ওয়ান ইলেভেন কুশীলবদের দিকে পুলিশের চোখ

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৩৮ এএম

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ নামেই পরিচিত। তৎকালীন সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল অরাজনৈতিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সেই সরকারের অধীনে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়ন চেষ্টা করা হয়। তখন রাজনৈতিক নেতা, শীর্ষ শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন এবং তাদের কাছে থেকে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ওয়ান-ইলেভেনের নেপথ্যে থাকা কুশীলব ও তাদের সহযোগীদের আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।

ইতিমধ্যে মাস্টারমাইন্ড ও প্রভাবশালী ব্যক্তি অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে কয়েক দফা রিমান্ডে নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অনেক রাঘববোয়ালের নামও বলে দিয়েছেন। তথ্য পেয়ে তাদের প্রোফাইল তৈরির কাজ গুছিয়ে এনেছে গোয়েন্দারা। যারা দেশে আছে তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। আর যারা বিদেশে আছে তাদের অবস্থান নিশ্চিত হতে ইন্টারপোলের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। সরকারের হাইকমান্ডের গ্রিন সিগন্যাল পেলেই চিঠি পাঠাবে ইন্টারপোলে।   

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, ২০০৬ সালের শেষের দিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন এবং নির্বাচন বর্জনের মুখে সেনা হস্তক্ষেপের পরিবেশ তৈরি হয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। এর মাধ্যমে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আত্মপ্রকাশ ঘটে। পরবর্তী দুই বছরের শাসনের মূল কারিগর বা কুশীলব হিসেবে একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উঠে আসে। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় ছিল ‘দুর্নীতিবিরোধী অভিযান’র নামে দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদ ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ীদের ওপর নির্যাতন ও আর্থিক ব্ল্যাকমেইলিং। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার লক্ষ্যে কারারুদ্ধ করা হয়। শুধু দুই নেত্রীই নন, দুই দলের কেন্দ্রীয় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে যৌথ বাহিনী গ্রেপ্তার করে। তাদের ডিজিএফআই কার্যালয় ও টিএফআই সেলে নির্যাতন করা হয়। এমনকি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বাদ যাননি নির্যাতন থেকে।

ইন্টারপোলের দ্বারস্থ হচ্ছে পুলিশ : পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, যারা বিরাজনীতিকরণ নীতি ও ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলাকে তাত্ত্বিক ভিত্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, তাদের নিয়ে আমরা করছি। পরবর্তী সময়ে সরকার পরিবর্তনের পর এবং আইনগত পদক্ষেপের আতঙ্কে এদের বড় একটি অংশ দেশত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অপব্যবহারের দায়ে ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের বিচারের মুখোমুখি করার প্রক্রিয়া হিসেবে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চাওয়া হবে। ইতিমধ্যে কুশীলবদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সরকারের সিগন্যালের অপেক্ষায় আছি আমরা। ইতিমধ্যে আমরা ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ওই সময়ে হঠাৎ ক্ষমতাধর হয়ে ওঠা কয়েকজন উচ্চাকাক্সক্ষী সামরিক কর্মকর্তা এবং তাদের বেসামরিক সহযোগীর নিয়ন্ত্রণে দেশ পরিচালিত হয়েছে। সেই সময়ে শুদ্ধি অভিযানের নামে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা এবং ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারের নামে হয়রানি করা হয়। অবৈধভাবে অর্থ আদায়সহ কতিপয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা গুরুতর অভিযোগ আছে।

তলব করেও ফেরানো যায়নি ফজলুল বারীকে : আলোচিত প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও মানব পাচারের অভিযোগে পল্টন মডেল থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। পুলিশের গোপন একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময়ের সরকার প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন আমেরিকায়। তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদও আছেন ওই দেশে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও আলোচিত কুশীলব বিগ্রেডিয়ার জেনারেল জে. (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারী আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর দেশে আর ফেরেননি। তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডয়ায় অবস্থান করছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ সময়ে তিনি ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ দূতাবাসে সামরিক অ্যাটাশের চাকরি নিয়ে দেশত্যাগ করেছিলেন। পরে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে তাকে দেশে ফেরার নির্দেশ দিলেও তিনি আর আসেননি।

শিক্ষক পরিচয়ে পলায়ন ডিজিএফআইয়ের সাবেক ডিজির : আরেক আলোচিত ও বিতর্কিত সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা এটিএম আমিন বর্তমানে আছেন দুবাইয়ে। একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। এক-এগারোর সময়ে ডিজিএফআইয়ের পরিচালক ছিলেন। পরে তাকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তিনি একই পদে কর্মরত ছিলেন। অবসরের আগে আনসারের ডিজির দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। ২০০৯ সালের ১৭ মে সব আর্থিক সুবিধাসহ সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যান তিনি। পরে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচয়ে দেশত্যাগ করেন। এরপর আমিন আর দেশে ফেরেননি। ওই সময়ে ডিজিএফআইয়ের আরেক ক্ষমতাধর কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) সাঈদ জোয়ার্দার দুবাই-কানাডা যাওয়া-আসার মধ্যে আছেন।

তলবের কথা শুনেই দেশত্যাগ ফখরুদ্দীনের : পুলিশের ওই গোপন প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ফখরুদ্দীন আহমদ কিছুদিন দেশেই ছিলেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন দেশেই থাকবেন। প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব ছাড়ার পর তার নিরাপত্তাও দিয়েছিল সরকার। বসবাস করতেন সরকারের দেওয়া গুলশানের একটি বাড়িতে। কিন্তু ওই বছরের মে মাসে খবর রটে ফখরুদ্দীনকে সংসদীয় কমিটিতে তলব করা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ তদন্ত হবে। এরপরই তিনি পরিবার নিয়ে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটির নাগরিক হওয়ার সুবাধে বাড়ি কেনেন মেরিল্যান্ড স্টেটের পটোম্যাকে। সেখানে তার দুটি বাড়ির একটিতে তিনি পরিবার নিয়ে থাকেন। আর অন্য বাড়িতে থাকে তার মেয়ের পরিবার। দীর্ঘদিন থেকে তিনি সেখানে অবস্থান করলেও বাংলাদেশি কমিউনিটিকে তিনি এড়িয়ে চলছেন। মাঝেমধ্যে তাকে দেখা যায় নিউ ইয়র্কে।

যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্কিত সেনাপ্রধান : সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ অবসর নেন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের মাঝামাঝিতে। বিডিআর বিদ্রোহের সময় তিনি দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ওই সময় তার বিতর্কিত ভূমিকার কারণে বিডিআর বিদ্রোহে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা প্রাণ হারান বলে কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে। ওই বছরের ১৪ জুন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। প্রথমে ফ্লোরিডায় ছোট ভাই ও ছেলের কাছে থাকতেন। পরে তার ‘মালটিপল মাইলোনা’ ক্যানসার ধরা পড়ে। চিকিৎসার জন্য আগে ঘনঘন নিউ ইয়র্কে যাতায়াত করলেও এখন তিনি সেখানে যাচ্ছেন না। বর্তমানে ফ্লোরিডার পামবিচে বসবাস করছেন।

হদিস নেই দুদকের সাবেক মহাপরিচালকের : পুলিশের আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, কুশীলবদের মধ্যে অন্যতম লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী এক-এগারোর সরকারের সময়ে দুদকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ এবং একের পর এক মামলা করে আলোচনায় ছিল দুদক। পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার পালবদলের পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন হাসান মশহুদ। বাধ্য হয়ে ২০০৯ সালের ২ এপ্রিল পদত্যাগে বাধ্য হন তিনি। এরপর থেকেই লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা। জানা গেছে, এরপর কিছুদিন তিনি ঢাকার ডিওএইচএসের বাসাতেই ছিলেন। তবে এখন কোথায় আছেন তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই পুলিশের কাছে।

দেশে থাকা অভিযুক্তদের ওপরও নজরদারি : ওয়ান-ইলেভেনের সময় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ দেশেই অবস্থান করছেন। ইতিমধ্যে তাদের নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। ওই সময়ে সুবিধাভোগী যেসব সাবেক আমলা, বিতর্কিত গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী এখনো দেশে অবস্থান করছেন, তাদের ওপর সরকারের বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা কড়া নজরদারি রাখছে বলে জানান একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, নজরদারির মধ্যে পুলিশ ও কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাও আছেন। গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর কাছ থেকে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, তা গা শিউরে ওঠার মতো। তথ্যগুলো আমরা এখনো যাচাই-বাছাই করছি।

রেহাই পাওয়ার সুযোগই নেই : সুশীল সমাজ, মানবাধিকার কর্মী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন ধরেই ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে আসছে। আইন বিশ্লেষকদের মতে, অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করা এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরণের অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মামলা হতে পারে। নাম প্রকাশ না করে একজন অপরাধ বিশ্লেষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময় সংঘটিত কর্মকাণ্ডগুলো দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনে সরাসরি মানবাধিকার এবং সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও নিশ্চিত হয়েছে, রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তন বা কালক্ষেপণ, অসাংবিধানিক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং নাগরিকদের ওপর জবরদস্তিমূলক নির্যাতন চালানোর অপরাধ থেকে রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই। পুলিশের আন্তর্জাতিক শাখাকে দ্রুত কার্যকর করে ওয়ান-ইলেভেনের রূপকারদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা নিয়মিত আদালতে বিচার সম্পন্ন করতেই হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত