প্রত্যাশার চাপে বিএনপি

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪১ এএম

রাজনীতির নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ ৪৯ বছরে পা দিচ্ছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইতিহাস, ঐতিহ্যের ধারক-বাহক দলটি একাধিকবার সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনা করেছে। ক্ষমতায় এসে বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষি, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগও নিয়েছে বিএনপি। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার নানামুখী ব্যতিক্রমী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে ঘোষণা করা ইশতেহার বাস্তবায়নে শুরু হয়েছে কাজ। জটিল সময়ে নানামুখী প্রত্যাশার চাপ রয়েছে দলটির ওপর। 

সর্বশেষ দীর্ঘ ১৭ বছর রাজপথে আন্দোলন ও শত শত নেতাকর্মীর জীবনের বিনিময়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। এরপর থেকেই চলছে নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। বিশেষ করে ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য লড়াই করতে হচ্ছে বিএনপি সরকারকে। এমন প্রেক্ষাপটে দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে গণমুখী রাজনৈতিক চর্চা ও জাতীয় ঐক্য সুসংহত করার সুযোগ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রেস সচিব সালেহ শিবলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিএনপি রাজনীতিতে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বর্তমানে আবারও ক্ষমতায় এসেছে। বিএনপির বড় শক্তি জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন। দেশের জনগণই হলো দলটির রাজনৈতিক শক্তি। তাই বিএনপি যখনই ক্ষমতায় আসে তখনই জনগণের জন্য কিছু করার চেষ্টা করে।’   

১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির জন্ম। দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন এবং একটি বিকল্প রাজনৈতিক ধারা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ১৯ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে দলটির যাত্রা শুরু হয়। এর মূল আদর্শ ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’, যা বাঙালি সংস্কৃতির পাশাপাশি দেশের সব নাগরিকের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও অধিকারের সমন্বয়ে গঠিত। রাজনৈতিক অবস্থানের দিক থেকে বিএনপি কেন্দ্র থেকে মধ্য-ডানপন্থি। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আপসহীন ভূমিকা পালন করে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলটি দেশের রাজনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে। এরপর এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তারা ক্ষমতায় আসে। বিভিন্ন রাজনৈতিক পালাবদলে দলটি কখনো সরকারে এবং কখনো প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় ছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল ও দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে বিএনপি দীর্ঘ সময় ধরে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে গেছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ লড়াই ও আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়েও তারা নিজেদের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রেখেছে। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি।

চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এবারই প্রথম দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে বিএনপি। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সামনে রেখে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি সম্পর্কে দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। জিয়াউর রহমান দল প্রতিষ্ঠার পর স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আপসহীন ভূমিকা পালন করে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে বিএনপিকে শক্ত গণভিত্তির ওপর দাঁড় করান খালেদা জিয়া। আজকে তার ছেলে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়ার পতাকা নিয়ে তাদেরই দেখানো পথে একই সঙ্গে দল ও সরকার পরিচালনা করছেন। তিনি তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন। খালেদা জিয়া নেই তবে তার আদর্শ বুকে ধারণ করে আমরা বিএনপি ও সরকার পরিচালনা করব।’

বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপিকে প্রতিবারই একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে দেশের হাল ধরতে হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘ শাসনামলে দেশের শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেভাবে ধ্বংস করেছে, সেখান থেকে দেশকে টেনে তোলাই এখন বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’

তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার ও গত ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। ১৭ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে সরকার ভঙ্গুর অর্থনীতি ও আর্থিক খাত সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’

রাষ্ট্র পরিচালনায় জিয়াউর রহমানের সাফল্য : ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারা পুনঃপ্রবর্তন করেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের পর সেনাবাহিনী ও প্রশাসনসহ দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেন। কৃষি খাতে অগ্রাধিকার দিয়ে খাল কাটা কর্মসূচি ও আধুনিক কৃষিপদ্ধতির প্রচলন করেন, যার ফলে খাদ্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। সমাজতান্ত্রিক ধারার বাইরে এসে উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতি, বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের (যেমন তৈরি পোশাক ও চামড়াশিল্প) ভিত্তি স্থাপন করেন। দাপ্তরিকভাবে বিদেশে বাংলাদেশি দক্ষ ও অর্ধদক্ষ কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেন, যা পরবর্তীতে দেশের রেমিট্যান্স আয়ের বড় উৎসে পরিণত হয়। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্য গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে সার্ক গঠনের মূল উদ্যোক্তা বা প্রবক্তা ছিলেন তিনি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে গতিশীলতা আনেন এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করেন।

খালেদা জিয়ার সফলতা : ১৯৯১ সালে এরশাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনের পর অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তার শাসনামলে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করা হয়। দশম শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক ঘোষণা এবং ছাত্রীদের জন্য উপবৃত্তি ও ‘শিক্ষার জন্য খাদ্য’ কর্মসূচি চালু করা হয়, যা নারী শিক্ষার প্রসারে বিপ্লব আনে। শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ তার সরকারের একটি বড় যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করা হয়। ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে বাজার অর্থনীতি গ্রহণ ও উদারীকরণ এবং শিল্প খাতের প্রসারে তার সরকার কাজ করে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপরে বজায় থাকে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। ১৯৯১ সালে মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির মাধ্যমে তাদের বড় একটি অংশকে সসম্মানে সে দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে কূটনৈতিক সফলতা অর্জন করেছিল তার সরকার।

সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমানের অভিযাত্রা : সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, নদী রক্ষা এবং সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ বাড়াতে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে ‘পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প অনুমোদন করেছে বর্তমান বিএনপি সরকার। ব্যবসায়ীদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (বিডা) ওয়ান-স্টপ সার্ভিস বা ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ চালু করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সাড়া ফেলেছে সাধারণ মানুষের মাঝে। এ ছাড়া শিক্ষা ও জনকল্যাণশিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মর্যাদা রক্ষায় মসজিদ ও মন্দিরের ধর্মীয় নেতাদের জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থে মাসিক সম্মানী ও কল্যাণ ভাতা চালু করা হয়েছে। খাল খনন কার্যক্রম বাস্তবায়নের পাশাপাশি ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কাজ চলছে।

বিএনপি সরকারের সামনে যত চ্যালেঞ্জ : গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে বড় ধরনের প্রত্যাশার মুখে পড়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে জরুরি কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পরিস্থিতিকে নাজুক করে রেখেছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ায় অর্থনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি শিল্প-বাণিজ্য খাতও চাপের মুখে পড়ছে। এ ছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কার, পুলিশ বাহিনীকে পেশাদার করা এবং বিচারব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এসব ক্ষেত্রেও দ্রুত অগ্রগতি প্রয়োজন।

এর বাইরে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে হাজির হয়েছে সরকারের সামনে। এই সংস্কার প্যাকেজ নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে সমঝোতার পথ খুঁজতে হবে সরকারকে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ রয়েছে সরকারের ওপর। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, দীর্ঘ মেয়াদে দলটিকে রাজনীতির বাইরে রাখা কঠিন হতে পারে।

পররাষ্ট্র নীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখা নিয়েও রয়েছে নানামুখী চ্যালেঞ্জ। ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা ও উন্নয়ন কৌশলগতভাবে জরুরি, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন একটি জটিল মরুকরণের মধ্যে আটকে আছে। বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্র নীতি সম্পর্কে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সবার সঙ্গেই সম্পর্ক রক্ষা করব। এক্ষেত্রে আমাদের নীতি হবে সবার আগে বাংলাদেশ। দেশের স্বার্থ রক্ষা করেই আমরা সরকার পরিচালনা করব।’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে আমরা রাজনৈতিক কর্মসূচি তো দূরের কথা মিলাদের মতো কর্মসূচি পালন করতে পারিনি। তবে ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর আমরা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করতে পারছি। প্রতি বছরই আমরা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করি। প্রতিবারের চেয়ে এবার ব্যতিক্রম, কারণ বিএনপি এখন ক্ষমতায়। এটাই সবচেয়ে স্বস্তির বিষয়।’

আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বিএনপির জন্মই হয়েছিল চ্যালেঞ্জ নিয়ে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান তৎকালীন সময়ে একদলীয় রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রের শুভ সূচনা করেছিলেন। এরপর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দীর্ঘ ৯ বছর রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতন ঘটিয়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসেন। তিনি বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেন, যা এখনো চলছে। সরকারের সামনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, সার সংকটসহ যত চ্যালেঞ্জ রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা সেগুলোকে কাটিয়ে উঠতে পারব বলে আশা রাখি। জনগণের যে প্রত্যাশা তা পূরণ করতে পারব।’

বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বিদ্যুৎ এবং জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশ রূপান্তরকে বলেন,  ‘গত ১৭ বছর বিভিন্ন জায়গায় সাইনবোর্ড টাঙিয়ে বলা হতো, ওই এলাকা শতভাগ বিদ্যুতায়িত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সব ছিল শুভঙ্করের ফাঁকি। বিদ্যুতের স্থায়ী সমাধান না করে কুইক রেন্টালের নামে বিশেষ ব্যক্তিদের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। দুর্নীতির মাধ্যমে ধ্বংসপ্রাপ্ত বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার কাজ শুরু করেছে। এর সুফল পেতে কিছুটা সময় লাগবে।’

জনগণের ভালোবাসার প্রতিদান দিতে চাই : তারেক রহমান

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের এই দিনে দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বিএনপি। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা, র‌্যালি, বৃক্ষরোপণ, মৎস্য অবমুক্তকরণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও ক্রীড়া অনুষ্ঠান।

নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশে দলীয় কার্যালয়ে আজ মঙ্গলবার সকাল ৬টায় দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। এরপর সকাল ৯টায় বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে শেরেবাংলা নগরে জিয়াউর রহমান এবং বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে যাবেন। সেখানে ফাতেহা পাঠ ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন তিনি। এই কর্মসূচিতে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও অংশ নেবেন। নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গত ২৬ আগস্ট দলের যৌথসভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এসব কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর শনিবার বিকেল ৩টায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে ‘বিএনপি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য’ শীর্ষক আলোচনা সভা হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা এবং বরেণ্য বুদ্ধিজীবীরাও এতে অংশ নেবেন। এ ছাড়া সারা দেশের জেলা ও মহানগর বিএনপি এবং ইউনিটগুলো সুবিধাজনক সময়ে আলোচনা সভা, র‌্যালিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এক বাণীতে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সাহস, সংগ্রাম, ত্যাগ আর সাফল্যের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দিনটি বাংলাদেশি মানুষের জন্য আনন্দ, উদ্দীপনা ও প্রেরণার।’

তারেক রহমান বলেন, ‘১৯৭৮ সালের এই দিনে এক শুভ বিকেলে ঢাকার রমনা বটমূলের খোলা চত্বরে (রমনা রেস্তোরাঁ প্রাঙ্গণে) বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক, সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইতিহাসে বিএনপির প্রতিষ্ঠা ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা।’

তিনি বলেন, ‘মানুষের বাকস্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি অভিশপ্ত একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসে প্রথমেই দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনীতি করার অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় সময়ের প্রয়োজনে নতুন রাজনৈতিক দল বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশে বহুমাত্রিক গণতন্ত্রের নতুন করে পথচলা শুরু হয়।’

বাণীতে স্বাধীনতার মহান ঘোষক, সফল রাষ্ট্রনায়ক ও আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া তার সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপিকে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘গণতন্ত্র কিংবা সুশাসন প্রতিষ্ঠাই নয়, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায়ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করেছে। দেশে যতবারই স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণতন্ত্র হুমকির সম্মুখীন হয়েছে, ততবারই গণতন্ত্রকামী জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির নেতাকর্মী, শুভার্থী ও সমর্থকরা অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন।’

দেশে গণতন্ত্র এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত যারা প্রাণোৎসর্গ করেছেন, আহত হয়েছেন সেইসব নেতাকর্মীর অবদানকে তিনি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন।

বাণীতে তারেক রহমান বলেন, ‘দেশে যতবারই জনগণ নির্ভয়ে অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে, ততবারই বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদে সরকার পরিচালনার সময় দেশে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন, নারী শিক্ষার প্রসারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বিএনপি সরকারের আমলে নেওয়া হয়েছে। দেশে গণতন্ত্র সমুন্নত রাখা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য বিএনপির উদ্যম ও উদ্যোগের ফলে দলটি দেশবাসীর কাছে এখন সর্বাধিক জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল।’

তারেক রহমান বলেন, ‘দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের অবসানের পর একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের জনগণ আবারও বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। দেশের জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই বিএনপি জনগণের ভালোবাসার প্রতিদান দিতে চায়। সেই লক্ষ্যেই বাংলাদেশকে একটি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য বিএনপি সরকার নিরলসভাবে কাজ করে চলছে।’

বৃক্ষরোপণ ও মৎস্য অবমুক্তকরণ : বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচির মধ্যে বৃক্ষরোপণ ও মৎস্য অবমুক্তকরণ কর্মসূচি রয়েছে। এতে নেতৃত্ব দেবেন দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেবেন দলের যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। সারা দেশে দলীয় ইউনিটগুলোও স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত