মেছো বিড়াল বেচারা! বাঘের মতো একটুখানি দেখতে বলে এ প্রাণীর যেন দুঃখের শেষ নেই। বাঘ ভেবে মানুষ হত্যা করে করে এই প্রাণীকে করে তুলেছে বিপন্ন। অথচ মেছো বিড়াল পরিবেশ ও প্রকৃতির জন্য এক অতিপ্রয়োজনীয় অনন্য প্রাণী। খাদ্যশৃঙ্খলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে মেছো বিড়াল। কোথাও মেছো বিড়াল দেখা মানে সেখানে এখনো জলাশয় ও প্রাকৃতিক পরিবেশ টিকে আছে। তাই একে পরিবেশগত সংকেতকারী প্রাণীও বলা হয়। আর ‘মেছো বাঘ’ বলে আসলে কিছুই নেই এটা পুরোপুরি মানুষের বানানো। মেছো বিড়াল সংক্রান্ত ভুল ধারণাকে ভাঙতে এবং জনসচেতনতা বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন চুয়াডাঙ্গার মো. বখতিয়ার হামিদ বিপুল। মাত্র চার বছরেই তিনি ৪০টি মেছো বিড়াল উদ্ধার ও অবমুক্ত করেছেন।
বিড়াল-বাঘের ভ্রান্তি মোচন
দেখতে ছোটখাটো হলেও গায়ে ডোরা থাকার কারণে মেছো বিড়ালকে মেছো বাঘ বলে ভুল করেন অনেকে। মেছো বিড়ালের গায়ে চোঙা চোঙা টিকের মতো দাগ থাকে, যার ফলে একে ছোট চিতাবাঘের মতো দেখতে মনে হয়। কান থেকে কান পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা ৬-৮টি কালো দাগ এই প্রাণীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। গালের পাশে থাকে হলদে-সাদা দাগ। দেহে দুই স্তরের পশম রয়েছে একটি রুক্ষতা বজায় রাখে, অন্যটি সংরক্ষণশীল লোম হিসেবে শিকার ও চলাচলে সহায়তা করে। ডোরা কাটা দাগ ও ক্ষীপ্র গতির কারণে একে হিংস্র বাঘের সঙ্গে তুলনা করেন। এটি আসলে ভুল ধারণা। এটি মাছখেকো বিড়াল মাত্র।
মেছো বিড়াল উদ্ধারে বখতিয়ার
মেছো বিড়াল সুরক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে অসাধারণ কাজ করছেন চুয়াডাঙ্গা সদরের মো. বখতিয়ার হামিদ বিপুল। তিনি এ পর্যন্ত প্রায় ৪০টি মেছো বিড়াল উদ্ধার ও অবমুক্ত করার কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন। প্রায় ২০টির মতো মেছো বিড়াল তিনি নিজেই উদ্ধার করেছেন। উদ্ধারকারী স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে বেলগাছি, গাংনী, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, দর্শনা, জামজামি, আলমডাঙ্গা, দামুড়হুদা প্রভৃতি। ভার্চুয়ালি যোগাযোগের মাধ্যমে আটকা পড়া প্রায় ১২টি মেছো বিড়াল তিনি অবমুক্ত করেছেন। বলা যায়, তিনি মেছো বিড়ালের এক অকৃত্রিম বন্ধু।
যেভাবে শুরু
মেছো বিড়াল নিয়ে বখতিয়ারের প্রথম কাজ শুরু হয় চার বছর আগে, তার নিজ এলাকাতেই। বেলগাছির বকচর বিলের ধানক্ষেতের পাশে কৃষকরা একদিন একটি মেছো বিড়ালকে ঘুরে বেড়াতে দেখেন। কয়েক দিন পর সেই একই জায়গায় দেখা যায় তিনটি ছানাসহ মা মেছো বিড়ালকে। খাদ্যের চাহিদা মেটানোর জন্যই হয়তো লোকালয়ের আশপাশে বংশবিস্তারের নিরাপদ জায়গা হিসেবে জায়গাটি বেছে নিয়েছিল। কিন্তু গ্রামবাসীর চোখে তা ছিল আতঙ্কের। তাদের ভাষ্যমতে, ‘বাঘের মতো দেখতে এক প্রাণী বাচ্চা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।’ মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে চিন্তিত হয়ে প্রাণীটিকে পিটিয়ে মারার ব্যবস্থা নিতে থাকেন।
বখতিয়ার বিষয়টি জেনে সবার আগে প্রাণীটির কোনো ক্ষতি না করতে সবাইকে অনুরোধ করেন। তখনই তার মনে হলো, মানুষ মেছো বিড়াল সম্পর্কে কতটাই না অজ্ঞ! তারা জানেই না এই প্রাণী প্রকৃতির বন্ধু। এর কিছুদিন পরেই এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তিনি। এক প্রচণ্ড কালবৈশাখী ঝড়ের রাতে মা মেছো বিড়ালটি দুটি বাচ্চাকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে পারলেও একটি ছানা ফেলে রেখে যায়। ভেজা মাঠে কাঁপতে থাকা সেই অসহায় প্রাণীটিকে এক কৃষক খাঁচায় বন্দি করেন। খবর পেয়ে বখতিয়ার দেরি না করে সেটিকে উদ্ধার করে আনেন। অন্ধকার রাত, ঝড়ো হাওয়া আর অবিরাম বৃষ্টির মধ্যে ছোট্ট প্রাণীটির চোখে ভয় আর নির্ভরতার মিশ্র চাহনি তাকে নাড়া দিয়ে যায়।
রাত চারটার দিকে তিনি ছানাটিকে নিয়ে গিয়ে এমন একটি জায়গায় ছেড়ে আসেন, যেখানে মা মেছো বিড়াল থাকার সম্ভাবনা ছিল। পরদিন সকালে যখন তিনি সেখানে ফিরে যান, দেখেন বাচ্চাটি আর নেই। মা এসে তাকে নিয়ে গেছে। সেই মুহূর্তে বখতিয়ারের চোখ ভিজে ওঠে। এক মায়ের সঙ্গে তার হারিয়ে যাওয়া সন্তানের এই মিলনের ঘটনাটিই তার জীবনে এক অমূল্য শিক্ষা হিসেবে হৃদয়ে স্থান করে নিল। সেই ঘটনাটি স্মরণ করে বখতিয়ার বলেন, ‘সেই দিনের অভিজ্ঞতা আমার হৃদয়ে গভীর দাগ কেটেছে। প্রকৃতির প্রতি এক অদ্ভুত টান তৈরি হয়েছে। মনে হয়েছে, আমি যদি না এগোই, তবে হয়তো আরও কত মেছো বিড়াল অযথা মারা যাবে। সেই ভালোবাসাই আমাকে আজও পথ দেখায়।’
মেছো বিড়াল কেন লোকালয়ে
বখতিয়ার জানালেন প্রকৃতির সন্তান মেছো বিড়ালের লোকালয়ে বা লোকালয়ে উঠে আসার নেপথ্য কারণ। মেছো বিড়াল মূলত হাওর-বাঁওড় ও জলাভূমির আশপাশে থাকে। মাছ ও জলজ প্রাণী ধরে জীবনধারণ করে। এ ছাড়া ফসলি জমি, বিশেষ করে ধানক্ষেত, ভুট্টা, পাট ও ঘাসের জমির আইলেও বিচরণ করতে দেখা যায়। তবে প্রজনন মৌসুমে এরা লোকালয়ের আশপাশে অবস্থান নেয়। তখন জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় এরা খাদ্য সংকটে ভোগে। ফসলের ইঁদুর, ব্যাঙ, সাপ ও কাঁকড়াও খায়।
মেছো বিড়াল মানুষের শত্রু নয়
মেছো বিড়াল মানুষ দেখলেই আক্রমণ করে না। মানুষ দেখলে এদের তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া থাকে না কখনো ধীরে ধীরে সরে যায়, আবার কখনো চুপ করে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মেছো বিড়াল কাউকে তেড়ে এসে কামড় দিয়েছে এমন ঘটনা খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং মানুষ উল্টো লাঠি নিয়ে মেছো বিড়ালের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ইদানীং গণমাধ্যমে প্রচুর মেছো বিড়াল হত্যার খবর দেখা যায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বখতিয়ার বলেন, মেছো বিড়াল হত্যার প্রধান কারণ প্রাণীটি সম্পর্কে সঠিক তথ্য না জানা। অধিকাংশ মানুষই এটিকে এখনো বাঘ বা বাঘের কোনো প্রজাতি মনে করে। সেই সঙ্গে অতিউৎসাহী হয়েও মানুষজন মেছো বিড়াল হত্যা করে। এর প্রমাণ হলো, মেছো বিড়াল মেরেই ক্ষান্ত হয় না; মেরে গাছে ঝুলিয়ে রাখা, এমনকি ঘাড়ে করে তামাম এলাকা ঘুরিয়ে দেখানোর ঘটনাও সামাজিক মাধ্যমে দেখা যায়।
উদ্ধার-পরবর্তী কার্যক্রম
মেছো বিড়াল উদ্ধার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধার পরবর্তী কার্যক্রম। বখতিয়ার কেবল উদ্ধারই করেন না, আহত হলে চিকিৎসারও ব্যবস্থা করেন। আলমডাঙ্গার জামজামি থেকে আঘাতপ্রাপ্ত একটি মেছো বিড়ালের নিউরোলজিক্যাল সমস্যায় অভিজ্ঞ ভেটের নির্দেশনায় প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তিনি খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগে পাঠান। দুই বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত একটি মেছো বিড়ালের চোয়াল ও একটি চোখে আঘাত পায়। সেটিকেও অভিজ্ঞ ভেট দিয়ে চিকিৎসা করিয়ে কিছুটা স্বাভাবিক হলে তারপরে অবমুক্ত করেন।
প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি
বখতিয়ারের মতে, মেছো বিড়াল মারা পড়ছে মূলত ‘বাঘ’ ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়ার জন্য। মেছো বিড়ালকে বাঘ মনে করার মতো ভুল দূর করতে তিনি ও তার সহযাত্রীরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেন। এরই মধ্যে তারা স্কুল কার্যক্রম, গ্রামীণ হাটে-বাজারে পথসভা, মেছো বিড়ালের ছবি ও তথ্যসংবলিত বিলবোর্ড স্থাপন, গাড়িতে স্টিকার, পোস্টার ও লিফলেট বিতরণ এবং ইউনিয়ন ধরে ধরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাইকিংয়ের মাধ্যমে মেছো বিড়াল সম্পর্কে ভুল ধারণা দূরীকরণ ও সংরক্ষণের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি গড়ে তুলেছেন সংগঠনও। সম্প্রতি তার সংগঠন ‘পানকৌড়ি’ মেছো বিড়াল সংরক্ষণ ও গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগ এবং বন অধিদপ্তর ও আরণ্যক ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় কাজ করছে। গবেষণার অংশ হিসেবে ইন্টারভিউ সার্ভে ও ক্যামেরা ট্র্যাপিং চলছে। এর মাধ্যমে মেছো বিড়ালের জীবনধারা সম্পর্কে একটি ডাটাবেস তৈরি করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বখতিয়ারের মন খারাপ হয় যখন দেখেন সামান্য ভিউ বা রিচ পাওয়ার জন্য মেছো বিড়ালকে ‘মেছো বাঘ’ বলে প্রচার করা হয়। এ বিষয়ে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী ও গণমাধ্যমের আরও সচেতন হওয়া দরকার বলে মনে করেন।
তিনি মনে করেন, মেছো বিড়ালকে বাঁচাতে ব্যাপকহারে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, বিশেষত শুষ্ক মৌসুমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। জলাভূমি সংরক্ষণের পাশাপাশি ডাকটিকিট ও টাকায় ছবি দিয়ে যদি সঠিক নাম এবং পাঠ্যবইয়ে মেছো বিড়ালের ছবি ও তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা যেত, তাহলে কোমলমতি শিশুদের মনে ছোটবেলা থেকেই প্রাণীটির প্রতি ইতিবাচক ধারণা ও সংরক্ষণের মনোভাব সৃষ্টি হতো।