হুমায়ুন কবির জানালেন

ভারতে ব্রিকস সম্মেলনে যাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১৩ এএম

আগামী শনি ও রবিবার (১২-১৩ সেপ্টেম্বর) ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওই সম্মেলনে সরকারের কোনো প্রতিনিধিও পাঠানো হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির এ কথা বলেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ওই আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী অংশ নিচ্ছেন না। কোনো প্রতিনিধিও পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে ভারতে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় সফর হতে পারে।

এবারের ব্রিকস সম্মেলনের আয়োজক ভারত। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়। তবে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এই আমন্ত্রণকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে শেষ পর্যন্ত ওই আমন্ত্রণে সরকারের সাড়া না দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হলো।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে বেশ তৎপর ছিলেন। এদেশে সরকারের নানা দপ্তরে একাধিক মন্ত্রীসহ কূটনৈতিক মহলে ত্রিবেদী এই বিষয়ে ভারত সরকারের আগ্রহ জানিয়ে নানা মন্তব্য করেন।

ভারতের প্রভাবশালী পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু’ গতকাল এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যত দ্রুত সম্ভব ভারত সফরে যেতে আগ্রহী, তবে তার আগে তিনি একটি সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা বা আলোচ্যসূচি চূড়ান্ত করতে চান।

বাংলাদেশের একটি কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, এ ধরনের একটি সফরের পর দেশে ফিরে ‘জনগণের সামনে তুলে ধরার মতো দৃশ্যমান কী অর্জন থাকবে’, তা নিয়ে ভাবছেন তারেক রহমান।

ওই কর্মকর্তা দ্য হিন্দুকে বলেছেন, ভারতের তরফ থেকে বহুপক্ষীয় ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি তা এড়িয়ে গেছেন। তার মানে এই নয় যে, তিনি ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও নিকটতম প্রতিবেশীকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান ও ত্যাগের কথা ঢাকা সবসময়ই স্বীকার করে।

সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য হিন্দুর ভাষ্য, আগামী নভেম্বর বা ডিসেম্বরের শুরুতে দ্বিপক্ষীয় সফরে দিল্লি যেতে পারেন তারেক রহমান, কারণ আগামী ডিসেম্বরেই গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই যত দ্রুত সম্ভব এটি নবায়ন করা দরকার।

বাংলাদেশের ওই কর্মকর্তা দ্য হিন্দুকে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে নিবিড় বৈঠকের মাধ্যমে এজেন্ডা চূড়ান্ত করা দরকার, যা এখনো শুরু হয়নি।

ঢাকা মনে করে, ৩০ বছর ধরে টিকে থাকা গঙ্গা চুক্তি একটি ‘অর্জন’ এবং এটি নবায়নের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে আটকে থাকা অন্য দিকগুলোতেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। ‘যেমন পুনরায় পুরোদমে ভিসা কার্যক্রম চালু করা, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আরোপিত বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, স্থলবন্দরগুলো দিয়ে আবার পুরোদমে বাণিজ্য শুরু করা এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক আবার আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে আনার মতো ক্ষেত্রগুলোতে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে,’ বলেন ওই কর্মকর্তা।

এ ছাড়া জ্বালানি সংকটে ভুগতে থাকা বাংলাদেশ এ খাতে ভারতের সহায়তাকেও ‘ইতিবাচক’ হিসেবে দেখবে বলে জানান তিনি।

এদিকে, গঙ্গা পানিচুক্তি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, আমাদের জাতীয় স্বার্থ যেখানেই জড়িত, সেখানেই আমরা গুরুত্বের সঙ্গে, দক্ষতার সঙ্গে কাজ করব।

প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যোগদান ও সান ফ্রান্সিসকো সফর নিয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ও সার্বিক বিষয়াবলি নিয়ে কাজ করছি।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সফরকারী দল রওনা হওয়ার আগেই আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে, তখন আপনারা বিস্তারিত জানতে পারবেন।

রোহিঙ্গা সংকট : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধান চায় বাংলাদেশ। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সীমান্ত পার করে মিয়ানমারে পাঠানোকে প্রত্যাবাসন হিসেবে দেখলে হবে না; তাদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার মতো পরিবেশও তৈরি করতে হবে।

তিনি বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি না হলে রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। ভেরিফিকেশনের নামে মিয়ানমার যাতে সময়ক্ষেপণ করতে না পারে, সে বিষয়েও বাংলাদেশ সতর্ক রয়েছে।

বাংলাদেশে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার অবস্থানের কারণে অর্থনীতি, পরিবেশ, জনসেবা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ মানবিক কারণে এই জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু সংকটটি বাংলাদেশ সৃষ্টি করেনি। তাই এর সমাধানের দায়িত্বও শুধু বাংলাদেশের নয়।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মানবিক সহায়তার পাশাপাশি সংকটের মূল কারণ সমাধানে কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, শুধু ত্রাণ ও অর্থায়নের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়; মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো এবং প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।

রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম বড় উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, এর সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্পৃক্ত করা হবে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের সভাপতিত্বের সুযোগও এ ক্ষেত্রে কাজে লাগানোর কথা জানান তিনি। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, আসিয়ানভুক্ত দেশসহ বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে সমন্বয় করে রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশের।

ফরেন সার্ভিস একাডেমির ওই সেমিনারে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম ও বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইজেন বক্তব্য দেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত