রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের জন্য পদত্যাগ করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর গত ২০ আগস্ট বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করে বিএনপি। দায়িত্ব গ্রহণের পর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সমসাময়িক রাজনীতি, বিরোধী দলের আন্দোলনের হুমকি, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দল পুনর্গঠন, মব জাস্টিসসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রেজাউল করিম লাবলু
প্রশ্ন : সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলছে বিরোধী দল। তারা আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়েছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
উত্তর : সরকার ব্যর্থ হয়েছে এটা বিরোধী দলের ঢালাও মন্তব্য। দেশকে এগিয়ে নিতে বর্তমান সরকারের কাজের সততা জনগণের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে। সরকারের অর্জন ও অগ্রগতির বিষয়গুলো পরিসংখ্যান দিয়ে যাচাইযোগ্যভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। তাছাড়া জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার রক্ষা করায় বিএনপি আজ একটি গণভিত্তিক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। দেশ ও জনগণের কল্যাণে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপে জনসমর্থন রয়েছে।
প্রশ্ন : সরকারের দিক থেকে দায়িত্বশীল আচরণের কথা বলা হচ্ছে; কিন্তু বিরোধী দল সরকারের কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনা করছে, নানান হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। এই বিষয়গুলোকে আপনারা কীভাবে দেখছেন?
উত্তর : দেখুন, কোনো কোনো মহল সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সরকারের সমালোচনা করা শুরু করেছে। তারা বলছে সরকার ব্যর্থ। এত কম সময়ে জনগণের দীর্ঘদিনের সব প্রত্যাশা রাতারাতি পূরণ করা সম্ভব নয়। বিরোধীদের কাজই হলো বিরোধিতা করা, অনেক সময় তারা ঢালাওভাবে সমালোচনা করে। মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সাধারণের নাগালে রাখতে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের সুফল পেতে শুরু করেছে মানুষ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনেও সরকার কাজ করছে।
প্রশ্ন : সরকার ইতিমধ্যে ১৮০ দিন অতিবাহিত করেছে। সরকারের কর্মকা- সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
উত্তর : বিএনপি একটি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে সরকারের দায়িত্ব নিয়েছে। নৈরাজ্যের মধ্যেই আমরা ৫ আগস্ট পেলাম। রাতারাতি সব পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তারপরও ছয় মাসে সরকার প্রতিটি সেক্টরে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করেছে। এটি সবচেয়ে বড় সাফল্য। আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ফিলিপাইনে পাচার করেছে। সোনালী ও বেসিক ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক থেকে হাজার হাজার টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করেছে। সরকার এগুলো ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু করেছে। এত নৈরাজ্যকর পরিবেশ অতিক্রম করতে প্রধানমন্ত্রী নিরলস পরিশ্রম করেছেন। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন করেছেন।
দীর্ঘদিনের অন্যায়, অত্যাচার ও ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্যের কারণে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটলে ফ্যাসিবাদীরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। মুদ্রার এপিঠ ছিল ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আর ওপিঠ ছিল ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর (স্বদেশ প্রত্যাবর্তন) আমাদের নেতার প্রতি জনগণের আস্থা। এসব গণসম্পৃক্ততা আমাদের সামনে পুরনো পরিস্থিতি থেকে রূপান্তরের বার্তা নিয়ে এসেছে। আমাদের নেতা সে অনুযায়ী ৩১ দফার প্রেক্ষাপটে কাজ শুরু করেছেন। আজ জনগণ তাদের ভোটাধিকার ফেরত পেয়ে ম্যান্ডেট দিয়েছে এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা সরকার গঠন করে আপনাদের সামনে জবাবদিহির মঞ্চে দাঁড়িয়েছি।
তবে আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ধ্বংসস্তূপ পুনর্গঠন করা। ফ্যাসিবাদ যে ধ্বংসস্তূপ অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গে তৈরি করে গেছে, প্রথম পর্বের দিনগুলোতে আমাদের সেই ধ্বংসস্তূপ নতুন কর্মসূচি গ্রহণের উপযোগী করে তুলতে হচ্ছে। কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেয়েও রাষ্ট্রযন্ত্রের এই বিনির্মাণের কাজটি এখন আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন : বিএনপি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে এবং ২০২৬ সালে এসেও ক্ষমতায় রয়েছে দীর্ঘ ১৭ বছরের এই সংগ্রামের পথ পরিক্রমা ও আপনার মূল্যায়ন কী?
উত্তর : ১৭ বছর গণতান্ত্রিক সংগ্রামের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে দলের নেতাকর্মীরা নানাভাবে জুলুম, নিপীড়ন ও অত্যাচারের শিকার হয়েছেন। এর বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে কারও চোখ নেই, কারও হাত নেই, কারও শরীর শটগানের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে, অনেকে কবরে চলে গেছেন। অসংখ্য মিথ্যা মামলা নেতাকর্মীদের মাথার ওপর ঝুলছিল, যেগুলোর অনেকগুলো এখনো পুরোপুরি প্রত্যাহার হয়নি। আমাদের নেতাকর্মীরা জেলখানার ভেতরে এবং বাইরে উভয় জায়গাতেই বন্দি ছিলেন এবং এক বন্দি মানসিকতা নিয়ে দিন কাটাতে হয়েছে।
প্রশ্ন : আপনি এরশাদবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। এরশাদ আমল ও শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের মধ্যকার পার্থক্য কীভাবে করবেন?
উত্তর : এরশাদের আমল হাসিনার তুলনায় একপ্রকার ‘শিশু স্বৈরাচার’ ছিল। এরশাদও ছাত্র, মানুষ ও শ্রমিক হত্যা করেছেন এবং গণতন্ত্রকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু শেখ হাসিনা যে জুলুমের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন তা তুলনাহীন। শেখ হাসিনা বিরোধীদলশূন্য করে এবং অস্তিত্ব বিনাশ করে নিজের ক্ষমতা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন, যা পৃথিবীর নিকৃষ্টতম ফ্যাসিবাদী শাসনের দৃষ্টান্ত। শেখ হাসিনার শাসন ছিল অনেক বেশি ভয়াবহ, নিষ্ঠুর ও বেদনাদায়ক। আমাদের অনেক নেতাকর্মী এখনো ফিরে আসেননি, অনেকে কবরে শায়িত আছেন। এই ভয়াবহতার সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা হয় না।
প্রশ্ন : দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন প্রক্রিয়া কবে নাগাদ শুরু হতে পারে?
উত্তর : দল এ ব্যাপারে ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে।
প্রশ্ন : স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে না। সেক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা ও প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া কেমন হবে?
উত্তর : স্থানীয় সরকারের বিষয়ে আমাদের পার্টির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী প্রতি সপ্তাহে একদিন করে দুটি-তিনটি জেলার সঙ্গে বসছেন। জেলাগুলোর পাশাপাশি সেখানকার উপজেলা, থানা ও পৌরসভার নেতাদের সঙ্গেও তিনি বৈঠক করছেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচন যেহেতু দলীয় প্রতীকে হবে না, তাই দল কীভাবে তা কন্টাক্ট করবে এবং প্রার্থী বাছাই করবেÑ সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। দল যাকে যোগ্য মনে করবে, সমগ্র দল তার পক্ষেই কাজ করবে। এর অন্যথা কেউ করতে পারবে না। দলীয় সমর্থনের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের যোগ্যতা, সততা এবং জনসম্পৃক্ততাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রশ্ন : মন্ত্রিসভায় রদবদল বা পরিবর্তনকে কীভাবে দেখছেন?
উত্তর : এটা একটা রুটিন ওয়ার্ক, যা প্রায়ই হয়ে থাকে। পারফরম্যান্স ও নানা দিক বিবেচনা করে এই রদবদল করা হয়। নির্বাহী প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর এটা একান্ত এখতিয়ার।
প্রশ্ন : সাম্প্রতিক সময়ে অনেক ক্ষেত্রে অযাচিত পন্থায় দাবি আদায়ের প্রবণতা বা ‘মব জাস্টিস’-এর মতো বিষয়গুলো সামনে আসছে। এ বিষয়ে বিএনপির অবস্থান কী?
উত্তর : আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি, রাষ্ট্রে কোনোভাবেই বিশৃঙ্খলা বা ‘মবক্রেসি’ চলতে দেওয়া যাবে না। দেশ চালাতে হবে সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক ও আইনের শাসনের ওপর ভিত্তি করে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অপরাধী যেই হোক, তার রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। জনমতের নামে কোনো গোষ্ঠীগত জোরজবরদস্তি বা আইনের বরখেলাপ সমাজ মেনে নেবে না।
প্রশ্ন : জনসাধারণের জন্য বিএনপি থেকে কী বার্তা থাকবে?
উত্তর : জনসাধারণের প্রতি আমাদের একটাই বার্তা জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। দীর্ঘ আন্দোলন ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই মুক্ত পরিবেশে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হবে। বিএনপি সবসময় জনগণের পাশে ছিল, আছে এবং থাকবে। একটি সুখী, সমৃদ্ধ এবং ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে আমাদের দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন। দেশের উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।‘