কলেরার টিকা শক্তিশালী অস্ত্র, কিন্তু একমাত্র সমাধান নয়

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৯ এএম

কর্নেল (অব.) নাজমুল হুদা খান

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল

কলেরা মানবসভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ সংক্রামক রোগ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, ওরস্যালাইন এবং টিকাদানের কারণে কলেরাকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু রোগটি এখনো নির্মূল হয়নি। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন, নিরাপদ পানির সংকট, বন্যা ও দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে কলেরা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে কলেরার পুনঃপুনঃ প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। আর কলেরা প্রতিরোধে ভ্যাকসিনের মাঠপর্যায়ের গবেষণার ইতিহাসেও বাংলাদেশের রয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

কলেরার জীবাণু ও রোগের স্বরূপ

কলেরা হলো ঠরনৎরড় পযড়ষবৎধব নামের ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট একটি পানিবাহিত তীব্র ডায়রিয়াজনিত রোগ। কলেরার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শরীর থেকে দ্রুত ও ব্যাপক তরল এবং ইলেক্ট্রোলাইট হ্রাস। রোগীর প্রচুর পরিমাণে পানির মতো পাতলা পায়খানা, বমি, তীব্র তৃষ্ণা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, চোখ বসে যাওয়া, প্রস্রাব কমে যাওয়া, পেশিতে টান এবং রক্তচাপ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। গুরুতর অবস্থায় রোগী হাইপোভোলেমিক শকে এবং দ্রুত চিকিৎসা না পেলে মৃত্যু ঘটতে পারে।

তবে আশার কথা হলো, সময়মতো যথাযথ তরল ও ইলেক্ট্রোলাইট প্রতিস্থাপন করা গেলে অধিকাংশ রোগীকে সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব। ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন বা ওরস্যালাইন এবং গুরুতর ক্ষেত্রে শিরাপথে তরল দেওয়া চিকিৎসার মূল ভিত্তি। প্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক ও শিশুদের ক্ষেত্রে জিঙ্ক থেরাপিও ব্যবহৃত হতে পারে।

টিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ

কলেরা নিয়ন্ত্রণে শুধু আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। রোগের বিস্তার বন্ধ করতে প্রয়োজন সমন্বিত প্রতিরোধ  ব্যবস্থা। এর মধ্যে নিরাপদ পানি, উন্নত স্যানিটেশন, খাদ্যনিরাপত্তা, হাত ধোয়ার অভ্যাস, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, নজরদারি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী টিকাদান গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনগুলো সাধারণত মুখে খেতে হয় এবং দুই বা তিন ডোজের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। টিকা কলেরা প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য সুরক্ষা দিতে পারে এবং কোনো জনগোষ্ঠীর বড় অংশ টিকা গ্রহণ করলে পরোক্ষভাবেও রোগের বিস্তার কমতে পারে। শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয় ক্ষেত্রেই অন্তত দুই বছর ৮৫ শতাংশের বেশি সুরক্ষার তথ্য পাওয়া যায়। টিকা কখনোই নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের বিকল্প নয়।

দেশে কলেরা ভ্যাকসিন কর্মসূচি

কলেরা নিয়ন্ত্রণে ২২ আগস্ট ভ্যাকসিন কর্মসূচি শুরু হয়েছে। প্রথম ধাপে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ১৪টি উপজেলা ও থানার প্রায় ৫১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষকে দুই ডোজ মুখে খাওয়ার কলেরা টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কর্মসূচিটি আইসিডিডিআরবি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সহযোগিতায় পরিচালিত হচ্ছে। প্রথম ডোজ দেওয়ার সময়কাল ২২ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এবং দ্বিতীয় ডোজ ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৫ অক্টোবর ২০২৬ নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশের জন্য মোট ১ কোটি ৩৫ লাখ ডোজ কলেরা টিকা নিশ্চিত করা হয়েছে। কর্মসূচির লক্ষ্য হলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে আগে সুরক্ষা দেওয়া।

কারা টিকা পাবেন

কর্মসূচির আওতায় এক বছর বা তার বেশি বয়সী নাগরিকদের বিনামূল্যে ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। গর্ভবতী নারীরা এই নির্দিষ্ট কর্মসূচির আওতায় থাকছেন না। সুরক্ষার জন্য দুই ডোজ গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ। দুই ডোজ সম্পূর্ণ করার পর টিকার সুরক্ষা প্রায় তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তবে টিকা নেওয়ার পরও নিরাপদ পানি পান, স্যানিটেশন এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা অপরিহার্য।

কলেরা নির্মূলে করণীয়

কলেরা নিয়ন্ত্রণকে টেকসই করতে  প্রথমত, নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহর, বস্তি, উপকূলীয় অঞ্চল ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, উচ্চঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়ে টিকাদান অব্যাহত রাখতে হবে। চতুর্থত, রোগ নজরদারি শক্তিশালী করতে হবে। কোথায়, কখন রোগ বাড়ছে, কোন জনগোষ্ঠী বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এবং টিকাদানের পর রোগের প্রবণতা কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছেÑ এসব তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করা দরকার। পঞ্চমত, জনগণের আচরণগত পরিবর্তন নিশ্চিত করতে হবে। সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, নিরাপদ পানি পান, খাবার ভালোভাবে রান্না করা এবং অপরিষ্কার খাবার এড়িয়ে চলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ষষ্ঠত, প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রস্তুত রাখতে হবে। পর্যাপ্ত খাবার স্যালাইন, আইভি ফ্লুয়িড, প্রয়োজনীয় ওষুধ, পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী প্রস্তুত রাখতে হবে। রোগীর চিকিৎসা নয়, কলেরার বিরুদ্ধে লক্ষ্য হওয়া উচিত নিরাপদ পানি, উন্নত স্যানিটেশন ও কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা।

কারণ, টিকা শক্তিশালী অস্ত্র, কিন্তু একমাত্র সমাধান নয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত