে।

প্রাকৃতিক ও গ্যাসসম্পদ থাকার পরও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে জেলার মানুষ কাক্সিক্ষত উন্নয়নে পৌঁছাতে পারেনি। ভোলাকে জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কে যুক্ত করা হলে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটবে। স্থানীয় সমাজকর্মী মীর মোশারফ হোসেন অমি বলেন, ভোলাকে মূল ভূখ-ের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগে যুক্ত করার উদ্যোগে তারা আনন্দিত। দীর্ঘদিনের এই দাবি দ্রুত বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করেন তিনি। ট্রাকচালক হাসান বলেন, সড়ক যোগাযোগ উন্নত হলে ভোলায় পণ্য পরিবহন সহজ হবে। এতে সময় ও খরচ দুটোই কমবে।

আরেক ট্রাকচালক মিজান বলেন, বর্তমানে ফেরিঘাটে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। সরাসরি মহাসড়ক যোগাযোগ হলে পণ্য পরিবহনে একাধিক ট্রিপ দেওয়া সম্ভব হবে এবং ফেরিঘাটে বসে থাকতে হবে না। বয়োজ্যেষ্ঠ ট্রাকচালক রহমান মিয়া বলেন, সড়ক যোগাযোগ উন্নত হলে ঢাকায় দ্রুত যাতায়াত করা যাবে। ভোলার গ্যাস ও অন্যান্য পণ্য ঢাকায় নেওয়ার পাশাপাশি রাজধানী থেকে প্রয়োজনীয় মালামালও সহজে আনা সম্ভব হবে।

ভোলা জেলা পরিষদের প্রশাসক আলহাজ গোলাম নবী আলমগীর বলেন, ভোলাকে জাতীয় মহাসড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ অত্যন্ত আনন্দের। তবে ভোলা-বরিশাল সেতুর দাবিও গুরুত্বপূর্ণ। সড়ক যোগাযোগ উন্নত হলে এই অঞ্চলের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। ভোলার কাঁচামাল দ্রুত দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো এবং শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সহজে ভোলায় আনা সম্ভব হবে।

ভোলা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইদুল ইসলাম বলেন, ভোলাকে রহমতপুর হয়ে বরিশাল ও ঢাকার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগে যুক্ত করার বিষয়ে সড়ক বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। এ বিষয়ে দ্রুত কাজ এগিয়ে নিতে সার্ভে ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নতুন এই সড়ক যোগাযোগ ভোলাকে সরাসরি বরিশাল ও ঢাকার সঙ্গে যুক্ত করবে এবং জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ তৈরি করবে।

দ্বীপ জেলা ভোলার মানুষের কাছে সড়ক যোগাযোগ শুধু যাতায়াতের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জেলার অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ। তাই ‘রহমতপুর-হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ-ভোলা’ রুটে মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগকে দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা কাটানোর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন ভোলাবাসী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত