শিক্ষক সংকটে থমকে আছে রাবির চারুকলার পড়াশোনা

৭৮টি অনুমোদিত শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ২১ জন। শিক্ষক সংকটে আট ডিসিপ্লিনের পাঠদান ও পরীক্ষা ব্যাহত, বাড়ছে সেশনজটের চাপ।

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৯ পিএম

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) চারুকলা অনুষদের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা চার সেমিস্টারের মধ্যে একটি সেমিস্টারের পরীক্ষা এখনো দিতে পারেননি। প্রায় দেড় বছর ধরে ওই পরীক্ষার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। একই শিক্ষাবর্ষের অন্য অনেক বিভাগের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা শেষের দিকে পৌঁছালেও চারুকলার শিক্ষার্থীদের মাস্টার্স এখনো শেষ হয়নি।

অনুষদের আটটি ডিসিপ্লিনে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় পাঠদান, ব্যবহারিক কাজ ও পরীক্ষা—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, কিলন ও স্থায়ী প্রদর্শনী গ্যালারির সংকটও রয়েছে।

চারুকলার ভাস্কর্য ডিসিপ্লিনের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মুনিম শাহারিয়া বলেন, অন্যান্য অনেক বিভাগের তুলনায় তাদের শিক্ষাজীবন পিছিয়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের চারটি সেমিস্টারের মধ্যে একটি সেমিস্টারের পরীক্ষাই এখনো দিতে পারিনি। প্রায় দেড় বছর ধরে সেই পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করছি। একই শিক্ষাবর্ষের অন্য অনেক বিভাগের শিক্ষার্থীরা যেখানে পড়াশোনা শেষের দিকে, সেখানে আমাদের মাস্টার্স এখনো শেষ হয়নি।

চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী বলেন, সেশনজটের মূল কারণ শিক্ষক সংকট। আমাদের পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকলে চারুকলায় সেশনজট থাকার কথা নয়।

তিনি জানান, ব্যবহারিক ও সেশনাল কোর্সের পরীক্ষা নিয়মিত নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে শিক্ষক স্বল্পতার কারণে অনেক সময় পরীক্ষার কার্যক্রম দীর্ঘায়িত হয়।

চারুকলা অনুষদের আটটি ডিসিপ্লিনে বর্তমানে শিক্ষক রয়েছেন ২১ জন। এর মধ্যে চিত্রকলায় ৩ জন, প্রাচ্যকলায় ৩ জন, ছাপচিত্রে ২ জন, ভাস্কর্যে ৫ জন, মৃৎশিল্পে ১ জন, গ্রাফিক ডিজাইনে ২ জন, কারুশিল্পে ২ জন এবং শিল্পকলার ইতিহাসে ২ জন শিক্ষক রয়েছেন।

অন্যদিকে, অনুষদে অনুমোদিত শিক্ষক পদ রয়েছে ৭৮টি। অর্থাৎ ৫৭টি পদই শূন্য।

ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী বলেন, চারুকলা আগে একটি বিভাগ হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে এটি তিনটি বিভাগে আটটি ডিসিপ্লিন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি ডিসিপ্লিনের আলাদা কোড, কারিকুলাম, ক্লাস, পরীক্ষা, ফলাফল ও ডিগ্রি রয়েছে। তাই প্রতিটি ডিসিপ্লিনের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক প্রয়োজন।

তিনি বলেন, আমাদের ৭৮টি শিক্ষক পদের বিপরীতে বর্তমানে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ২১ জন। শিক্ষার্থীর অনুপাত বিবেচনায় প্রতিটি ডিসিপ্লিনে অন্তত ১৫ থেকে ১৮ জন শিক্ষক প্রয়োজন হলেও কোনো কোনো ডিসিপ্লিনে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র একজন বা দুজন।

ডিন জানান, চারুকলায় প্রথম অনার্স চালু হয় ১৯৯৪-৯৫ শিক্ষাবর্ষে। ২০০৯ সাল নাগাদ শিক্ষক সংখ্যা ৩৫ জনে পৌঁছালেও এরপর দীর্ঘ সময় তেমন নিয়োগ হয়নি। এর মধ্যে অনেকে অবসরে গেছেন এবং একজন শিক্ষক মৃত্যুবরণ করেছেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে চারজন নতুন শিক্ষক যোগ দেওয়ার পর বর্তমানে শিক্ষক সংখ্যা ২১ জনে দাঁড়িয়েছে।

চারুকলার মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. এ কে এম আরিফুল ইসলাম বলেন, তাঁদের বিভাগে দুটি ডিসিপ্লিন থাকলেও শিক্ষক সংকট অত্যন্ত প্রকট। বিশেষ করে মৃৎশিল্প ডিসিপ্লিনে বর্তমানে মাত্র একজন শিক্ষক রয়েছেন। তিনিও আগামী ডিসেম্বর মাসে অবসরে যাবেন।

তিনি বলেন, একজন শিক্ষক দিয়ে একটি ডিসিপ্লিন চালানো বাংলাদেশে সম্ভবত নজিরবিহীন ঘটনা। শিক্ষক সংকটের কারণে পাঠদান থেকে শুরু করে ব্যবহারিক কাজ–সব ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য দুটি আলাদা ডিসিপ্লিন হলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে একই বিভাগের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।

চারুকলার শিক্ষা কার্যক্রম মূলত ব্যবহারিকনির্ভর। ফলে প্রতিটি কোর্সে শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সময় দিয়ে কাজ বুঝিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু শিক্ষক স্বল্পতার কারণে একই শিক্ষককে একাধিক ব্যাচ ও একাধিক কোর্স সামলাতে হচ্ছে। এতে পাঠদান ও পরীক্ষার কার্যক্রমও দীর্ঘায়িত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

ব্যবহারিকভিত্তিক পড়াশোনার কারণে চারুকলার বিভিন্ন কোর্সে নানা ধরনের উপকরণ ও সরঞ্জাম প্রয়োজন হয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এসব উপকরণের বড় অংশই তাঁদের নিজেদের অর্থে কিনতে হয়।

মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষার্থী নিয়াজ মাহমুদ বলেন, আমাদের অধিকাংশ কোর্সই ব্যবহারিক। তাত্ত্বিক পড়াশোনার উপকরণ লাইব্রেরি বা ইন্টারনেট থেকে পাওয়া গেলেও ব্যবহারিক কাজের উপকরণ শিক্ষার্থীদেরই কিনতে হয়। একটি কোর্সেই অনেক সময় চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার খরচ তুলনামূলক কম হবে—এমন প্রত্যাশা নিয়েই শিক্ষার্থীরা ভর্তি হন। তাই পরীক্ষার প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো অন্তত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরবরাহ করার দাবি জানান তিনি।

মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম বলেন, কিছু ব্যবহারিক কোর্সে একজন শিক্ষার্থীর উপকরণ বাবদ ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসব উপকরণ দেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবেন।

ছাপচিত্র ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থী আসাদ সাদিক রাফি বলেন, শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংকটও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এর প্রভাব একাডেমিক কার্যক্রমে পড়ছে।

তিনি বলেন, আমাদের ছয়-সাতটি ব্যাচ চলমান, কিন্তু শ্রেণিকক্ষ আছে মাত্র তিনটি। ফলে একই সময়ে ক্লাস চললে অতিরিক্ত ভিড় ও শব্দ হয়, পাঠদান ব্যাহত হয়।

ছাপচিত্রের সরঞ্জাম সংকটের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য নতুন যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়নি। বর্তমানে থাকা যন্ত্রপাতির মধ্যে একটি পুরোনো এবং দুটি দান হিসেবে পাওয়া। অ্যাসিড, কেমিক্যাল ও বিভিন্ন সরঞ্জাম শিক্ষার্থীদের নিজেদের অর্থে কিনতে হয়। প্রয়োজনীয় অনেক প্লেট ও উপকরণ রাজশাহীতে পাওয়া যায় না। ফলে বাইরে থেকে বেশি দামে কিনতে হয়।

তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থীর বছরে শুধু প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনতেই প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। সব শিক্ষার্থীর আর্থিক সামর্থ্য এক নয়। ফলে এই ব্যয় অনেকের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়।

চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় কখনো কখনো খোলা জায়গাতেও ক্লাস নিতে হয়। একই শ্রেণিকক্ষ একাধিক ব্যাচকে ব্যবহার করতে হওয়ায় ব্যবহারিক ক্লাসের পরিবেশও ব্যাহত হয়।

নিয়াজ মাহমুদ বলেন, চারুকলায় জায়গা তুলনামূলক বড় হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রেণিকক্ষ পাওয়া যায় না। কখনো বাইরে ক্লাস করতে হয়, আবার শ্রেণিকক্ষের সংকটের কারণে কোনো কোনো ক্লাসও বন্ধ রাখতে হয়।

শিক্ষার্থীদের তৈরি শিল্পকর্ম প্রদর্শনের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় অনেক সময় শ্রেণিকক্ষকেই প্রদর্শনীর স্থান হিসেবে ব্যবহার করতে হয়।

মুনিম শাহারিয়া বলেন, আমরা শিল্পকর্ম তৈরি করি, কিন্তু সেগুলো প্রদর্শনের জন্য আমাদের নিজস্ব কোনো জায়গা নেই। গ্যালারির সংকটের কারণে নিয়মিত বার্ষিক প্রদর্শনী আয়োজন করা সম্ভব হয় না। একটি স্থায়ী প্রদর্শনী গ্যালারি চারুকলার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন।

মৃৎশিল্প ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীদের জন্য বড় অবকাঠামোগত সমস্যাগুলোর একটি কিলন বা চুল্লি। বিভাগে থাকা পুরোনো কিলনে মৃৎশিল্প পোড়ানোর ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা।

অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম বলেন, আমাদের পুরোনো কিলনে ফায়ারিংয়ের মান ভালো হয় না। কাঙ্ক্ষিত গ্লেজিং ফলাফলও পাওয়া যায় না। আধুনিক কিলনসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা দেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা আরও ভালো কাজ করতে পারবে।

তিনি জানান, শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সিরামিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপে গিয়ে ভালো করছে এবং প্রশংসা পাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে তাঁদের তৈরি পণ্য বাজারজাত করে আয়ের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জানান, বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অনুষদের সমস্যাগুলো সমাধানে আন্তরিক। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।

চলতি সংশোধিত বাজেটে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার উপকরণের জন্য প্রায় ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে বরাদ্দের অর্থ এখনো হাতে পাওয়া যায়নি। অর্থ দ্রুত ছাড়ের জন্য উপাচার্য সংশ্লিষ্ট বাজেট কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘চারুকলা অনুষদের সংকটগুলো আমরা চিহ্নিত করেছি। অবকাঠামোগত সংকট সমাধানে অনেক ক্ষেত্রে ইউজিসির বাজেটের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই সংকটগুলো ইউজিসির কাছে তুলে ধরে আগামী বাজেটে বিশেষ বিবেচনার জন্য আমরা চেষ্টা করব। এ বিষয়ে ইউজিসির সঙ্গে ইতোমধ্যে কথা বলেছি। শিক্ষক সংকটের ক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব অর্গানোগ্রামে অনুমোদিত পদ অনুযায়ী নিয়োগ দিতে পারব। আশা করছি, এক-দুই মাসের মধ্যে শিক্ষক সংকট অনেকটাই কমে আসবে। তবে অন্যান্য অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে।’

তিনি বলেন, পরীক্ষার সামগ্রী কেনার জন্য ১৫ লাখ টাকার একটি স্বল্পমেয়াদি বাজেট দেওয়া হয়েছে। তবে চারুকলার প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহে আরও বড় বাজেট প্রয়োজন। এ বিষয়েও ইউজিসির মাধ্যমে অনুমোদন নিয়ে কাজ করতে হবে।

উপাচার্য বলেন, ‘আমি নিজে চারুকলার শিক্ষার্থীদের উপকরণের সংকট দেখেছি। এটি একটি সৃজনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। শিক্ষার্থীরা আরও একটু সহায়তা পেলে তারা ভালোভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে।’

চারুকলা অনুষদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে শিক্ষক সংকটের বিষয়টি। ৭৮টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে মাত্র ২১ জন শিক্ষক দিয়ে আটটি ডিসিপ্লিনের পাঠদান, ব্যবহারিক শিক্ষা, পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে একদিকে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের দাবি, দ্রুত শূন্য পদগুলোতে শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, আধুনিক যন্ত্রপাতি, কিলন, স্থায়ী প্রদর্শনী গ্যালারি এবং ব্যবহারিক ও পরীক্ষার প্রয়োজনীয় উপকরণ নিশ্চিত করা হলে চারুকলার দীর্ঘদিনের সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত