এনএসইউতে এসআইপিজি-সিইই সেমিনার

পানি ইস্যুতে সিদ্ধান্ত হতে হবে জাতীয় স্বার্থনির্ভর: রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৮:২১ পিএম

বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন বিষয়গুলো কারিগরি হলেও এর সমাধান শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক এবং জাতীয় স্বার্থনির্ভর হতে হবে।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত ‘ট্রান্সবাউন্ডারি ওয়াটার শেয়ারিং ইসুস অ্যান্ড পদ্মা ব্যারাজ’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন। 

সেমিনারটি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্স (এসআইপিজি), এনএসইউ এবং সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ (সিইই), এনএসইউ যৌথভাবে আয়োজন করে। এতে নীতিনির্ধারক, পানি বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি, তিস্তা ইস্যু এবং প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে আলোচনা করেন। 

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশকে বর্ষা মৌসুমের অতিরিক্ত পানি এবং শুষ্ক মৌসুমের পানি সংকট, উভয় বাস্তবতা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

নদীর পরিবেশগত মূল্য তুলে ধরে তিনি বলেন, একটি নদীকে শুধু তার সংখ্যা দিয়ে বোঝা উচিত নয়; বরং তার ইকোসিস্টেম এবং তার সৃষ্ট বিস্তৃত প্রভাবের আলোকে বুঝতে হবে। তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ শুধু একটি প্রকৌশল প্রকল্প নয়; এটি কৃষি, জীবন-জীবিকা এবং পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি জাতীয় উন্নয়ন ইস্যু।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিশেষ সহকারী  ড. মো. সাইমুম পারভেজ।

সরকারের পরিবেশগত অগ্রাধিকার, বৃক্ষরোপণ, খাল খনন, বর্জ্য থেকে সম্পদ সৃষ্টির উদ্যোগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সবুজ বাংলাদেশ গঠনের পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি বলেন, দক্ষ পানি ব্যবহার এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য আন্তঃসীমান্ত পানি বিরোধ প্রশমনের পথ তৈরি করতে পারে। তিনি আরও বলেন, পানি বণ্টনের চ্যালেঞ্জগুলোকে নদী অববাহিকার গতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রভাব, উভয় দিক থেকেই বুঝতে হবে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. মোহাম্মদ আবুল হোসেন, যৌথ নদী কমিশনের সাবেক সদস্য। তিনি নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা, জল-অর্থনৈতিক মডেলিং, সুবিধা বণ্টন, দক্ষ পানি ব্যবহার এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত পানি বিরোধ নিরসনের সম্ভাবনা তুলে ধরেন।

এসআইপিজি, এনএসইউ’র সিনিয়র রিসার্চ ফেলো রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ সুফিউর রহমান পানি কূটনীতি ও নীতি বিষয়ক উপস্থাপনা প্রদান করেন। তিনি সংশ্লিষ্ট ভারতীয় অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় গড়ে তোলা এবং ন্যায্য ও সহযোগিতামূলক পানি বণ্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, “পানিকে বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে নয়, বরং একটি যৌথ সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে। তিনি আরও বলেন, সমতা, ন্যায্যতা এবং কোনো পক্ষের ক্ষতি না করার নীতিকে পানি বণ্টন আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে হবে।

আলোচনায় অংশ নেন সাবেক সচিব প্রকৌশলী এ এন এইচ আখতার হোসেন এবং বুয়েটের পানি সম্পদ প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আতাউর রহমান।

আলোচকরা প্রকৌশল জ্ঞান, পরিবেশ সুরক্ষা, আইনি প্রস্তুতি, অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনা এবং কূটনীতির সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী জাতীয় কাঠামো গঠনের আহ্বান জানান।

অধ্যাপক ড. মো. আতাউর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ দেশের বহুমাত্রিক প্রয়োজন পূরণে পানি নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি আরও বলেন, কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা সেচ, কৃষি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনকে সহায়তা করতে পারে।

টাফটস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বিষয়টিকে ‘প্রকৌশল কূটনীতি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, যেখানে বাস্তবতার সঙ্গে কারিগরি বিশ্লেষণ ও প্রমাণভিত্তিক চিন্তার সমন্বয় প্রয়োজন। তিনি বলেন, চুক্তি হলো হিমশৈলের দৃশ্যমান অংশমাত্র; এর নিচে থাকা ধারা, কাঠামো এবং মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা অত্যন্ত জরুরি।

সেশনটির সভাপতিত্ব করেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী। তিনি বলেন, ভাটির দেশ হিসেবে পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে যখন আমাদের প্রাপ্তি শূন্য বা অপূর্ণ থেকে যায়, তখন নিজেদের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশলভিত্তিক সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের পানি সম্পদকে জাতীয় কল্যাণে ব্যবস্থাপনা করতে হবে, তবে তা হতে হবে টেকসই জীবনযাপনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম, অধ্যাপক, সিইই, এনএসইউ, সেমিনারের মূল আলোচ্য বিষয় তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশে পানি সম্পদ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের হস্তক্ষেপের আগে নদীর মৌসুমি পরিবর্তন, পলি জমা, স্বচ্ছতা এবং বিশেষজ্ঞ মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।

সমাপনী বক্তব্য ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন অধ্যাপক ড. এস কে তৌফিক এম হক। তিনি নীতিনির্ধারকদের একাধিক আলোচনাপ্রসূত পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় সব ধরনের আলোচনায় আমাদের আরও বেশি সংহতি ও সৌহার্দ্য প্রয়োজন। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, নীতিনির্ধারকদের পরিকল্পনা ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে; চুক্তি নবায়ন স্বয়ংক্রিয়ভাবে হবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং টেকসই উন্নয়ন সুরক্ষায় জাতীয় প্রস্তুতি, প্রমাণভিত্তিক পানি কূটনীতি, আঞ্চলিক সংলাপ, কারিগরিভাবে যথাযথ নদী ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বিত নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বানের মধ্য দিয়ে সেমিনারটি শেষ হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত