গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের তাড়ানোই ‘একমাত্র সমাধান’

গাজা উপত্যকাকে পুরোপুরি ফিলিস্তিনিমুক্ত বা জনশূন্য করা ছাড়া সেখানে কোনো প্রকৃত সমাধান নেই—এমনটাই মনে করেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ।

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫০ এএম

গাজা স্ট্রিপ বা গাজা উপত্যকা থেকে ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ইসরায়েল এখনো বজায় রেখেছে বলে স্বীকার করেছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ। তিনি জানান, মানবাধিকার সংগঠনগুলো যে পরিকল্পনাকে ‘জাতিগত নিধন’ বা জাতিগতভাবে এলাকা খালি করা হিসেবে বর্ণনা করছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সেটি বাতিল করেনি, বরং আপাতত স্থগিত রেখেছে। খবর আলজাজিরার।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াইনেট’ আয়োজিত এক সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কাটজ বলেন, গাজা খালি করাকেই কিছু ইসরায়েলি কর্মকর্তা কৌশলগতভাবে ফিলিস্তিনিদের ‘স্বেচ্ছায় অভিবাসন’ বা ‘স্থানান্তর’ বলে ব্যাখ্যা করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এটাই গাজা সমস্যার একমাত্র সমাধান। ইসরায়েলি পত্রিকা ‘টাইমস অব ইসরায়েল’-এর বরাতে কাটজ বলেন, “দিনশেষে, ফিলিস্তিনিদের সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া ছাড়া গাজার জন্য আর কোনো বাস্তব সমাধান নেই।”

ফিলিস্তিনি মানবাধিকারকর্মীরা গত তিন বছর ধরে বলে আসছেন যে, গাজায় ইসরায়েলের এই বিধ্বংসী যুদ্ধ ও হামলার মূল লক্ষ্যই হলো ফিলিস্তিনি অঞ্চলটিকে পুরোপুরি ফিলিস্তিনিমুক্ত করা। ইসরায়েলের কিছু চরমপন্থী ডানপন্থী কর্মকর্তা এর আগেও প্রকাশ্যে গাজা জনশূন্য করার আহ্বান জানিয়েছেন। এমনকি ট্রাম্পও তাঁর মেয়াদের শুরুর দিকে এই ধারণাকে সমর্থন করে বলেছিলেন, ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানা নেবে।

তবে ওয়াশিংটনের মিত্র দেশগুলোসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে। পরবর্তীতে ট্রাম্প একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির মধ্যস্থতা করেন, যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছিল যে ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমিতে থাকার অধিকার রয়েছে। ওই ১২ পয়েন্টের চুক্তিতে উল্লেখ ছিল, ‘কাউকে জোর করে গাজা ছাড়তে বাধ্য করা হবে না। যারা যেতে চান তারা যেতে পারবেন এবং পুনরায় ফিরে আসার স্বাধীনতাও পাবেন। আমরা মানুষকে সেখানে থাকতে উৎসাহিত করব এবং একটি সুন্দর গাজা গড়ার সুযোগ দেব।’

কিন্তু ২০২৫ সালের অক্টোবরে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেও ইসরায়েল গাজায় ত্রাণসহায়তা প্রবেশে বাধা দিয়ে আসছে। তারা এলাকাটির পুনর্নির্মাণ ভেস্তে দেওয়ার পাশাপাশি প্রায় প্রতিদিনই ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা অব্যাহত রেখেছে।

সম্মেলনে কাটজ স্পষ্ট জানান, সমুদ্র, আকাশ বা যেকোনো উপায়ে গাজা খালি করতে ইসরায়েল প্রস্তুত। কিন্তু গাজার সীমান্তবর্তী দেশ মিসর ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের নিজেদের দেশে আশ্রয় দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের আশ্রয় দিতে পারে এমন অন্যান্য দেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন প্রয়োজন। তবে ওয়াশিংটন এই পরিকল্পনা পুরোপুরি ফেলে দেয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ট্রাম্প এই পরিকল্পনা বাতিল করেননি, কেবল স্থগিত করে রেখেছেন।’

কাটজ জানান, এই পরিকল্পনা নিয়ে সব সময়ই আলোচনা চলছে। তিনি যোগ করেন, ‘আমি মনে করি সবার ভালোর জন্যই শেষ পর্যন্ত অন্য কোনো পথ থাকবে না। তবে তা বাস্তবায়নে আমাদের যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজন এবং সেই সময়টি আসবে।’

গত তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রায় ২৫ বিলিয়ন (২,৫০০ কোটি) ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে। পাশাপাশি গাজায় মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত করা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইসরায়েলকে রক্ষা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

চলতি বছরের জুলাই মাসে ট্রাম্প হামাসকে নিরস্ত্র করার একটি চুক্তির কথা ঘোষণা করেছিলেন। সেই মার্কিন সমর্থিত প্রক্রিয়ায় ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং হামলা বন্ধের কথা ছিল। তবে ইসরায়েল প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়ে দেয়, গাজা পুরোপুরি অসামরিকীকৃত না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনো ছাড় দেবে না।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই চরমপন্থী বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মার্কিন সেনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন। তিনি এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির আরেক সেনেটর জেফ মার্কলি গত বছর গাজা-মিসর সীমান্ত পরিদর্শনের পর সতর্ক করেছিলেন যে, ইসরায়েল গাজায় জাতিগত নিধনের পরিকল্পনা করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্যান হোলেন লেখেন, ‘এখন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিজেই নিশ্চিত করলেন যে ওটাই তাদের মূল লক্ষ্য ছিল। এই অপরাধে আমাদের সহযোগী হওয়া এখন বন্ধ করতে হবে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত