গঙ্গার পানি বণ্টনের বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার দিনটি এগিয়ে আসছে। একই সঙ্গে ভারতে নদীটির অববাহিকায় অবস্থিত বিহারসহ বিভিন্ন রাজ্য উদ্বেগ প্রকাশ করছে। সেখানকার রাজনৈতিক দলগুলো চুক্তিবিরোধী তৎপরতা বাড়াচ্ছে। উজানের দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীরাও এ বিষয়টিতে যুক্ত হচ্ছেন।
অন্যদিকে, বর্তমান চুক্তি হুবহু নবায়নের পরিবর্তে পর্যালোচনা এবং পানি প্রবাহের নিশ্চয়তার জন্য সুরক্ষা-ধারা ফেরানোর দাবি উঠছে বাংলাদেশে। সরকার অবশ্য জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রাখার ওপর জোর দিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনার কথা বলছে। তবে দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শুরু হয়নি। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ৩০ বছরের জন্য স্বাক্ষর হওয়া চুক্তিটির মেয়াদ আগামী ১১ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে।
স্থানীয় বিশ্লেষকরা মনে করেন, অভিন্ন নদীর পানি ভাগাভাগির মূল আলোচনা হবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে। তাই দেশটির স্থানীয় পর্যায়ের কে কী বলছে, তাতে বাংলাদেশ গুরুত্ব না দিলেও চলবে। তবে চুক্তির আলোচনায় উজানে পানি প্রত্যাহারের বিষয়গুলো হিসাবে আনতে হবে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত এ বিষয়ে বলেন, ‘বিহার উদ্বেগ জানানোর কে? আমাদের আলোচনা দিল্লির সঙ্গে। বিহারের সঙ্গে নয়।’ তিনি বলেন, ‘পানি তো নিয়ে যাচ্ছে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ। এখানে আমাদের চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ জানানোর কী আছে?’ বিষয়টি ‘রাজনৈতিক’ হওয়ায় তিনি এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে রাজি নন বলে জানান।
দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৯৬ সালে সই হওয়া গঙ্গার পানি বণ্টনচুক্তি অনুযায়ী গঙ্গায় পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত ফারাক্কা বাঁধে যে পানি আসে, তা দুই দেশের মধ্যে বণ্টন হওয়ার কথা। বর্ষা মৌসুমে পানির প্রবাহ এমনিতেই তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। তাই চুক্তিতে বর্ণিত ফর্মুলা অনুযায়ী প্রধানত প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ফারাক্কায় ও বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ ব্রিজে পানি পরিমাপ করা হয়।
কী হচ্ছে ভারতে : বিজেপির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোটের গুরুত্বপূর্ণ শরিক জনতা দল ইউনাইটেড (জেডিইউ) প্রকাশ্যে চুক্তির বিরোধিতা করেছে। দলটির দাবি, বর্তমান চুক্তি বিহারের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে নয়াদিল্লিতে বৈঠক করেছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ও জেডিইউ নেতারা। তারা গঙ্গা তীরবর্তী ১২টি জেলায় দাবির পক্ষে জনমত গঠনের কথা বলছেন। তাদের দাবি, বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করা হলেও ২০৫০ সাল পর্যন্ত বিহারের পানির প্রয়োজন বিবেচনায় রাখতে হবে।
জয়শঙ্কর বিষয়টি আমলে নিয়ে গত ২৮ আগস্ট জেডিইউর কেন্দ্রীয় সভাপতি সঞ্জয় কুমার ঝাকে এক চিঠি দেন। তিনি চিঠিতে বলেন, বিহারের উদ্বেগের বিষয়ে ভারতের জলশক্তি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে, যাতে চুক্তিটির বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করা যায়।
এর আগে ২০২৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে চিঠি দিয়ে বলেন, পশ্চিমবঙ্গকে বাদ দিয়ে তিস্তা বা গঙ্গার পানি নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত নয়।
আরেক অভিন্ন নদী তিস্তার পানি ভাগাভাগির জন্য ২০১১ সালে ৬ সেপ্টেম্বর চুক্তি সই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মমতার আপত্তির মুখে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তার ঢাকা সফরে চুক্তিটি সই করা থেকে বিরত থাকেন। দুই দেশের মধ্যে সরকারি পর্যায়ে টানা ১৫ বছর ভালো সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তার উত্তরসূরি বিজেপির নরেন্দ্র মোদির সরকারের সময়ও তিস্তা চুক্তি সই হয়নি।
গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর থেকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গঙ্গার পানি ভাগাভাগির জন্য নতুন চুক্তির আলোচনাকে সামনে রেখে চলমান টানাপড়েন তীব্রতর হওয়ার আশঙ্কা আছে। নতুন বাস্তবতায় চুক্তির আলোচনায় গতি আনতে তারা রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর ওপর জোর দিচ্ছেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, গঙ্গাচুক্তির বিষয়ে দুই দেশের যৌথ নদী কমিশন কাজ করছে।
দুই দেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। যৌথ নদী কমিশন এই অভিন্ন নদীর পানি ভাগাভাগিসহ বিভিন্ন বিষয় দেখভাল করে থাকে। কমিশন বাংলাদেশের ‘ঠিকঠাক’ পানি পাওয়ার দাবি করে থাকে। তবে গবেষকদের একটি অংশের দাবি, ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো ‘নিশ্চয়তার-ধারা’ (গ্যারান্টি ক্লজ) না থাকায় বাংলাদেশ প্রাপ্য পানি থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাদের অভিমত ভারতে উজানে বিভিন্ন রাজ্যে বাঁধ দিয়ে একতরফা পানি প্রত্যাহরের বিষয়গুলো ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশে কী হচ্ছে : যৌথ নদী কমিশনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তারা চুক্তি নবায়নের আলোচনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে কমিশন-পর্যায়ের আলোচনায় বিষয়টির সমাধান হবে না। সরকারের উচ্চপর্যায়ে যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তখন সমাধানের আলোচনা শুরু হতে পারে।
বিহারের এই উদ্বেগের বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হয়তো বাংলাদেশকে চাপে রাখতে এটি করা হচ্ছে।’
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. জিএম তারেকুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি যতটা না কারিগরি, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। ফলে এটি রাজনৈতিকভাবেই সমাধান হতে হবে।’
গঙ্গাসহ ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা এবং এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুসরণের দাবি জানিয়ে আসছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এ বিষয়ে বলেন, ভাটির দেশ হিসেবে নদীর পানিতে বাংলাদেশের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতে সুরক্ষা বা গ্যারান্টি ক্লজ যুক্ত করতে হবে। তিনি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায্যতা ও আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুসরণের মাধ্যমে সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের দাবি করেন।
পানি সম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বলেছেন, সরকার জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখে ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিটি নিয়ে পুনরায় আলোচনার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি এ আলোচনায় বাংলাদেশের মূল অবস্থান ও পানি প্রবাহের নিশ্চয়তা-সংক্রান্ত ধারা পুনর্বহালের ওপর জোর দেন।