অলস বিমানবন্দর মেলছে ডানা

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৫৭ এএম

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে তৎকালীন পাকিস্তান আমলে দেশের বিভিন্ন কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে ছোট-বড় অনেকগুলো বিমানবন্দর গড়ে উঠেছিল। সময়ের পরিক্রমায় এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে আটটি বিমানবন্দর অলস পড়ে আছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিমানবন্দরগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও অর্থের কারণে তা আর সম্ভব হয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়ে বিমানবন্দরগুলো সচল করার পরিকল্পনা নেয়।

এ নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করে বেবিচক। কিন্তু অর্থের বিষয়টি সামনে চলে এলে চিন্তার ভাঁজ পড়ে কর্তৃপক্ষের। তবে মাস দেড়েক আগে বিমানবন্দরের ‘ডানা উড়াতে’ বিদেশি বিনিয়োগের সুখবর পায় বেবিচক। চীন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত অলস বিমানবন্দগুলোতে দুই বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয় বেবিচকে। বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছে কর্তৃপক্ষ।

বেবিচক সূত্র জানায়, চীন ও আরব আমিরাত প্রথমে বাগেরহাটের খানজাহান আলী বিমানবন্দর প্রকল্পের কাজ শুরু করতে চায়। দুটি দেশের দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মূলত কাজ করার কথা চিঠিতে উল্লেখ করেছে। ৩০ বছর আগে এই বিমানবন্দরটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর মাটি ভরাট ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণের মতো প্রাথমিক কিছু কাজ ছাড়া তেমন কাজ হয়নি। একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। ইতিমধ্যে আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ পর্যটনের বিকাশ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে এই আটটি পরিত্যক্ত বিমানবন্দর পুনরায় চালুর ঘোষণা দেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বাস্তবে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের হাঁকডাকেই কেবল সীমাবদ্ধ রয়েছে এসব উদ্যোগ। মাঠপর্যায়ে হয়নি কাজের কোনো অগ্রগতি। প্রাথমিক ‘সম্ভাব্যতা যাচাই’ও হয়নি। সংস্কারের বাজেট, রানওয়ের স্থান নির্ধারণ, ভূমি অধিগ্রহণ, একনেক সভায় উপস্থাপন শেষে পাস করার বিষয়েও কোনো আলোচনা হয়নি।

বরিশাল বিমানবন্দর সম্ভবনাময় থাকার পরও সেটি বন্ধ রাখা হয়েছে। তাছাড়া বিমানবন্দরের অনেক স্থান বেদখলও হয়ে গেছে।

জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিত্যক্ত বিমানবন্দরগুলো পুনরায় চালুর চেষ্টা চলছে। বিদেশি বিনিয়োগ আসার পর বিমানবন্দরের সংস্কার কার্যক্রম চালু করতে পারব। এ নিয়ে একাধিক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে।

আসছে ২৪ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, খানহাজান আলী বিমানবন্দরটি নির্মাণে আগ্রহ দেখিয়েছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএমসি) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) আবুধাবিভিত্তিক বিনিয়োগ ও অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান ইকুইলাইন ফাইন্যান্স। এর মধ্যে ইকুইলাইন ফাইন্যান্স বিমানবন্দরটি নির্মাণের পাশাপাশি আরও কয়েকটি খাত মিলিয়ে দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব অলস বিমানবন্দরগুলো নির্মাণকাজও সম্পন্ন করবে। প্রস্তাবের আওতায় বিমানবন্দর চালুর জন্য অবকাঠামো ও আধুনিকায়নের বিষয়টিও রয়েছে।

বেবিচকের বোর্ড সভায় অনুমোদন : অলস বিমানবন্দরগুলো পুনরায় সচল করতে সম্প্রতি বেবিচকের বোর্ডসভায় সিদ্ধান্ত হয়। সভায় জানানো হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্মিত বিমানবন্দরগুলো বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় এগুলোর অবকাঠামো নষ্ট হচ্ছে। বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডোর আবু সাঈদ মেহবুব খান বলেন, ৮টি বিমানবন্দর সচলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাণিজ্যিক বিমান পরিচালনায় উপযোগী কি না সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে। পরে একটি প্রস্তাব বিমান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সেখানে অনুমোদন সাপেক্ষে সচলের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

দুটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের চিঠি : চলতি বছরের ৩০ জুলাই চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিএমসি ও বাংলাদেশের বেবিচক চেয়ারম্যানের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠায়। প্রস্তাবটি যাচাই-বাছাই চলছে। চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি রামপাল এলাকায় বিমানবন্দর প্রকল্প উন্নয়ন ও বাস্তবায়নে আগ্রহ প্রকাশ করে। চীনা প্রতিষ্ঠানটির বিবেচনায় খুলনা, বাগেরহাট ও মোংলার মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে বিমানবন্দরটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে মোংলা বন্দর, মোংলা ইপিজেড, রপ্তানিমুখী চিংড়ি শিল্প, সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়াতে বিমানবন্দরটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে কাজ করতে পারে। পর্যায়ক্রমে আরও কয়েকটি অলস বিমানবন্দরের কাজ করতেও আগ্রহী বলে জানায় সিএমসি। তাছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের ইকুইলাইন ফাইন্যান্সও একইভাবে আগ্রহ দেখিয়েছে।

তবে ইকুইলাইন ফাইন্যান্সের প্রস্তাবের মধ্যে বিমান ও পর্যটন খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ খাতে বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা আধুনিকায়নে অর্থায়নের আগ্রহ দেখায় প্রতিষ্ঠানটি। শুধু বিমানবন্দর নয়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য কার্গো উড়োজাহাজ ক্রয় এবং বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের অধীনে মিড-সাইজ হোটেল ও মোটেল নির্মাণের প্রস্তাবও রয়েছে। বিমানবন্দর অবকাঠামোর পাশাপাশি বিমান পরিবহন ও পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নেও বিনিয়োগ করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।

চালু হলে বদলে যাবে অর্থনীতি : বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটি আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক বিমানবন্দর পুনর্র্নির্মাণ ও পরিচালনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল প্রক্রিয়া। শুধু রানওয়ে মেরামত করলেই ফ্লাইট চালানো সম্ভব হয় না। এই জন্য প্রয়োজন হয় আধুনিক এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেম, আধুনিক রাডার ও নেভিগেশন প্রযুক্তি, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম, কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আধুনিক টার্মিনাল ভবন। পরিত্যক্ত বিমানবন্দরগুলো কেবল সাধারণ যাত্রীবাহী বিমান চলাচলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিদেশি সংস্থাগুলো এসব অঞ্চলকে বহুমুখী অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার মাস্টারপ্ল্যান করছে। চীন ও আরব আমিরাত ছাড়াও আরও কয়েকটি দেশ বিনিয়োগের আগ্রহ দেখাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, প্র্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে আঞ্চলিক অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়ার পাশাপাশি প্রতি বছর জিডিপিতে প্রায় ০.৩৫% থেকে ০.৫০% পর্যন্ত অতিরিক্ত অবদান রাখার সুযোগ সৃষ্টি হবে। ঢাকার বাইরে পণ্য আনা-নেওয়ায় পরিবহনের সময় ও খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। ২৫ থেকে ৩০ হাজার কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহে নতুন সম্ভবনা : তথ্যানুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ২৭ জানুয়ারি বাগেরহাটের রামপালের ফয়লা এলাকায় খানজাহান আলী বিমানবন্দরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। শুরুতে ৭৫ একর জমি অধিগ্রহণ ও সামান্য মাটি ভরাটের কাজ হলেও প্রকল্পটি আর এগোয়নি। পরে ২০১১ ও ২০১৮ সালে আরও ৫শ একরের বেশি জমি অধিগ্রহণ, সীমানা প্রাচীর ও আংশিক মাটি ভরাট করা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক টানাপড়েন, বিনিয়োগ জটিলতা ও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে তিন দশকেও পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর নির্মাণ হয়নি। দীর্ঘ এই অচলাবস্থার মধ্যে সম্প্রতি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহে প্রকল্পটি নিয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সম্প্রসারিত হচ্ছে অ্যাভিয়েশন খাত : সংশ্লিষ্টরা জানায়, সড়কপথে যানজটের বিড়ম্বনা এড়াতে আকাশপথে যাতায়াতের প্রবণতা বাড়ছে। ফলে অ্যাভিয়েশন খাত লাভজনক হয়ে উঠছে এবং সম্প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘদিন দেশের আটটি বিমানবন্দর অকেজো অবস্থায় আছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও এসব বিমানবন্দরের মধ্যে চারটির সংস্কারের পরিকল্পনা নেয়। কিন্তু হাঁকডাক পর্যন্তই ছিল সীমাবদ্ধ। শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ‘উদ্যোগ’ নেয় পরিত্যক্ত বিমানবন্দরগুলো নিয়ে। এই নিয়ে কয়েকদফা বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও কিছুই হয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আবারও আলোচনায় আসে অলস বিমানবন্দর নিয়ে।

যেসব অলস বিমানবন্দরে বিনিয়োগের পরিকল্পনা : দেশে অলস পড়ে থাকা বিমানবন্দরগুলো হলো ঈশ্বরদী, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, বগুড়া, শমশেরনগর (মৌলভীবাজার), কুমিল্লা, বাগেরহাট (খান জাহান আলী) ও পটুয়াখালী। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ঈশ্বরদী বিমানবন্দরে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছিল। ২০১৩ সালে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু করলেও পরের বছরই তা বন্ধ হয়ে যায়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে ঈশ্বরদী বিমানবন্দর ঘিরে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। শমশেরনগর বিমানবন্দর চালু হলে হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের মানুষদের সিলেট বিমানবন্দরে যেতে হবে না।  নেউরা-ঢুলিপাড়ার পাশে কুমিল্লা বিমানবন্দর ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ রুটে সচল ছিল। ১৯৯৪ সালে আবার ফ্লাইট চালু হলেও যাত্রীসংকটের কারণে বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৮০ সাল থেকে ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর অচল। আশির দশকের পর লালমনিরহাট বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল করেনি।

ভোগাবে দখলের জায়গা : বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিত্যক্ত বিমানবন্দরের জায়গা প্রভাবশালী মহল বা ব্যক্তি দখল করে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালাচ্ছে। কেউ কেউ বসতভিটা করে বসবাস করছে। সংশ্লিষ্টদের উচ্ছেদ করতে আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি। পরিত্যক্ত বিমানবন্দরগুলো দ্রুত সময়ে চালু করতে তোড়জোড় চলছে। বিদেশি বিনিয়োগ আসছে। তবে নির্মাণকাজ শুরু হলে ভোগাবে দখলের জায়গা নিয়ে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত