ইতিহাসের সাক্ষী থাকল মিস ওয়ার্ল্ড ২০২৬-এর ওয়ার্ল্ড ডিজাইনার অ্যাওয়ার্ডের আন্তর্জাতিক র্যাম্প। হাজার হাজার ঝলমলে গাউনের ভিড়ে উগান্ডার প্রতিযোগী যখন হেঁটে এলেন, প্রেক্ষাগৃহে তখন এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা নেমে এলো। কোনো রূপকথা নয়, কোনো কাল্পনিক দৃশ্য নয় তার পরনে তখন স্পন্দিত হচ্ছিল এক মায়ের শরীরে নতুন প্রাণ সঞ্চারের গল্প। গাউনটির নাম ‘লেয়ার্স অব লাইফ’ (Layers of Life)।
ফ্যাশন মানেই শুধু সুন্দর পোশাক, নতুন নকশা কিংবা রঙের খেলা এ ধারণা এখন অনেকটাই বদলে গেছে। বর্তমান সময়ে পোশাকের মাধ্যমে মানুষ নিজের পরিচয়, সংস্কৃতি, অনুভূতি, প্রতিবাদ কিংবা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতাও তুলে ধরছেন। কখনো একটি পোশাক হয়ে উঠছে পরিবেশ সচেতনতার বার্তা, কখনো নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলছে। আবার কখনো ফ্যাশনের মধ্য দিয়েই উঠে আসছে একজন নারীর জীবনের গভীর ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।
মিস ওয়ার্ল্ড উগান্ডার এলি মুহোজার পরা বিশেষ গাউনের নাম ‘লেয়ার্স অব লাইফ’। নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে জীবনের গভীর গল্প। এই গাউনের নকশার অনুপ্রেরণা এসেছে সিজারিয়ান প্রসবের সময় একজন নারীর শরীরে অতিক্রম করা বিভিন্ন স্তর থেকে। বলা হচ্ছে, প্রসবের সময় সিজারিয়ান অপারেশনে শরীরের সাতটি স্তর অতিক্রম করার ধারণাকে পোশাকের নকশায় প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ভিন্ন রঙ, কাপড় ও লেয়ারের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে গাউনটি। এর নকশার পেছনে ডিজাইনার কিশা আবদুল্লাহর নিজের মাতৃত্বের অভিজ্ঞতাও অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। একটি গাউন। কিন্তু তার ভেতরে রয়েছে মাতৃত্ব, শরীর, যন্ত্রণা, সাহস এবং নতুন জীবনের গল্প।
পোশাক যখন গল্প বলে
সুন্দর গাউন তৈরি করার চেষ্টা করা হয়নি। বরং পোশাকের প্রতিটি স্তরের সঙ্গে একটি অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার সম্পর্ক তৈরি করা হয়েছে। একজন মা সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় যে শারীরিক ও মানসিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান, সেই বিষয়টিকে ফ্যাশনের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। এ কারণেই গাউনটি শুধু চোখে সুন্দর লাগার বিষয় নয়। এর পেছনের গল্পটিও মানুষের আগ্রহ তৈরি করেছে।
মিস ওয়ার্ল্ড উগান্ডার ওয়ার্ল্ড ডিজাইনার অ্যাওয়ার্ড গাউনটি অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে সন্তান জন্মদানের গল্প বলছে। কিশা আবদাল্লাহ দ্বারা ডিজাইন করা এই গাউনটি সিজারিয়ান সেকশন (সি-সেকশন) এর মাধ্যমে সন্তান জন্মদানকারী মায়েদের জীবনযাত্রা থেকে অনুপ্রাণিত। এর মারমেইড সিলুয়েট এবং স্তরীভূত বুনন থেকে শুরু করে এর ফলো টিউল পর্যন্ত, প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় সন্তান জন্মদানের যাত্রার বিভিন্ন পর্যায় এবং অনুভূতিকে তুলে ধরে। পিচ, সোনালি, কোরাল, লাল, মেরুন এবং বারগান্ডি রঙের ওমব্রে শেডগুলো লালন-পালন থেকে জন্ম পর্যন্ত যাত্রার প্রতীক, অন্যদিকে মুক্তা, কাচের পুঁতি এবং ক্রিস্টাল যোগ করে ডিজাইনটিতে গভীরতা যোগ করেছে। এটি শুধু ফ্যাশন নয়, বরং সি-সেকশনের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানকারী মায়েদের ত্যাগ, শক্তি এবং ভালোবাসার এক উদযাপন।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে শিল্প
গাউনটির নাম অত্যন্ত অর্থবহ। লেয়ার বলতে এখানে শুধু কাপড়ের স্তর বোঝানো হয়নি। এটি জীবনের বিভিন্ন স্তর, অভিজ্ঞতা এবং পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবেও দেখা যেতে পারে। সিজারিয়ান প্রসবের সময় একজন নারীর শরীরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্মের একটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সেই শারীরিক বাস্তবতাকে ফ্যাশন ডিজাইনের ধারণায় রূপ দেওয়া হয়েছে। গাউনের বিভিন্ন স্তর যেন একটি যাত্রার প্রতীক। একটি স্তরের পর আরেকটি স্তর। আর সেই যাত্রার শেষ প্রান্তে রয়েছে নতুন জীবনের আগমন।
নারীর শরীর নিয়ে নতুনভাবে কথা বলা
নারীর শরীরের পরিবর্তন, মাতৃত্বের অভিজ্ঞতা বা সন্তান জন্ম দেওয়ার বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম। এই ধরনের নকশা সেই আলোচনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করতে পারে। মাতৃত্ব শুধু পরিচয় নয়। নারীর জন্য গভীর শারীরিক ও মানসিক অভিজ্ঞতা। কেউ এই অভিজ্ঞতাকে আনন্দ হিসেবে দেখেন, কেউ কঠিন যাত্রা হিসেবে অনুভব করেন। কারও জন্য এটি দুটিরই মিশ্রণ। তাই মাতৃত্বের অভিজ্ঞতাকে নির্দিষ্ট ছবির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর নানা দিক নিয়ে কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণত প্রসূতিবিদ্যার বইয়ের পাতায় আটকে থাকা এই কঠিন অ্যানাটমিকে ফ্যাশনের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে আসায় মুগ্ধ চিকিৎসক মহলও। গাইনোকোলজিস্টদের মতে, এটি শুধু পোশাক নয়, বরং সি-সেকশন নিয়ে সমাজে থাকা নানাবিধ ভুল ধারণা ও ট্যাবু ভাঙার মতো একটি মাস্টারপিস।
চিকিৎসকদের ভাষায়, সি-সেকশন কোনোভাবেই জন্ম দেওয়ার ‘সহজ বিকল্প’ নয়। একটি বড়সড় ও অত্যন্ত জটিল সার্জারি। মা হওয়ার পথে নারীর শরীরের ওপর দিয়ে কতটা কঠিন ঝড় বইয়ে দেয়, তা এই গাউনটি না দেখলে হয়তো সাধারণ মানুষ কোনোদিন উপলব্ধি করতেই পারতেন না।
ফ্যাশন সমালোচকদের মতে, ‘লেয়ার্স অব লাইফ’ কেবল মিস ওয়ার্ল্ডের সেরা পোশাক বিভাগে নাম লেখানো একটি গাউন নয়, এটি কোটি কোটি মায়ের শারীরিক সংগ্রাম, নিঃশব্দ যন্ত্রণা এবং বিজয়ের এক জ্বলন্ত প্রতীক। ফ্যাশনের আলোকোজ্জ্বল মঞ্চ থেকে বেরিয়ে এসে পোশাকটি মানব শরীরের অসীম ক্ষমতা ও মাতৃত্বের প্রতি বিশ্ববাসীর শ্রদ্ধাকে এক নতুন মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।