হাম আক্রান্ত শিশুর ৮৫ শতাংশই টিকাবিহীন: গবেষণা

গবেষণাপত্র থেকে জানা যায়, আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৪৬ শতাংশ (৯১ জন) শিশুর বয়সই ছিল ৯ মাসের নিচে। জাতীয় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) অনুযায়ী ৯ মাস বয়সে শিশুদের প্রথম ডোজ হামের (এমআর) টিকা দেওয়া হয়। ফলে সুরক্ষাবলয় তৈরি হওয়ার পূর্বেই এই শিশুরা মারাত্মক ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে।

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২৮ পিএম
হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের বিশাল বড় একটি অংশই কোনো টিকা পায়নি। চিকিৎসাধীন শিশুদের প্রায় ৮৫ দশমিক ২ শতাংশই ছিল সম্পূর্ণ টিকাবিহীন। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, টিকা না পাওয়া শিশুদের প্রায় অর্ধেকই (৪৬ শতাংশ) আক্রান্ত হয়েছে নিয়মিত টিকাদানের নির্ধারিত বয়স (৯ মাস) হওয়ার আগেই। বাকি শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অসচেতনতা, টিকাদানের তারিখ ভুলে যাওয়া কিংবা সামান্য অসুস্থতার কারণে টিকা না দেওয়াকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
 
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের কনফারেন্স হলে ‘মিজলস আউটব্রেক ২০২৬ ইন সাদার্ন বাংলাদেশ: এপিডেমিওলজিক্যাল প্রোফাইল, ক্লিনিক্যাল ক্যারেক্টারিস্টিকস, জেনেটিক অ্যানালাইসিস উইথ ম্যাটারনাল অ্যান্ড চাইল্ড অ্যান্টিবডি স্ট্যাটাস’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়।
 
এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কামরুন নাহার এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন।
 
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চারটি বড় হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ল্যাবরেটরি-পরীক্ষিত ১৯৬ জন হাম আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা ইতিহাস ও তথ্য বিশ্লেষণ করে এই গবেষণা করা হয়। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৯৭ জন শিশু চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। এছাড়া কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৪ জন, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে ৪৫ জন এবং কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০ জন শিশু ভর্তি ছিল।
 
গবেষণা সহযোগী হিসেবে ছিলেন, ডা. সেলিনা হক, ডা. আয়েশা বেগম, ডা. মোহাম্মদ জাবেদ বিন আমিন চৌধুরী, ডা. সায়েদা হুমায়দা হাসান, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের ডা. আসমা ফেরদৌসী ও ডা. সানজানা ইসলাম, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. মিয়া মনজুর আহমেদ এবং কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. এম এস জামান।
 
গবেষণাপত্র থেকে জানা যায়, আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৪৬ শতাংশ (৯১ জন) শিশুর বয়সই ছিল ৯ মাসের নিচে। জাতীয় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) অনুযায়ী ৯ মাস বয়সে শিশুদের প্রথম ডোজ হামের (এমআর) টিকা দেওয়া হয়। ফলে সুরক্ষাবলয় তৈরি হওয়ার পূর্বেই এই শিশুরা মারাত্মক ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। এমনকি আক্রান্তদের ১১ শতাংশ শিশুর বয়স ছিল মাত্র ৬ মাসেরও কম। অন্যদিকে, যেসকল শিশু টিকা নেওয়ার নির্ধারিত বয়সে পৌঁছেও টিকা পায়নি, তাদের ৫২ শতাংশের ক্ষেত্রে কারণ ছিল অভিভাবকদের অসচেতনতা বা টিকার তারিখ ভুলে যাওয়া। এ ছাড়া ৩০ শতাংশ শিশু অসুস্থতার কারণে এবং ৮ শতাংশ শিশু মায়ের অসুস্থতার জন্য সময়মতো টিকা পেতে ব্যর্থ হয়।
 
হামের ভয়াবহতার কথা উল্লেখ করে গবেষণায় বলা হয়, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের ৮৬ দশমিক ৭ শতাংশই নানা ধরনের জটিলতায় পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ছিল নিউমোনিয়া, যা আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৭৮ দশমিক ১ শতাংশের মধ্যে দেখা গেছে। এ ছাড়া এক-তৃতীয়াংশ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছিল এবং তাদের বড় অংশেরই বিগত ছয় মাসে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ার ইতিহাস ছিল না।
 
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে, যাদের প্রত্যেকেই ছিল সম্পূর্ণ টিকাবিহীন এবং তারা সবাই গুরুতর নিউমোনিয়ায় ভুগছিল। তবে আশার কথা হলো, পূর্বে টিকা পাওয়া কোনো শিশুই মৃত্যুবরণ করেনি।
 
ভাইরাসের নমুনা বিশ্লেষণে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট ও আইসিডিডিআর,বি'র সহায়তায় আক্রান্তদের থেকে পাওয়া ১৭টি নমুনার পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং করা হয়। এতে শতভাগ নমুনাতেই 'বি-৩' জিনোটাইপ ধরা পড়ে। গবেষকরা জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশে যে হামের টিকা দেওয়া হয়, তা এই বি-৩ জিনোটাইপ প্রতিরোধে পুরোপুরি সক্ষম ও কার্যকরী।
 
প্রাদুর্ভাব রোধ ও শিশু মৃত্যু কমাতে বেশ কিছু জরুরি সুপারিশ করেছেন গবেষক দল।  প্রধান গবেষক ডা. কামরুন নাহার বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণে জাতীয় টিকাদানের কভারেজ ৯৫ শতাংশের ওপরে নিয়ে যেতে হবে। দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করে ‘ক্যাচ-আপ’ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
 
তিনি আরও বলেন, শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজনে বর্তমান ইপিআই শিডিউল পুনঃমূল্যায়ন করে ৯ মাসের পরিবর্তে ৬ মাস বয়স থেকেই প্রথম ডোজ এমআর টিকা প্রদান এবং ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী নারীদের মাতৃ-সুরক্ষার স্বার্থে টিটি টিকার পাশাপাশি এমআর টিকা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি অপুষ্টি দূরীকরণ, নিয়মিত ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণ এবং হাসপাতালে সংক্রমণ রোধে দ্রুত আইসোলেশনের ব্যবস্থা জোরদার করার উচিৎ। 
 
 
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত