বড় সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৭ এএম

পাল্টাপাল্টি হামলায় ফের রণক্ষেত্র হয়ে উঠেছে উপসাগরীয় অঞ্চল। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে পশ্চিম এশিয়ায় তাদের সামরিক স্থাপনায় ইরানের হামলা নতুন করে বড় সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। হরমুজগান প্রদেশে ওয়াশিংটনের সামরিক হামলায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠান লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। হামলায় চার বছর বয়সী এক শিশুসহ অন্তত ৫ জন নিহত এবং ৬৩ জন আহত হয়েছেন। জর্ডান, কুয়েত, বাহরাইন ও ইরাকে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে একঝাঁক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালিয়ে কড়া জবাব দিয়েছে তেহরান।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, গতকাল বুধবার কুহেস্তাক শহরের একটি আবাসিক ভবনে বিয়ের অনুষ্ঠান চলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের স্পিøন্টার এসে আঘাত হানলে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। সিরিক কাউন্টির গভর্নর রেজা শহিদিয়ান রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম আইআরআইবিকে বলেন, হামলায় আহতদের মিনাব শহরের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাদের অবস্থা ‘স্থিতিশীল’ বলে জানান তিনি। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট ও রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমের তথ্যমতে চাবাহার, কোনারক এবং জিরোফটের বেসামরিক বিমানবন্দরেও বিকট বিস্ফোরণ শোনা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্য জাহাজে হামলার চেষ্টার জবাব হিসেবে তারা ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর (আইআরজিসি) ঘাঁটিগুলোতে সুনির্দিষ্ট আক্রমণ চালিয়েছে। তবে বেসামরিক লোকজনকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী লক্ষ্যবস্তু বানায়নি বলে দাবি করেন নৌবাহিনীর মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স। জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তারা ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তের পর ১০টি ধ্বংস করেছে। এ ছাড়া কুয়েত এবং বাহরাইনে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনাগুলোতেও পরপর একাধিক বিস্ফোরণ ঘটে। কুয়েতের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হতে দেখা গেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, জর্ডানে হামলায় কয়েকটি ড্রোন ধ্বংস হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন ফ্লাইট ও কারিগরি কর্মী নিহতের দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে কারিগরি অবকাঠামোর কয়েকটি অংশে অগ্নিকাণ্ডের দাবিও করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

ইরানকে গোপনে সাহায্য করেছে রাশিয়া : উপসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন করা যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী এবং অন্যান্য যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে ইরানকে গোপনে ‘সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র’ তৈরিতে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে রাশিয়া। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। ‘সি-৩৪০এল’ কোড নামের এই অত্যন্ত গোপন সামরিক প্রকল্পটি ২০২৩ সালে শুরু হয়েছিল এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধের পুরো সময়েই এটি সক্রিয় ছিল। এর মূল লক্ষ্য হলো ইরানকে একটি বিশেষ ‘র‌্যামজেট প্রপালশন সিস্টেম’ তৈরি করতে সাহায্য করা। এই বিশেষ ইঞ্জিনটি যেকোনো ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রকে শব্দের চেয়ে দ্রুত গতিতে (সুপারসনিক) উড়তে সাহায্য করে।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে মস্কো থেকে তেহরানে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তরের সিদ্ধান্তটি অবশ্যই ক্রেমলিনের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সর্বোচ্চ স্তর প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সরাসরি অনুমতি সাপেক্ষেই নেওয়া হয়েছে। সিআইএর সাবেক সামরিক বিশ্লেষক জিম ল্যামসন বলেন, ইরানিদের জন্য এটি একটি সম্পূর্ণ নতুন কৌশলগত অস্ত্র ব্যবস্থা তৈরি করবে, যা ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জাহাজগুলোর জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফ্যাবিয়ান হিনৎস বলেন, এটি রাশিয়ার কাছ থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি সামরিক প্রযুক্তির স্থানান্তর, যা ইরানিরা গত কয়েক দশক ধরে পাওয়ার চেষ্টা করছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে প্রতিহত করা বা গুলি করে নামানো অত্যন্ত কঠিন। কারণ এগুলো রাডারের চোখ ফাঁকি দিতে অত্যন্ত নিচু দিয়ে (সমুদ্রপৃষ্ঠ ঘেঁষে) উড়ে যায় এবং এগুলোর গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ২ হাজার ২০০ মাইল পর্যন্ত হতে পারে। যদিও ইরান ইতিমধ্যে এই ‘র‌্যামজেট প্রপালশন’ ইঞ্জিনটির সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে, তবে এটি এখনো সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করা হয়েছে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘রোসোবোরন এক্সপোর্ট’ এই প্রকল্পের সমন্বয় করেছে। তারা রাশিয়ার রকেট প্রস্তুতকারক কোম্পানি ‘এনপিও মাশিনোস্ট্রয়েনিয়া’র সঙ্গে যৌথভাবে এই প্রকল্প পরিচালনা করেছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত