পিএসজির হ্যাটট্রিক শিরোপা মিশনের শুরুতে গোলোৎসব, ম্যাক অ্যালিস্টারের ক্ষোভ ঝরানো গোল আর ওডেগার্ডের জয়সূচক শট, উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের বুধবারের রাতে ইউরোপের শীর্ষ দলগুলো প্রমাণ করল কেন মহাদেশীয় এই লড়াইকে বলা হয় ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে উত্তেজনাকর অধ্যায়। পার্ক দে প্রিন্সেসে ফরাসি জায়ান্টদের দাপট থেকে অ্যানফিল্ডের স্নায়ুক্ষয়ী দ্বৈরথ কিংবা ইতালির মাটিতে নাপোলির রক্ষণ দুর্গ ভাঙার কঠিন পরীক্ষা, প্রতিটি ম্যাচেই ছিল ভিন্ন ঘরানার টানটান উত্তেজনা।
চ্যাম্পিয়নদের গোলোৎসব : ড্র, ড্র এবং হার। চ্যাম্পিয়নস লিগে নিজেদের শিরোপা ধরে রাখার মিশনে হাফ ডজন গোল দেওয়ার আগের তিন ম্যাচের পিএসজির সমীকরণ ছিল এটাই। হ্যাঁ, বড্ড বেমানানই বটে। তবে লিগ মৌসুমে বেশ ধুঁকতে থাকা ফরাসি জায়ান্টরা ইউরোপের মঞ্চে পা রাখতেই খুঁজে পেয়েছে তাদের চিরচেনা বিধ্বংসী রূপ। ঘরের মাঠে সেøাভান ব্রাতিসøাভার বিপক্ষে রীতিমতো গোলোৎসব করেছে লুইস এনরিকের দল। চলতি মৌসুমে নতুন যোগ দেওয়া ফেররান তোরেসের চোখ জুড়ানো হ্যাটট্রিক এবং উসমান দেম্বেলের দুর্দান্ত ২ গোল ও সমসংখ্যক অ্যাসিস্টে ৬-১ ব্যবধানের বিশাল জয় নিয়ে আসর শুরু করেছে পিএসজি। ম্যাচের শুরু থেকেই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলা করেছে দলটি, যা গ্যালারিতে থাকা দর্শকদের মনে করিয়ে দিয়েছে তাদের সেরা সময়ের কথা। তোরেস হ্যাটট্রিক করলেও প্রদর্শনীর মূলে ছিলেন দেম্বেলে। নিজে তো দুটো গোল করেছেনই, সঙ্গে তোরেসকেও করিয়েছেন দুটি।
তাই তো পিএসজির কোচ লুইস এনরিকে দেম্বেলের প্রশংসা করে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আজকে সে ঠিক আমাদের চেনা সেই উসমান ছিল, যে গত ৩ বছর ধরে দলের জন্য খেলে চলেছে। তার সৃষ্টিশীলতা এবং ডিফেন্স ভাঙার ক্ষমতা প্রতিপক্ষকে সবসময় কোণঠাসা করে দেয়।’ কোচের আস্থার প্রতিদান ম্যাচের শুরুতেই দিয়ে দিয়েছিলেন দেম্বেলে। ম্যাচের ১৭ ও ২৩ মিনিটে জোড়া গোল করে। এরপর তোরেসের দৃষ্টিনন্দন হ্যাটট্রিক এবং ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে ফ্যাবিয়ান রুইজের বুলেট গতির শটে সেøাভানের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয় বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।
ম্যাক অ্যালিস্টারের ক্ষোভ ও অ্যানফিল্ডের জয় : অ্যানফিল্ডের ঐতিহ্যবাহী মাঠে রাতে জমে উঠেছিল দুই বিশ্বজয়ী আর্জেন্টাইন সতীর্থের তীব্র স্নায়ুর লড়াই। হুলিয়ান আলভারেজের নিখুঁত এক পাস থেকে মার্কোস লরেন্তের গোলে আতলেতিকো মাদ্রিদ প্রথমে এগিয়ে গেলেও শেষ রক্ষা করতে পারেনি। নতুন চুক্তি নিয়ে ক্লাবের ওপর জমে থাকা তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা মাঠে গোল করে দারুণভাবে ধুয়ে-মুছে দিয়েছেন লিভারপুলের মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। ম্যাচের প্রথম দিক থেকেই দুই দলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সাক্ষী হয় বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা দর্শকরা।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে ডমিনিক সোবোসলাই দারুণ এক হেডে সমতা ফেরানোর পর দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের পুরো মোড় ঘুরিয়ে দেন ম্যাক অ্যালিস্টার। ম্যাচের ৫২ মিনিটে ডি বক্সের বাইরে থেকে বুলেট গতির এক অসাধারণ শটে আতলেতিকোর জালে বল জড়িয়ে অলরেডদের ২-১ গোলের দারুণ জয় এনে দেন তিনি। ম্যাচ শেষে নিজের পারফরম্যান্স ও মানসিক অবস্থা নিয়ে সংবাদমাধ্যমকে ম্যাক-অ্যালিস্টার সরাসরি বলেন, ‘আমি সাধারণত ওই পজিশনে পেলে শট নিতে পছন্দ করি। সচরাচর এমন গোল সব সময় হয় না, তবে আমি খুব খুশি, কারণ আমি গোল করতে ভালোবাসি।’
ওডেগার্ডের জাদুতে আর্সেনালের নাপোলি জয় : দীর্ঘ ভ্রমণ জটিলতা ও ঘরের মাঠে নাপোলির গোছানো ফুটবলে বেশ কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছিল আর্সেনাল। মাক্সিমিলিয়ানো আল্লেগির জমাট রক্ষণ কৌশলে যখন ড্রয়ের শঙ্কা জেঁকে বসেছিল, ঠিক তখনই ত্রাতা হয়ে আসেন গানারদের কাপ্তান মার্টিন ওডেগার্ড। ম্যাচের শুরু থেকেই বল নিজেদের দখলে রাখলেও নাপোলির ডিফেন্সিভ ব্লকের কারণে কাক্সিক্ষত গোলের দেখা পাচ্ছিল না ইংলিশ ক্লাবটি।
ম্যাচের প্রথমার্ধজুড়ে বুকায়ো সাকা ও মিকেল মেরিনো বেশ কয়েকটি দারুণ সুযোগ তৈরি করলেও নাপোলির রক্ষণ দুর্গ ও গোলরক্ষকের দৃঢ়তায় তা জালের ঠিকানা খুঁজে পায়নি। তবে নাপোলির সেই দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ ভেঙে শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ৭৫ মিনিটে পার্থক্য গড়ে দেন ওডেগার্ড। বদলি খেলোয়াড়ের কাছ থেকে নিখুঁত পাস পেয়ে ডি বক্সের ঠিক বাইরে থেকে বুলেট গতির এক জোরালো শটে নাপোলির জাল কাঁপান তিনি। তার এই দুর্দান্ত ও নাটকীয় জয়সূচক গোলটিই শেষ পর্যন্ত আর্সেনালের ইউরোপীয় মিশবের শুরুটা সফল করে তোলে।