টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। নজরুলের মন খারাপ। মন খারাপের কারণ অবশ্য একটা না, দুটো। প্রথম কারণ এমন বৃষ্টিতে তাদের দোকানে কেউ আসবে না। রুটি বানানো হয়ে গেছে অনেকগুলো। খরিদ্দার না এলে এত রুটির হবেটা কী? দ্বিতীয় কারণ, এ রকম বৃষ্টিতে পানিতে ঝাঁপাতে পারলে খুব মজা। অথচ নজরুলকে বসে থাকতে হচ্ছে রুটির দোকানে।
এবার ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হলো। দোকানের এক পাশটা টিনের চালা। কী যে মজার শব্দ হচ্ছে! নজরুল সেই শব্দ শুনে ছড়া কাটতে শুরু করল বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদেয় এলো বান...
এরই মধ্যে হামহুম করে এক লোক ছাতা মাথায় দিয়ে ঢুকল দোকানে। ঢুকতেই ছাতাটা বুজিয়ে দিয়ে চারপাশে তাকিয়ে একেবারে বিরক্তি নিয়ে বলল, এহ! সব দেখি পানিতে ভিজে গেছে!
নজরুলের তো খুব ফাজলামি করা স্বভাব। বলল, পানিই পড়ছে যখন, তখন পানিতেই ভিজবে। শরবত পড়লে না হয় শরবতে ভিজত!
‘বটে! এইটুকুন বয়েস... খুব মুখছোটা দেখছি। তা নাম কী?’
‘আজ্ঞে আজকে আমার নাম বাদল দে। কাল সূর্য উঠলে নাম হবে তপন কর।’
‘মুখটা এবার বন্ধ রাখ তো ছোকরা। রুটি আছে নাকি ওই মুখের মতোই ঠনঠন?’
‘আছে তো। আপনি বসুন না আগে।’
লোকটা কোথায় বসবে তাই ভাবছে। দুপাশ থেকে বৃষ্টির ছাঁট এসে বসার বেঞ্চগুলো ভিজিয়ে দিয়েছে কিছুটা। এর মধ্যে কোনার দিকে দুটো জায়গা এখনো শুকনো।
একটাতে আবার পেটের ভেতর মাথা গুঁজে শুয়ে আছে এক বিড়ালছানা। বৃষ্টি শুরু হতে না হতেই কোথা থেকে ছুটে এসেছে। বেশ আরাম করে ঘুমিয়েছে। লোকটা সেদিকেই এগিয়ে গেল। আর তারপরই করল সেই ভয়ংকর কাজ। তার ছাতাটা দিয়ে সপাং করে মারল বিড়ালের গায়ে। বলে উঠল, অ্যাহ! মানুষ বসার জায়গা নেই, লাটসাহেব এখানে ঘুমুচ্ছে!
আচানক এমন আঘাতে বিড়ালছানাটা লাফিয়ে উঠল। খুবই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল লোকটার দিকে। লোকটা আবার ছাতা দিয়ে বিড়ালটাকে গুঁতো দিয়ে বলল, কী দেখছিস কী? যা ভাগ!
বলেই মারার জন্য ছাতাটা যেই তুলেছে, অমনি নজরুল ধরে ফেলল ছাতার মাথা।
লোকটা বলল, ওই কী রে?
‘আপনি ওকে মারলেন কেন?’
‘কাকে?’
‘ওই ছানাটাকে?’
‘তোর বিড়াল নাকি?’
‘না তো। ও, কারো বিড়ালছানা না হলেই মারা যায় বুঝি?’
‘সে কি? আমি বসব না?’
‘আপনার বসার জায়গা তো রয়েছেই। তারপরও ওকে ছাতা দিয়ে মেরে গুঁতিয়ে তাড়াচ্ছেন কেন?’
‘একশবার তাড়াব। তাতে কী হয়েছে?’
‘আপনি ঘুমিয়ে থাকলে আপনাকে এভাবে মেরে তাড়ালে কেমন লাগবে?’
‘বটে! এত বড় কথা! রুটির দোকানের ছেলে হয়ে একেবারে মুখে মুখে তক্ক করছিস? যা, রুটি নিয়ে আয়...’
‘আপনার কাছে রুটি বেচব না।’
‘কী?’
‘আপনার কাছে রুটি বেচব না। যান। আপনার আর ঠাঁই নাই দোকানে।’
‘আরে, তাড়িয়ে দিচ্ছিস নাকি?’
‘দিচ্ছি তো। যে মানুষ অবোধ পশুকে ভালোবাসে না, তার সঙ্গে কোনো
বেচাবিক্রি নেই!’
‘এই, কে আছিস, দোকানের মালিক কে রে? খদ্দেরকে তাড়িয়ে দেয়...’
মালিক এলো তখনই। সবটা সে দেখেছে চুলার পাড় থেকে।
আরেকটু এগিয়ে এসে বলল, ‘এখনো সুযোগ আছে, পালিয়ে যান। ও নজরুল, কোথাও অন্যায় হচ্ছে দেখলেই রুখে দাঁড়ায়। আপনার ছাতা কেড়ে আপনার দশা বিড়ালটার মতো যে করেনি, সে অনেক ভাগ্য, তাড়াতাড়ি পালান...’
লোকটা উপায় না দেখে সত্যি সত্যিই পালালো।
নজরুল হেসে বলল, ‘আজ আর খরিদ্দার আসবে বলে মনে হয় না। নদীতে একটু সাঁতার কেটে আসি?’
মালিক মুচকি হেসে বলল, ‘যা!’