হিটু শেখের প্রাণদন্ড বহাল

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪৫ এএম

শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় অধস্তন আদালতে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি হিটু শেখের সাজা বহাল রেখেছে উচ্চ আদালত। প্রায় ১৭ মাস আগে মাগুরায় ৮ বছর বয়সী শিশু আছিয়া আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়। আসামির ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ডাদেশের অনুমোদন) ও আপিলের ওপর শুনানি শেষে গতকাল সোমবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কেএম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ এ রায় দেয়।

দন্ডপ্রাপ্ত হিটু শেখ শিশু আছিয়ার বোনের শ্বশুর। গত বছরের মার্চে সংঘটিত শিশু ধর্ষণ ও হত্যার এ ঘটনা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। শিশুটির সুস্থতা কামনা ও তার মৃত্যুর ঘটনার কঠোর বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।

ওই বছরের ১৭ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল বিচারের রায়ে আসামি হিটুকে প্রাণদন্ডাদেশ দেয়। শিশুটির বোনের স্বামী সজীব শেখ, সজীবের ভাই রাতুল শেখের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি দেখানো এবং বোনের শাশুড়ি জাহিদা বেগমের বিরুদ্ধে আলামত গোপনের অভিযোগের প্রমাণ না মেলায় তাদের খালাস দেয় আদালত। রায়ের পর হিটুর ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। আসামি হাইকোর্টে আপিল করে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসংক্রান্ত ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও বিবিধ বিষয় হাইকোর্টে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিষ্পত্তির লক্ষ্যে গত ১০ জুন বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর নেতৃত্বে একটি বেঞ্চ গঠন করে দেন প্রধান বিচারপতি। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে গঠিত ওই বেঞ্চে আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি কার্যতালিকায় আসার পর গত ১১ আগস্ট শুনানি শুরু হওয়ার পর তিন কার্যদিবসে শুনানি নিয়ে রায়ের পর্যায়ে আসে। অধস্তন আদালতে রায়ের ১৫ মাসের মধ্যে হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষে এ রায় হলো।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ ইমাম হোসেন তারেক ও সৈয়দ ইজাজ কবির। আসামিপক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবী হাফিজুর রহমান খান। রায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। রায়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন শিশু আছিয়ার মা আয়েশা বেগম ও এলাকাবাসী। তারা দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, ‘হাইকোর্ট এ হত্যার ঘটনাকে নির্মম ও বর্বরোচিত উল্লেখ করেছে। সংশ্লিষ্ট আইনে কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি, যাতে আসামি হিটু শেখ অনুকম্পা পেতে পারে।’ ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘আদালতের কনসার্নের জায়গাটা ছিল যে, ‘মিডিয়া ট্রায়াল’র মাধ্যমে মানসপটে এক ধরনের ন্যারেটিভ তৈরি করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তা বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। আদালত বলেছে, আমাদের সবাইকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কেউ যেন মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার না হন।’

আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হাফিজুর রহমান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্টেট ডিফেন্স হিসেবে যতটুকু দায়িত্ব ছিল, ততটুকু চেষ্টা করেছি। আদালত উভয়পক্ষকে শুনে ফাইন্ডিংস দিয়েছে। আসামি চাইলে হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করতে পারবেন।’

গতকাল হাইকোর্টের রায়ের পর মাগুরার শ্রীপুরের জারিয়া গ্রামের বাড়িতে আছিয়ার মা আয়েশা বেগম গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, ‘আদালতের রায়ে আমি খুশি। আমি চাই রায় দ্রুত কার্যকর করা হোক।’ তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী (আছিয়ার বাবা) খুবই অসুস্থ, আমরা অসহায়। পরিবার নিয়ে যেন ভবিষ্যতে স্বস্তিতে বাঁচতে পারি, সে জন্য সরকারের সহযোগিতা আশা করি।’

ঘটনাটি যেভাবে দেশকে নাড়িয়ে দেয় : মামলার অভিযোগ ও সাক্ষীদের বক্তব্য থেকে জানা গেছে, গেল বছরের ১ মার্চ মাগুরায় বোনের বাড়ি বেড়াতে যায় তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আছিয়া। ৬ মার্চ ভোরে শহরের নিজনান্দুয়ালী এলাকায় ধর্ষণের শিকার হয় সে। প্রথমে মাগুরা সদর হাসপাতালে, এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। ৮ মার্চ তাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসাপাতালের (সিএমএইচ) প্যাডিয়াট্রিক আইসিইউতে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তার শরীরে অসংখ্য নির্যাতনের ক্ষত ছিল। গণমাধ্যমে এ শিশুর বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাকে সুস্থ করে তুলতে তখনকার অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকায় শিশুটির শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল না। জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে থাকা শিশুটির জন্য কয়েক দিন পথে নেমেছিল ছাত্র, শিক্ষক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লাখো মানুষ। অপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচারের দাবিতে মুখর হয় সারা দেশ। ১৩ মার্চ দুপুর ১টার পর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, মাগুরায় নির্যাতিত শিশুটি মারা গেছে। ওই দিনই সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টারে করে শিশুটির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় মাগুরায় তার নিজ গ্রামে। সেখানে দুই দফা জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়।

এ ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র আন্দোলন ও বিক্ষোভের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করে। এতে ধর্ষণের মামলায় তদন্তের সময় ৩০ থেকে কমিয়ে ১৫ দিন এবং অভিযোগ গঠনের পর বিচার শেষ করতে ৯০ দিন সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি উপযুক্ত ক্ষেত্রে ডিএনএ প্রতিবেদন ছাড়া চিকিৎসা সনদের ভিত্তিতে এবং পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বিচারক মামলার বিচারকাজ চালাতে পারবেন এমন বিধান রাখা হয়।

বিচার প্রক্রিয়া : শিশুটির মা ৮ মার্চ মাগুরা সদর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। পরে মামলাটি ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় রূপান্তরিত হয়। মামলায় শিশুটির বড় বোনের শ্বশুর হিটু শেখ, শাশুড়ি জাহিদা বেগম, বড় বোনের স্বামী সজীব শেখ ও ভাশুর রাতুল শেখকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ঘটনার পর ১৫ মার্চ আদালতে দোষ স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন প্রধান আসামি হিটু। ৩৭ দিন তদন্ত শেষে গত বছরের ১৩ এপ্রিল আদালতে অভিযোগপত্র দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মাগুরা সদর থানার পরিদর্শক মো. আলাউদ্দিন। ওই বছরের ২৩ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচারকাজ শুরুর আদেশ হয়। ২৭ এপ্রিল সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর পর রাষ্ট্রপক্ষে ২৯ সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। ১৭ মে অধস্তন আদালতের রায়ের পর মামলাটি হাইকোর্টে যায়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত