স্কুলের বাইরে নয়, এবার হাইস্কুলেও ফোনবিহীন সময়: ১ সেপ্টেম্বর থেকে ফ্রান্সে নতুন নিয়ম

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৯:১৯ এএম

নতুন শিক্ষাবর্ষে ফ্রান্সের হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনে আসছে বড় পরিবর্তন। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে দেশটির হাইস্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহারে জাতীয় পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে যাচ্ছে। ক্লাসের পাশাপাশি স্কুলের বিভিন্ন সময়ে ফোনের ব্যবহার সীমিত করার এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানো এবং স্কুলে সরাসরি সামাজিক যোগাযোগের পরিবেশ তৈরি করা।

ফ্রান্সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোবাইল ফোন নিয়ন্ত্রণ নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে আগে থেকেই বিভিন্ন বিধিনিষেধ চালু রয়েছে। এবার সেই নিয়ন্ত্রণের আওতা বাড়িয়ে হাইস্কুল পর্যায়েও নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে নতুন শিক্ষাবর্ষ থেকে ফরাসি হাইস্কুলে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ আগের তুলনায় অনেক বেশি সীমিত হবে।

মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভরতা নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনা। ২০২৬ সালের শুরু থেকেই ফ্রান্সে শিশু-কিশোরদের প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রভাব নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যায়ে বিতর্ক চলছিল। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার, মনোযোগের ঘাটতি এবং তরুণদের দৈনন্দিন সামাজিক জীবনে এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল।

এই আলোচনার ধারাবাহিকতায় জুলাইয়ে ফরাসি পার্লামেন্টে নতুন আইন অনুমোদিত হয়। ২১ জুলাই পাস হওয়া আইনে ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধের পাশাপাশি হাইস্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থাও রাখা হয়। সরকার পরবর্তী সময়ে জানায়, নতুন শিক্ষাবর্ষ থেকেই হাইস্কুল পর্যায়ে এই বিধিনিষেধ কার্যকর করা হবে।

২৪ আগস্ট সরকারের মুখপাত্র মওদ ব্রেজোঁও বিষয়টি পুনরায় নিশ্চিত করেন। ফলে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ফ্রান্সের হাইস্কুলগুলোকে শুধু নতুন শিক্ষাবর্ষ নয়, নতুন ধরনের স্কুল-সংস্কৃতির সঙ্গেও মানিয়ে নিতে হবে।

তবে জাতীয় আইন হলেও প্রতিটি স্কুলে এর বাস্তব প্রয়োগ একই রকম হবে না। আইন অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বিধিমালার মাধ্যমে ফোন সংরক্ষণ ও ব্যবহারের পদ্ধতি নির্ধারণ করতে পারবে। কোথায় ফোন রাখা হবে, শিক্ষার্থীরা কখন ফোন হাতে নিতে পারবে এবং নিয়ম ভঙ্গ করলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্নতা থাকতে পারে।

কিছু হাইস্কুলে শিক্ষার্থীদের ফোন ব্যাগের মধ্যে বন্ধ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। কোথাও আবার ফোন সংরক্ষণের জন্য বিশেষ বাক্স, পকেট বা লকার ব্যবহারের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা বাস্তবায়ন তুলনামূলকভাবে কঠিন। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফোন নিরাপদে সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং দিনের শেষে ফেরত দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হতে পারে।

এ কারণে ১ সেপ্টেম্বরের আগে সব প্রতিষ্ঠান সমানভাবে প্রস্তুত হতে পারেনি। ২৭ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ফরাসি সংবাদপত্র ল্য মন্ড জানায়, বেশ কিছু হাইস্কুল নতুন নিয়ম পুরোপুরি কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ করতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ হলো স্কুলের অভ্যন্তরীণ বিধিমালা পরিবর্তনের জন্য সংশ্লিষ্ট পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন প্রয়োজন। গ্রীষ্মকালীন ছুটির সময়ে আইন চূড়ান্ত হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতির সময়ও সীমিত ছিল।

তবে কিছু প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই নিজেদের ব্যবস্থা তৈরির কাজ শুরু করেছে। প্যারিসের বুফোঁ হাইস্কুল এবং বেজিয়েরের জ্যাঁ মুলাঁ হাইস্কুল এ ক্ষেত্রে প্রস্তুতি নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে। কোনো কোনো স্কুল আবার নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ফোন ব্যবহারের সুযোগ রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করছে।

নতুন নিয়মে সব পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা থাকবে না। চিকিৎসাজনিত প্রয়োজন কিংবা বিশেষ শিক্ষাগত পরিস্থিতিতে মোবাইল ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ নিয়মটি কঠোর হলেও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমের সুযোগ রাখা হয়েছে।

নিয়ম অমান্য করলে শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোন সাময়িকভাবে জব্দ করার ব্যবস্থা থাকতে পারে। তবে শাস্তির ধরন নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট স্কুলের অভ্যন্তরীণ বিধিমালা। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের শাস্তি দেওয়া নয়, বরং স্কুল চলাকালীন ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যবহারের একটি সুস্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করা।

এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ফ্রান্সের শিক্ষা ব্যবস্থা একই সময়ে দ্রুত ডিজিটাল হয়ে উঠছে। শিক্ষার্থীরা বাড়ির কাজ, সময়সূচি, নোটিশ এবং বিভিন্ন শিক্ষাসংক্রান্ত তথ্যের জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। স্কুলের খাবার ও অন্যান্য প্রশাসনিক সেবাতেও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে। ফলে ব্যক্তিগত স্মার্টফোন নিষিদ্ধ হলেও শিক্ষার প্রয়োজনীয় ডিজিটাল কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়টি আলাদাভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।

সরকারের প্রত্যাশা, ফোনের ব্যবহার কমলে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে বিরতির সময় তারা মোবাইলের পর্দায় ব্যস্ত না থেকে সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলা, খেলাধুলা ও সরাসরি সামাজিক কর্মকাণ্ডে বেশি যুক্ত হবে। এর মাধ্যমে স্কুলে শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক যোগাযোগ এবং সামাজিক পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে নতুন নিয়মটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া, শিক্ষক-অভিভাবকদের গ্রহণযোগ্যতা এবং স্কুলগুলোর প্রশাসনিক সক্ষমতা এই উদ্যোগের সফলতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ফ্রান্সের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের মাত্রা নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর একটি দেশ কীভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করছে, তা বাংলাদেশের শিক্ষানীতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।

১ সেপ্টেম্বর নিয়মটি কার্যকর হওয়ার পর আগামী কয়েক মাসে এর বাস্তব প্রভাবই বলে দেবে, ফ্রান্সের হাইস্কুলগুলোতে ফোনমুক্ত সময় শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও সামাজিক যোগাযোগ কতটা বাড়াতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত