সমকালীন ইসলামি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী আলেম ছিলেন ড. ইউসুফ আল-কারযাভি (রহ.)। ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি ফিলিস্তিনের মুক্তি, আরব বিশ্বের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং মুসলিম সমাজের সমকালীন বিষয়ে তিনি ছিলেন সরব। তার বই, বক্তৃতা ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান তাকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তোলে।
তিনি ১৯২৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মিসরের নীল নদের ব-দ্বীপ সাফত তুরাব গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সে সময় মিসর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল। তিনি পড়াশোনা করেন আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার চিন্তা ও ব্যক্তিত্ব গঠনে আল-আজহারের পাশাপাশি মুসলিম ব্রাদারহুডও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা হাসান আল-বান্নাকে তিনি নিজের আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক মনে করতেন। ইসলামের এমন একটি সামগ্রিক ধারণা তাকে প্রভাবিত করে, যেখানে ইসলাম ইবাদতের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার কারণে ১৯৪০-এর দশকে কারযাভিকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়। কারাগারে তিনি নির্যাতনের শিকার হন। তবে সেখানেও তিনি চরমপন্থি প্রবণতার বিরোধিতা করেন। পরবর্তী সময়ে সহিংসতা ও উগ্রতার কারণ নিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কিছু গ্রন্থ রচনা করেন। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত ‘ইসলামিক অ্যাওয়েকেনিং : বিটুইন রিজেকশন অ্যান্ড এক্সট্রিমিজম’ ছিল এ বিষয়ে তার উল্লেখযোগ্য একটি কাজ। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা এবং আইএসআইএলের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতারও তিনি নিন্দা জানান।
১৯৬১ সালে শিক্ষক হিসেবে কাতারে যান কারযাভি। মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্যদের ওপর নিপীড়ন থেকে দূরে থাকাও তার কাতারে যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল। সেখানে তিনি তৎকালীন আমির শেখ আহমদ বিন আলী আল-সানির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। পরে তিনি কাতারের নাগরিকত্ব লাভ করেন।
তিনি ১৯৭৩ সালে কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামি স্টাডিজ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিভাগীয় প্রধান হিসেবে যোগ দেন। কাতারে অবস্থানকালে কারযাভির লেখালেখি আরও বিস্তৃত হয়। তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সহজ ও সাবলীল ভাষা। তিনি প্রাচীন ইসলামি আইনগ্রন্থের তুলনামূলক দুর্বোধ্য ভাষা এড়িয়ে সাধারণ পাঠকের উপযোগী করে বিষয় উপস্থাপন করতেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন।
১৯৯৬ সালে আল-জাজিরা আরবি সম্প্রচার শুরু করলে কারযাভি (রহ.) চ্যানেলটির সঙ্গে যুক্ত হন। তার সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান ‘আশ শরিয়াহ ওয়াল হায়াহ’ অর্থাৎ ‘শরিয়াহ ও জীবন’, দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এক সময় অনুষ্ঠানটি কোটি কোটি দর্শক দেখতেন। ধর্মীয় বিধান, সমাজ, রাজনীতি, ফিলিস্তিন, গণতন্ত্র ও পরিবেশসহ নানা বিষয়ে তিনি ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতেন।
তার প্রভাব ক্রমেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর ফতোয়া অ্যান্ড রিসার্চ এবং ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মুসলিম স্কলার্স প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
২০১৮ সালে তিনি অবসরে যান। তিনি জীবনের শেষ দিনগুলো নিজের দীর্ঘ কর্মজীবনের রচনাসমগ্র একত্র করে ৫০ খণ্ডের একটি বিশ্বকোষ প্রস্তুতের কাজে ব্যয় করেন। ২০২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর কাতারে ৯৬ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
লেখক : ইসলামি গবেষক