স্বল্প ব্যয়ে মানসম্পন্ন চিকিৎসা দেশেই সম্ভব: লং লাইফ হাসপাতাল লি.

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪২ পিএম

স্বল্প খরচে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকার কলাবাগানের লেক সার্কাসে যাত্রা শুরু করে লং লাইফ হাসপাতাল। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে গত চার বছরে ২০ হাজারের বেশি মানুষ বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছেন। এ ছাড়া প্রতি মাসে গড়ে ৩০০ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসাসেবা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন।

হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আবু কাউছার স্বপনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে লং লাইফ হাসপাতালের প্রত্যাশা, পরিকল্পনা, চিকিৎসাসেবার বিশেষত্ব ও ভবিষ্যৎ ভাবনাসহ নানা বিষয়। একান্ত আলাপচারিতা সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন জ. ই.  বুলবুল। 

লং লাইফ হাসপাতালের বিশেষত্ব কী?

ডা. আবু কাওছার স্বপন বলেন, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা কমিউনিটিভিত্তিক হলে সুফল পাওয়া যায়। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই লং লাইফ হাসপাতালে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাসেবাকে (প্রিভেনটিভ কেয়ার) গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে নানা ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে নারীদের প্রসব নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ করা, নিউরোলজি চিকিৎসা, শিশুদের জন্য পূর্ণাঙ্গ শিশু বিভাগ, এনআইসিইউ, পিআইসিইউ ও আইসিইউ সেবার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের জটিল অপারেশন ও প্রসিডিউর সেবা দেওয়া হচ্ছে।

হাসপাতালে সেবার মান কেমন?

ডা. আবু কাওছার স্বপন বলেন, হাসপাতাল মানে শুধু বড় ভবন, কিছু যন্ত্রপাতি আর চিকিৎসক থাকা নয়। প্রতিটি বিভাগে কেপিআই (কি-পয়েন্ট ইন্ডিকেটর) বজায় রাখতে হয়। হাসপাতালটি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উন্নতমানের সেবা নিশ্চিত করতে নিয়মকানুন মেনে চলার পাশাপাশি বিদেশের বড় বড় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশনা নেওয়া হয়। তাদের সঙ্গে বিভিন্ন পারস্পরিক সহযোগিতার আনুষ্ঠানিক চুক্তিও রয়েছে।

তিনি বলেন, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার পাশাপাশি হাসপাতালের ভেতর থেকে যাতে রোগের সংক্রমণ না ঘটে, সেদিক বিবেচনায় রেখে নিরাপত্তা প্রটোকল নিশ্চিত করা হয়।

বায়োমেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেমন?

ডা. আবু কাওছার স্বপন বলেন, লং লাইফ হাসপাতালে নিজস্ব ইটিপি ব্যবস্থাপনা রয়েছে। এ ছাড়া মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিও রয়েছে।

অন্য হাসপাতাল থেকে লং লাইফের বিশেষত্ব কী?

তিনি বলেন, বড় ভবন, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও দামি যন্ত্রপাতি থাকলেই ভালো হাসপাতাল হয় না। শুধু ভালো চিকিৎসক বা দক্ষ টেকনিশিয়ান থাকলেও হয় না। সবকিছুর সমন্বয়ে বহুমাত্রিক (মাল্টিডিসিপ্লিনারি) সেবাব্যবস্থা এবং মানুষের ভরসা করার মতো পরিবেশ গড়ে তুলতে হয়।

ডা. আবু কাওছার স্বপন বলেন, মানুষকে হাসিমুখে সেবা দিতে হবে। অনেক চিকিৎসকের একজন রোগীকে দেওয়ার মতো যথেষ্ট সময় থাকে না। এটি হওয়া উচিত নয়। প্রতিটি রোগী আলাদা সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে আসেন। তাই প্রতিটি রোগীর কথা মন দিয়ে শোনা, তার আবেগ বোঝা এবং তাকে আশ্বস্ত করা যে তার কথাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে শোনা হচ্ছে—এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, রোগী বা তার স্বজন ক্ষুব্ধ আচরণ করলে হাসপাতালের কর্মীদের বুঝতে হবে, কেন মানুষটি এমন আচরণ করছেন। রোগীর সঙ্গে যোগাযোগ ও রোগীর যত্ন ঠিক রাখতে সবাইকে সচেষ্ট থাকতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সবার আর্থিক অবস্থা এক রকম নয়। তাই আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষদের কীভাবে সেবা দেওয়া যায়, ভালো হাসপাতাল হতে হলে সেটিও ভাবতে হবে। মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। আমরা সেবার মাধ্যমে সেই আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছি।

তিনি আরও বলেন, চিকিৎসকদের ল্যাবরেটরি পরীক্ষা দেওয়া, রোগী ভর্তি করানোসহ কোনো বিষয়েই কোনো চাপ নেই। তাদের কোনো টার্গেটও দেওয়া হয় না। তারা নির্ভার হয়ে রোগীর জন্য যেটি ভালো মনে করেন, সে অনুযায়ী পরামর্শ দিতে পারেন। এসব বিষয় বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে, কারণ হাসপাতালটি চিকিৎসকদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত।

রোগীর আর্থিক অবস্থা বিবেচনা ও মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রাখছেন?

ডা. আবু কাওছার স্বপন বলেন, খরচ অনেক হবে—এমন আশঙ্কায় অনেকে হাসপাতালে যেতে চান না। অনেক রোগী দীর্ঘদিন ধরে (ক্রনিক রোগে) ভুগলেও চিকিৎসা নেন না। তবে লং লাইফ হাসপাতালে সকল শ্রেণির মানুষের জন্যও বিভিন্ন পর্যায়ে চিকিৎসা নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

হাসপাতালে ভালো সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

তিনি বলেন, চিকিৎসার মানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, সেবার সংস্কৃতি ও মানসিকতা তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ। রোগীকে বোঝা এবং তাকে সহানুভূতি জানানো—এ দুটি আলাদা বিষয়। এক করে দেখলে চলবে না। কেন, কী পরামর্শ বা সেবা দেওয়া হচ্ছে, তার পেছনে বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি অবশ্যই থাকতে হবে।

তিনি বলেন, চিকিৎসক, নার্স ও প্রযুক্তিবিদ—সবার প্রশিক্ষণ নেওয়া প্রয়োজন। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য এখানে সবাইকে উৎসাহিত করা হয়। এমনকি নিরাপত্তাকর্মীদেরও প্রশিক্ষণ থাকতে হবে, যাতে তারা সবার সঙ্গে শান্ত ও সংযত আচরণ করেন।

ডা. আবু কাওছার স্বপন বলেন, আমাদের দেশে মানুষ দল বেঁধে রোগী দেখতে হাসপাতালে যায়। এটি যে রোগীর নিজের জন্য, রোগী দেখতে যাওয়া ব্যক্তিদের জন্য এবং হাসপাতালে সেবা দেওয়া কর্মীদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে, তা অনেকে ভাবেন না।

বাংলাদেশ থেকে নানা কারণে অনেক মানুষ চিকিৎসা নিতে বিদেশে যান উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের আশা, একদিন তারা বিদেশে নয়, নিজ দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর ভরসা করবেন। বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া ছেড়ে তারা দেশে ফিরবেন—লং লাইফ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে এটাই আমার চাওয়া।

তিনি বলেন, সবার আন্তরিক সহযোগিতা ও সমর্থন পেলে বর্তমান সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী লং লাইফ হাসপাতালও একটি মডেল হাসপাতাল হিসেবে গড়ে ওঠা সম্ভব।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত